Home বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমরা কি ভুল মহাবিশ্বে আছি ?

আমরা কি ভুল মহাবিশ্বে আছি ?

77
0

কামাল সিকদার  

দশকের পর দশক ধরে আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়েছে বিগ ব্যাং তত্ত্বকে কেন্দ্র করে—যেখানে সময়, স্থান ও বাস্তবতার সূচনা হয়েছে এক বিশাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) সম্প্রতি এমন কিছু তথ্য পাঠাচ্ছে যা এই প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে পারে। নোবেল বিজয়ী এক পদার্থবিজ্ঞানীর ভাষায়:
“এটা আমাদের মহাবিশ্ব নয়।”

অসম্ভব গ্যালাক্সি এবং মহাজাগতিক অসংগতিগুলো

JWST-এর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণেই চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য উঠে আসে। মহাকাশের এক কোণায় একটি সাধারণ হলুদ ছোপের মতো বস্তু দেখতে পায় বিজ্ঞানীরা। পরে জানা যায়—এটি ইতিহাসের সবচেয়ে দূরবর্তী গ্যালাক্সি, যা গঠিত হয়েছে বিগ ব্যাং-এর মাত্র ২৯০ মিলিয়ন বছর পরেই। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, এটি অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল, বিশাল এবং পরিপক্ব—যা বর্তমান মহাবিশ্ব সৃষ্টির মডেল অনুযায়ী অসম্ভব।

আরও আশ্চর্যের বিষয়, JWST ইতিমধ্যে এমন ডজনখানেক গ্যালাক্সি খুঁজে পেয়েছে। এর মধ্যে কিছু গ্যালাক্সি তাদের গ্যাসের ১০০% অংশকে তারা-তে রূপান্তর করেছে—যা বিজ্ঞান অনুযায়ী অসম্ভব। এই গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে নেই কোনো গ্যাস, নেই ধুলিকণা—শুধুই বিশুদ্ধ তারা।
বিজ্ঞানীদের প্রশ্ন এখন আরও গভীর: এগুলো আদৌ গ্যালাক্সি তো? নাকি এগুলো অন্য মাত্রার কোনো কাঠামো, কোনো পুরনো মহাবিশ্বের অবশেষ, কিংবা অন্য কোনো মহাবিশ্বের অংশের  অনুপ্রবেশ?

হাবল স্ফিয়ারের বাইরে: যেখানে থেকে আলো পৌঁছানোর কথা নয়

জগৎ সম্পর্কে আমাদের বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো হাবল স্ফিয়ার—একটি সীমা, যার বাইরে বস্তুসমূহ এত দ্রুত দূরে সরে যায় যে আলো পর্যন্ত আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু JWST সেইসব এলাকা থেকেও আলো শনাক্ত করছে—এমন আলো, যা কখনোই আমাদের কাছে পৌঁছানোর কথা নয়।
এটা কেবল একটি বৈজ্ঞানিক রহস্যই  নয়; এটি এমন এক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে, যেখানে হয়তো আমরা আমাদের মহাবিশ্বের প্রান্ত ছাড়িয়ে কিছু দেখছি—কিন্তু কি সেটা , তা  আমরা জানি না।

পড়ুনঃ  প্রাপ্তবয়স্ক মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনের প্রথম সম্পূর্ণ মানচিত্র তৈরি করলো বিজ্ঞানীরা

বিগ ব্যাং-এর প্রশ্নবিদ্ধতা এবং ভেঙে পড়া বাস্তবতা

এইসব আবিষ্কার বিজ্ঞানীদেরকে অচিন্তনীয় কিছু ভাবতে বাধ্য করছে:
বিগ ব্যাং কি আদৌ ঘটেছিল?
যদি গ্যালাক্সি সময়ের আগে তৈরি হতে পারে, যদি আলো দূরতম সীমা পেরিয়ে আসে, তাহলে আমাদের সমস্ত কল্পিত মহাবিশ্বের ভিত্তি কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে?

