মরক্কোয় ৪৫০০ কিলোমিটার সফরের অংশ হিসেবে রাবাতে সপ্তাহখানেকের ছোট্ট সফর, অথচ হৃদয়ের পাতায় যেন এক চিরন্তন গল্প হয়ে রয়ে গেল—রাবাত। মরক্কোর রাজধানী হলেও এই শহর তার ঐশ্বর্য জাহির করে না, বরং ইতিহাস আর আধুনিকতার হাত ধরাধরি করে হেঁটে চলে যায় আরবীয় ধ্যান-ধারণার cঅলিগলি ধরে।
সফরের শুরুতেই যখন রাবাত পৌঁছালাম, শহর যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাতছানি দিয়ে ডাকল। কোথাও কোনো তাড়া নেই, নেই উগ্র শহুরে কোলাহল—বরং ছিমছাম রাস্তা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর এক অভাবনীয় উষ্ণ আতিথেয়তা।
প্রথম গন্তব্য ছিল কাসাবা উদায়া—সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন দুর্গ যেন কোনো এক রাজকুমারীর নিঃসঙ্গ প্রাসাদ, যার চোখ সমুদ্রে এবং মন ইতিহাসে। সাদা-নীল ঘরগুলোর মাঝখানে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, যেন আমরা কোনো মুগ্ধকর পরী-কাহিনির অংশ। বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে, হেসে উঠছে প্রতিটি চওড়া সিঁড়ি বেয়ে।
এরপর চুপিসারে আমরা ঢুকে পড়লাম চেল্লা’র নিঃসঙ্গ সৌন্দর্যে। ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন রোমান স্থাপত্য আর ইসলামিক নিদর্শনের এক অপূর্ব সহাবস্থান। এখানে বাতাসও যেন ফিসফিস করে ইতিহাসের গল্প বলে। স্টর্ক পাখিদের বিশাল বাসা দেখে অবাক হয়ে গেল ছেলেমেয়েরা, আর আমরাও হারিয়ে গেলাম এক অদ্ভুত মায়ায়।
পুরাতন মদীনা ছিল এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা। সরু অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে দেখি রঙিন মশারির মতো ঝুলে থাকা কারুকাজ করা কাপড়, মরোক্কান মশলা আর চামড়ার জিনিসের গন্ধে ভরে উঠছিল আমাদের প্রতিটি শ্বাস। দর কষাকষি, হাসিমুখে দোকানিদের আহ্বান—সব কিছু মিলিয়ে এক রঙিন উন্মাদনা।
হাসান টাওয়ার যেন ইতিহাসের এক অসমাপ্ত স্বপ্ন। বিশাল মিনার আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অপূর্ণ স্তম্ভগুলো দেখে মনটা হালকা বিষণ্ণতায় ভরে উঠল—কিন্তু সূর্যের আলোয় যেন সেই অতৃপ্ততা কিছুটা প্রশান্তিতে বদলে যায়।
রাজপ্রাসাদে প্রবেশের অনুমতি নেই বটে, কিন্তু বাহির থেকে দেখা সুসজ্জিত বাগান আর নিখুঁত প্রাচীর যেন রাজার না থেকেও রাজকীয়তার বার্তা দেয়। সেখানে পাহারায় থাকা প্রহরীদের অদ্ভুত নিঃসঙ্গ অথচ গর্বিত চোখ আমাদের মনে করিয়ে দিল—এ এক ইতিহাসে গড়া শহর।
সবশেষে গেলাম সুলতান পঞ্চম মোহাম্মদের সমাধিতে। ভেতরে ঢুকেই মনে হলো, এটি শুধু একটি সমাধি নয়, বরং এটি মর্যাদা, গভীর শ্রদ্ধা আর রাজকীয় সৌন্দর্যের প্রতীক। মার্বেলের কাজ, চুড়ার সোনালি রঙ, আর নীরব পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা রক্ষীদের কদম-তাল আমাদের স্তব্ধ করে দিল।
রাবাত ভ্রমণের প্রতিটি দিন যেন এক একটি চিত্রপট—যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিবার আর অনুভূতি এক সুতোয় বাঁধা। সন্তানদের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়ে শুধু চোখ নয়, হৃদয়ও ভরে উঠেছিল। রাবাত আমাদের শুধু জায়গা দেখায়নি, এক অনুভব দিয়েছে—যা চিরকাল মনে থাকবে।
সপ্তাহ পেরিয়ে এলেও মনের ঘড়ি যেন থেমে আছে কাসাবা উদায়ার সেই সিঁড়িতে, চেল্লার নিঃশব্দ বাতাসে, কিংবা পুরাতন মদীনার এক চায়ের দোকানে।
ভোরের হালকা রোদে রাবাত শহরটা যেন আমাদের চোখের সামনে বিদায় জানাতে দাঁড়িয়ে ছিল। চারদিক শান্ত, গাড়ির দরজায় হালকা ঠাণ্ডা লেগে থাকা শিশির আর দূরের মিনারের আজান আমাদের মনে করিয়ে দিল—এই যাত্রা শুধু ভ্রমণ নয়, এক প্রকার সৌহার্দ্য, ধৈয্যর্ আর আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার এক অনন্য পাঠ হতে চলেছে।
সেদিন, ১৩ এপ্রিল, আমরা রওনা দিলাম তানজেরের উদ্দেশ্যে। আমি, আমার প্রিয়তমা স্ত্রী সাইদা পিংকি, আমাদের দুই মেয়ে বুশরা ও নুজহা, আমাদের অদম্য সাহসের প্রতীক, আট বছরের দৃষ্টিহীন ছেলে হুজাইফা, ছোট্ট ১৪ মাসের ঈসা, আর আমাদের সহযাত্রী চালক জালাল—আমরা ছয়টি প্রাণ, একটি হৃদয়, একটি বিশ্বাস নিয়ে পথ ধরেছিলাম।
রাবাত শহর পেছনে রেখে গাড়ির চাকা ঘুরতে শুরু করল, আর আমার মনে চলতে লাগল একের পর এক ভাবনার স্রোত। রাবাতের রাস্তা যেন নীরবে বলছিল—“ফিরে এসো আবারৃ”। কিন্তু মনটা তখন উন্মুখ, সামনে যে তানজের!
