লন্ডন, ১৮ জুলাই ২০২৫
ব্রিটেনের দুইটি দাতব্য সংস্থা দখলকৃত পশ্চিম তীরে অবস্থিত একটি অবৈধ ইসরায়েলি বসতিতে প্রায় ৫৭ লক্ষ পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৩ কোটি টাকা) অনুদান দিয়েছে—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান-এর এক অনুসন্ধানে। এই অনুদান পাঠানোর ক্ষেত্রে অনুমোদন দিয়েছে ব্রিটেনের দাতব্য সংস্থাগুলোর তদারকি সংস্থা Charity Commission।
দলিলপত্র অনুযায়ী, Kasner Charitable Trust (KCT) নামের একটি সংস্থা UK Toremet নামক আরেকটি সংস্থার মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছে পশ্চিম তীরের সুসিয়া নামের একটি অবৈধ ইসরায়েলি বসতির Bnei Akiva Yeshiva হাই স্কুলে।
অনুদানের ফলে স্কুলটির বাজেট ব্যাপকভাবে বাড়ে। বাড়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মী ও স্থানীয় বসতিবাসীর সংখ্যাও।
ইসরায়েলি বসতি ইস্যুতে গবেষক ড্রর এটকেস জানান, “এই স্কুলটি সুসিয়া বসতির সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের উৎস এবং বসতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।”
উচ্ছেদ আর বেদনার ইতিহাস
সুসিয়া অবস্থিত হেবরনের দক্ষিণে। এটি মূলত ফিলিস্তিনি গ্রাম খিরবেত সুসিয়ার পাশে গড়ে তোলা একটি অবৈধ বসতি। ১৯৮৬ সালে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এই ফিলিস্তিনি গ্রামকে ‘পুরাতাত্ত্বিক এলাকা’ ঘোষণা করে সেখানকার মূল বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করে।
এমনকি চলতি বছরের মার্চে সুসিয়ায় বসতিস্থাপনকারীরা হামলা চালায় অস্কারজয়ী তথ্যচিত্র No Other Land-এর পরিচালক হামদান বাল্লাল-এর বাড়িতে।
দাতব্য কমিশনের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ
২০১৬ সালে UK Toremet-কে লেখা এক চিঠিতে Charity Commission জানায়, “অধিকৃত অঞ্চলের একটি স্কুলে অনুদান শিক্ষার অগ্রগতির জন্য দেয়া দান হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তা আইনগতভাবে বৈধ।”
এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাবেক কনজারভেটিভ পার্টির চেয়ার বারোনেস সাঈদা ওয়ার্সি। তিনি বলেন,
“ব্রিটিশ কোনো নাগরিক অবৈধ দখলকৃত ভূমিতে অর্থ পাঠাবে, এটা অগ্রহণযোগ্য। তার চেয়েও ভয়াবহ হচ্ছে, এ ধরনের কাজ আমাদের করের টাকায় ঘটছে। দাতব্য কমিশনের এ ধরনের অনুমোদন অত্যন্ত দুঃখজনক।”
লেবার পার্টির এমপি এবং আইনজীবী অ্যান্ডি ম্যাকডোনাল্ড বলেন,
“সরকারের উচিত দ্রুত আইন প্রণয়ন করে ব্রিটেন থেকে অবৈধ দখলদারিত্বকে সহায়তাকারী যেকোনো অর্থের গমন রোধ করা। এসব অনুদান দাতব্য মর্যাদা হারানো উচিত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।”
আইনি প্রশ্ন ও তদন্তের গতি
২০২২ সালে ব্রিটিশ আইন সংস্থা Hickman & Rose দাতব্য কমিশনে অভিযোগ জানালে কমিশন জানায়, যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত বিষয় তাদের এখতিয়ারে পড়ে না এবং বিষয়টি পুলিশকে জানানোর পরামর্শ দেয়।
পরে আইনজীবীরা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট SO15-এর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, তারা তদন্ত করবে না, তবে কমিশনকে তাদের উদ্বেগ জানাবে।
Charity Commission তাদের বিবৃতিতে বলেছে,
“এই বিষয়টি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং এখানে ভিন্নমত রয়েছে। আমাদের কাজ হচ্ছে দেশের আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করা। অধিকৃত অঞ্চলে কোনো দাতব্য সংস্থা কাজ করলেই তা অপরাধ নয়।”
তারা আরও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনসংক্রান্ত জটিলতা বিবেচনায় Attorney General-এর কাছ থেকে তারা নতুনভাবে আইনি পরামর্শ নিচ্ছে।
যুক্তি দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো
UK Toremet দাবি করেছে, তারা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে না। সব অনুদানই ইংরেজি দাতব্য আইনের আওতায় দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে KCT-র এক মুখপাত্র বলেন, তারা কোনো বসতিকে সহায়তা করছেন না, বরং একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করছেন। তিনি আরও জানান, কমিশনের কাছ থেকে এই অনুদানের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ব্রিটেনে দাতব্য সংস্থার স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক শুরু হয়েছে। করদাতাদের অর্থ অবৈধ বসতিতে ব্যবহৃত হওয়া কতটা নৈতিক বা আইনসঙ্গত—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অনেকেই। সংসদে বিষয়টি উত্থাপন এবং নতুন আইনের দাবি উঠতে শুরু করেছে।





