ঢাকা, ১৯ জুলাই ২০২৫ — বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল জামায়াতে ইসলামী, যখন দলটি ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাদের প্রথম একক মহাসমাবেশ আয়োজন করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলীয় সমর্থকদের ঢল নামে রাজধানীতে। দলটি এমন একটি সময়ে এই সমাবেশ করল, যখন দেশে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। আবেগঘন বক্তব্যে তিনি বলেন, “গত বছরের আন্দোলনে আমাদের ভূমিকা ছিল স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের সামনে আরও কঠিন সংগ্রাম অপেক্ষা করছে। “এই ন্যায়ের পথে যদি আমাকে শহীদ হতে হয়, আল্লাহ যেন তা কবুল করেন,” বলেন শফিকুর রহমান।
বক্তব্যে তিনি রাজনৈতিক ইতিহাসের কিছু অন্ধকার অধ্যায়ের উল্লেখ করে বলেন, “২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু করে বিডিআর বিদ্রোহ এবং ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ঘটনাসহ যারা রাজনৈতিক হত্যা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচার বাংলার মাটিতেই হতে হবে।”
“দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে পুরনো ব্যবস্থার মধ্যে থেকে বাংলাদেশ কখনও সামনে এগোতে পারবে না,” বলেন তিনি।
শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঠিক আগে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে, নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে দলটির ওপর থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে।
সমাবেশে জামায়াতের পক্ষ থেকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ঘোষণা করা হয়। শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা চাঁদাবাজি করব না, দুর্নীতিও করব না, বরদাশতও করব না। সরকারে গেলে আমাদের কোনো সাংসদ বা মন্ত্রী সরকারি প্লট নেবে না, ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি চালাবে না, নিজের হাতে জনগণের টাকা ব্যবহার করবে না।”
নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক ভোটব্যবস্থা চালুর পক্ষেও জোর দেন। দলের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটাই সবচেয়ে সঠিক পদ্ধতি।”
প্রথম সারির মিত্র বিএনপি, যারা ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছিল জামায়াতের সঙ্গে, তাদের কোনো নেতাকর্মীকে এই সমাবেশে দেখা যায়নি। কারণ, PR পদ্ধতি নিয়ে দুই দলের অবস্থানে স্পষ্ট ফারাক দেখা যাচ্ছে।
তবে উপস্থিত ছিলেন অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের নেতা ও নবীন নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP)’-এর প্রতিনিধিরা।
সমাবেশে একটি নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি হয়, যখন ৬৬ বছর বয়সী শফিকুর রহমান বক্তব্য দিতে গিয়ে দু’বার অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যদিও নেতারা জানিয়েছেন তিনি এখন স্থিতিশীল আছেন।
দলের দাবি অনুযায়ী, প্রায় এক মাসব্যাপী প্রস্তুতির পর এই সমাবেশে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ অংশ নেন, যা তাদের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ জনসমাগম বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার আগে, অর্থাৎ ১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে পল্টন ময়দানে জামায়াত সর্বশেষ বড় ধরণের সমাবেশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই সমাবেশে সংঘর্ষ বাধে এবং আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বহু ছোটখাটো সভা-সমাবেশ করলেও, ঢাকায় এ ধরনের বড় একক মহাসমাবেশ জামায়াত আর কখনও করতে পারেনি—এই প্রথম।
এদিনের সমাবেশ কেবল এক রাজনৈতিক দলের শোডাউন নয়, বরং একটি দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকা দল নতুন করে রাজনীতির ময়দানে তাদের শক্ত অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা বলেই মনে করছেন অনেকেই।