রাবাত থেকে তানজেরÑ এ পথ যেন মরক্কোর হৃদপিন্ড থেকে উত্তরে আত্নায় পৌছার এক কাব্যিক রেখা। পথের শুরু রাবাতের প্রাশান্ত শহর থেকে। এখানে ইতিহাস নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে রাজপ্রাসাদ, মসজিদ আর আন্দালুসীয় উপকূলঘেঁষা বাতাসে। শহর পেরোতেই প্রকৃতি পাল্টাতে শুরু করে তার ক্যানভাস—একটার পর একটা তুলির আঁচড় যেন রঙ বদলায় আমাদের চোখের সামনে।
রাস্তার দুই পাশে দেখা যায় মৃদু ঢালু পাহাড়, ঘন জলপাই গাছ, আর মাঝে মাঝে ছড়িয়ে থাকা গমের ক্ষেত—যা রৌদ্রের আলোয় সোনালি হয়ে ওঠে। মনে হয় প্রকৃতি এখানে শুধু সৃষ্টি হয়নি, এখানে সে নিজের সৌন্দর্যে ডুবে আছে।
কখনো কখনো পথ চলে যায় টানেলের ভেতর দিয়ে, আবার কখনো উঁচু এক পাহাড় থেকে নেমে আসে ঢালু রাস্তায়। রাস্তার পাশে ছোট ছোট গ্রাম, যেখানে মাটির ঘর আর কাঠের দরজার পেছনে লুকিয়ে আছে প্রাচীন কাহিনি।
রাবাত থেকে কাসাব্লাঙ্কার ব্যস্ততা পেরিয়ে যখন সেলা নদী ও উত্তরাঞ্চলীয় জমিনে প্রবেশ করি, তখন প্রকৃতি আরও নির্জন, আরও উদার হয়ে ওঠে। সূর্য্য যেন একটু নিচু হয়ে পড়ে, বাতাসে একটা পাকা ফলের গন্ধ আসে। মাঝে মাঝে দেখতে পাই ছাগল বা গরুর পাল রাস্তার পাশে চরে বেড়াচ্ছে। শিশুদের হাসি আর খেলাধুলা যেন পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।
এই পথ প্রধানত এ১ মহাসড়ক ধরে চলে, যা মরক্কোর সবচেয়ে উন্নত রোডনেটওয়ার্কের অংশ। কিন্তু উন্নত এই রাস্তার মাঝে মাঝেই প্রকৃতি থমকে দেয়—একটা অদ্ভুত শান্তি, যেন হঠাৎ করে কোনো কুয়াশাঘেরা সুর ভেসে আসে।
গাড়ির গ্লাসের বাইরে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়—এই রাস্তা যেন শুধু দেহকে নয়, আত্মাকেও নিয়ে চলেছে এক শহর থেকে আরেক শহরে।
যতই তানজেরের কাছে পৌঁছাই, ততই বাড়তে থাকে রাস্তার বাঁক আর পাহাড়ের উঁচু—নিচু ঢেউ। তানজের শহরে ঢোকার মুখে ভূমধ্যসাগরের জলরেখা দেখা যায়, আর দূরের ইউরোপীয় উপকূল—স্পেনের ছায়া যেন বাতাসে মিশে থাকে।
তানজের শহরে ঢোকার আগেই চারপাশের দৃশ্য পাল্টে যায়—আরব, আন্দালুসীয়, আফ্রিকান সব মিলিয়ে এক অপরূপ সৌন্দর্য্য, যেখানে পাহাড় ও সাগরের মিলন ঘটেছে আত্মার মতো নিঃশব্দে।
সামনে বসে ছিল গাড়ীচালক জালাল—চুপচাপ, দায়িত্বশীল, চোখেমুখে ভরসার ছাপ। সে শুধু গাড়ি চালাচ্ছিল না, আমাদের নিরাপদে পৌঁছানোর নীরব দায়িত্ব যেন বহন করছিল। আমাদের মরক্কো সফরের পুরো সময়টি জালালই ছিল চালক ও গাইড। একই সাথে সে “আল আদল ও ইহসান পাটি‘র” রাবাতের যুব বিভাগের প্রধান। সে গাড়ী চালাচ্ছে আর ইতিহাসের বিভিন্ন দিক আরবি ও স্পেনিশ ভাষায় বর্ণনা করে যাচ্ছিল। আমি আরবি বুঝি আর মেয়ে নুজহা পরিপূর্ণভাবে স্পেনিশ বুঝে। সাইদা পিংকি পাশে বসে ছেলেমেয়েদের গোছাচ্ছিল, যেন এই সফর তাদের জন্যও এক শিক্ষার অধ্যায় হয়ে উঠুক।
