লন্ডন, ২৪ জুন — ঐতিহাসিক পলাশী দিবস উপলক্ষে ‘অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলন’-এর উদ্যোগে গত ২৩ জুন, সোমবার, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে “পলাশী ট্র্যাজেডি ও আজকের বাংলাদেশ” শীর্ষক এক ভাবগম্ভীর আলোচনা সভা।
সভায় সভাপতিত্ব করেন কবি আহমেদ ময়েজ এবং স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আরিয়ান খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শামসুল আলম লিটন। আলোচনায় অংশ নেন লন্ডন, কানাডা ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও গবেষকরা।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাপ্তাহিক সুরমা’র প্রধান সম্পাদক ফরীদ আহমেদ রেজা। বিশেষ অতিথির আসন অলংকৃত করেন শিক্ষাবিদ সৈয়দ মামনুন মোর্শেদ ও অধ্যাপক আবদুল কাদির সালেহ। এছাড়া ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন অধ্যাপক ড. তাজ হাশমী। সঞ্চালনায় ছিলেন মিনহাজুল আলম মামুন এবং এনাম চৌধুরী।
সভায় আলোচকরা ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধকে বাংলার স্বাধীনতার জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় ছিল জাতীয় আত্মমর্যাদার পতন, যার প্রতিক্রিয়ায় আজও জাতি দোদুল্যমান। বক্তারা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরেন এবং পলাশী থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রচিন্তা গঠনের আহ্বান জানান।
হাসনাত আরিয়ান খান তাঁর বক্তব্যে বলেন, “নবাব সিরাজ একা পরাজিত হননি, পরাজিত হয়েছিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার জনগণ। এই গ্লানি মোচন করতে হলে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।” তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে জাতীয় ইতিহাস চর্চার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
মূল প্রবন্ধে শামসুল আলম লিটন বলেন, “পলাশী একটি তারিখ নয়, একটি চেতনার নাম। জাতিকে বিশ্বাসঘাতকতা থেকে রক্ষা করতে হলে প্রযুক্তি, আত্মমর্যাদা ও নেতৃত্বের সমন্বয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।”
অধ্যাপক তাজ হাশমী বলেন, “পলাশীর ইতিহাস শুধু সামরিক ব্যর্থতা নয়, বরং তথ্য-প্রযুক্তি ও বিশ্বাসের সংকট ছিল মূল। আজও আমরা ইতিহাস চর্চায় পিছিয়ে আছি, যা আমাদের রাষ্ট্রচিন্তাকেই দুর্বল করে।”
অধ্যাপক আবদুল কাদির সালেহ বলেন, “পলাশীর ট্র্যাজেডি আমাদের সামনে জাতীয় আত্মচেতনা তৈরির এক সুযোগ এনে দিয়েছে। এই আলোচনাগুলোকে জাতীয় বয়ানে পরিণত করতে হবে।”
সৈয়দ মামনুন মোর্শেদ বলেন, “মীরজাফর ও তাঁর সহযোগীদের ষড়যন্ত্র আজও ইতিহাসের কলঙ্ক। নবাব সিরাজ ছিলেন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, যা ইতিহাস আজ প্রমাণ করেছে।”
ফরীদ আহমেদ রেজা বলেন, “২৪ সালের বিপ্লব যেন হাতছাড়া না হয়, সেজন্য আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রস্তুত হতে হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে স্বাধীনতা বিপন্ন হতে পারে।”
সভায় আরো বক্তব্য রাখেন নজরুল ইসলাম বাসন, মিছবাহ জামাল, ড. কামরুল হাসান, অলিউল্লাহ নোমান, শেখ আখলাখ আহমেদ, ইমরান আহমেদ চৌধুরী, মুগনি চৌধুরী, হাসনাত হাবীব, বদরুজ্জামান বাবুলসহ অনেকে।
কবি আহমেদ ময়েজ তাঁর সভাপতির বক্তব্যে বলেন, “ইতিহাস কারো কৃতদাস নয়। আমাদেরকে নতুন করে সত্য ইতিহাস লিখতে হবে এবং ইংরেজদের রচিত ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে।”
সভা শেষে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে ‘অখণ্ড বাংলাদেশ আন্দোলন’-এর একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এই আলোচনা সভা ইতিহাস সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন উপস্থিত অতিথিরা। বক্তারা বলেন, পলাশী দিবস শুধুই অতীত স্মরণ নয়—এটি একটি জাতীয় চেতনার দিন, যা ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি হতে পারে।