সম্ভবত আমরা যা দেখছি, তা কোনো নির্দিষ্ট সময়রেখা নয়—বরং একটি ভাঙন, যেখানে দুটি মহাবিশ্ব একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। অথবা এমন কিছু চিরন্তন, যা আমাদের মহাবিশ্বের চেয়ে প্রাচীনতর ও বৃহত্তর।

সময় ছাড়িয়ে হৃদস্পন্দন ও অদৃশ্য ভরের ছায়া

JWST-এর এক আশ্চর্য আবিষ্কার হলো—একটি সুসংগঠিত কম্পনধ্বনি, যা কোন পরিচিত মহাজাগতিক উৎস থেকে আসেনি। । এটা কোনো পালসার, মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গ বা ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ  নয়। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন:
“মহাবিশ্বের  হৃদস্পন্দন বলছেন যা সময়ের ঊর্ধ্বে।”
এটি একধরনের গাণিতিক  ছন্দে চলে, যেন এটি ইচ্ছাকৃতভাবে কোড করা—অপরিচিত কোন্‌ সত্তার  পক্ষ থেকে।

অন্যদিকে, অনেক দূরবর্তী গ্যালাক্সিতে বিশাল মাধ্যাকর্ষণ প্রভাব দেখা গেলেও দৃশ্যমান কোনো বস্তু নেই। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন:
ফ্যান্টম মাস—একটি ছায়া, যা আমাদের মহাবিশ্বের বাইরে থেকে মহাকর্ষজ প্রভাব ফেলে চলেছে।

প্রতিবিম্বিক বাস্তবতা এবং মহাজাগতিক প্রতিধ্বনি

অনেক বিজ্ঞানী এখন ধারণা করছেন, আমাদের মহাবিশ্বের একটি প্রতিবিম্বিক বিশ্ব থাকতে পারে—যেখানে সময় উল্টো দিকে চলে, পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলোও আমাদের বিপরীত।
JWST এমন কিছু কণার আচরণ ধরেছে, যার মধ্যে স্পষ্ট অসাম্য লক্ষণীয়, যেন দুটি ভিন্ন মহাজাগতিক ব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

এমনকি এক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, একদম প্রান্তবর্তী একটি আলোকচিহ্ন একবার হারিয়ে গিয়েও অন্য এক সময়ে আবার ফিরে এসেছে—ঠিক একই বর্ণালি চিহ্নসহ। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন:
“মহাজাগতিক প্রতিধ্বনি।”
প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিধ্বনি কিসের? এটা কি একটি বন্ধ, বাঁকা মহাবিশ্বে আলো ঘুরে ফিরে আসছে? নাকি কোনো অজানা কিছুতে প্রতিফলিত হয়েছে?

তাহলে আমরা কোথায়?

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ নির্মিত হয়েছিল মহাবিশ্বের শুরু বোঝার জন্য। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এটি আমাদের দেখাচ্ছে এক ভয়ঙ্কর সত্য—আমাদের মহাবিশ্বই হয়তো আমাদের নয়।

পড়ুনঃ  ব্রহ্মাণ্ডের মদতে আরও রাক্ষুসে হচ্ছে ব্ল্যাক হোল, আইনস্টাইনের ইঙ্গিত মিলল শতবর্ষ পর

নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানীর সতর্কবাণী আমাদের মনে গেঁথে দিচ্ছে এক ভীতিকর প্রশ্ন:
আমরা কি সঠিক মহাবিশ্বে আছি?
নাকি আমরা কেবল একটি বিশাল, পুরনো, নির্বিকার কাঠামোর প্রান্তে ভেসে বেড়াচ্ছি—যার প্রকৃতি আমাদের যুক্তি ও বিজ্ঞানের বাইরে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে, আমাদের শুধু মহাবিশ্বকে নয়, নিজেদের অস্তিত্বকেও নতুন করে ভাবতে হবে।
কেননা, আজকের প্রশ্নটা শুধু—“আমরা একা?” নয়,
বরং  ভাবার বিষয় হোল —“আমরা কি সঠিক বাস্তবতায় আছি?”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here