রাস্তার দুপাশে জলপাই খেত, মাঝে মাঝে দেখা মেলে ছাগলের পাল, দূরের পাহাড়ে ভেসে বেড়ানো মেঘ—সবকিছু মিলিয়ে এক স্বপ্নের মতো লাগছিল। কখনো হুজাইফা আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করছিল, “আব্বু, পাহাড় দেখতে কেমন?” আমি তার হাতে স্পর্শ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম—“জানো, এটা অনেক বড় একটা ঢেউয়ের মতো, আকাশের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়”। হুজায়ফা দৃষ্টিশক্তিহীন হলেও গত ফেব্রুয়ারিতে তার স্কুলে অসাধারণ ফলাফল অর্জন করার জন্য রয়েল ব্রেকফাস্টের মেহমান হয়ে রাজা চার্লসের সাথে নাস্তা করার সুযোগ পেয়েছিল। তার স্পর্শে আমি বুঝতে পারছিলাম, সে চোখে দেখতে না পারলেও হৃদয় দিয়ে সব অনুভব করে। তার নীরবতা ছিল আমার চোখের জল আর কৃতজ্ঞতার শব্দহীন কবিতা।
মাঝপথে আমরা এক ছোট রেস্তোরাঁয় থামলাম। চারপাশ ছিল ঝুপঝাপে গাছ আর পাখির ডাক। একটা বেঞ্চে বসে আমরা সবাই একসঙ্গে মরক্কোন চা খেলাম। ঈসা তখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, হুজাইফা আমার কোল ঘেঁষে বসে ছিল। সাইদা হাসিমুখে বলছিলেন, “এই সফর শুধু ভ্রমণ না, এটা আমাদের হৃদয়ের বন্ধনকে আরও জোরালো করছে।”
আমি তখন চুপ করে বসে ছিলাম, ভাবছিলাম—আলহামদুলিল্লাহ, এমন একটি পরিবার, এমন একটি জীবন, এতটা ভালোবাসা আমার কপালে লেখা ছিল!
যখন গাড়ি তানজেরের উপকণ্ঠে প্রবেশ করল, বাতাসে অন্যরকম একটা গন্ধ পেলাম—লবণাক্ততা আর ইতিহাসের মিশ্র ঘ্রাণ। ভূমধ্যসাগর তখন দূরে চোখে পড়ছিল, তার নীল জলে সূয্যের্র আলো পড়ে যেন সোনা ঝরে পড়ছে।
তানজের যেন তার প্রাচীন ইতিহাস, সাহিত্যিক অতীত আর রহস্যময়তা নিয়ে আমাদের অপেক্ষায় ছিল। এই শহরেই এক সময় জীবন ও কবিতার সন্ধানে ছুটে এসেছিলেন লেখক পল বোয়েলস, জ্যাক কেরুয়াক, এমনকি কাহিনীকার তহর বেন জেলুন। আর আজ আমরা এসেছি—পাঁচটি শিশু আর একটি দম্পতির স্বপ্ন নিয়ে।
তানজের পৌঁছে, সূর্য্য তখন একটু ঢলে পড়েছে। আমি তখন ঠিক তারেক বিন যিয়াদের পদধুলি ধন্য আফ্রিকার একেবারে উত্তর ও শেষ প্রান্তে, সামনেই আটলান্টিক আর ভূমধ্যসাগরের মিলন। হাতে হুজাইফার হাত, পাশে বুশরা, নুজহা, সাইদা, কোলে ঈসা। সেই মুহূর্তে, আমি আমার অন্তরের গভীরতম স্থান থেকে বললাম—
“হে আল্লাহ, এই সফর যেন কেবল গন্তব্য নয়—হোক নতুন করে বাঁচা, ভালোবাসা ও শুকরের সফর।”
সুমন মাহমুদ
টিভি উপস্থাপক ও লেখক
লন্ডন, যুক্তরাজ্য



