প্রথম কিস্তি
ইতালির ভেনিস নগরী। বিশ্বের কাছে যার পরিচিতি ভাসমান শহর বলে,কেউ বলে খালের শহর। হবেই বা না কেন, রাস্তার বদলে সরু সরু খালে ভর্তি এই আজব শহর, দেড় হাজার বছর আগে ভূমধ্যসাগরের বুকে যার গোড়াপত্তন হয়েছিল। ক্লাস নাইনে সৈয়দ মুজতবা আলীর রসগোল্লা আর শেক্সপীয়ারের মার্চেন্ট অফ ভেনিসের সাইলক, পোর্শিয়া আর অন্যান্য চরিত্রের সাথে মাথার ভিতরে গেথে গেল পানির উপরে তৈরি বাস্তবের বুকে কল্পকথার সেই শহরটির কথা। এখনো ইংরেজি সে গল্পের প্রথম প্যারা পুরোপুরি মুখোস্ত রয়েছে। আমাদের শহীদ উল্লাহ স্যার যেভাবে মুখোস্ত করিয়েছিলেন আজো সেভাবেই মুখোস্ত আছে।
ইতালি আসলাম ২০১২ সালের একেবারে মাঝামাঝি সময়ে। প্রচন্ড গরম আর রোজার মাস। দিন যেমন বড় রাত তেমন ছোট। সে বছরের আগস্ট মাসে এখানে বসবাসরত বাংলাদেশিরা সিদ্ধান্ত নিল ভেনিস নগরী ভ্রমনে যাবে। কল্পনার নগরী! উদ্যোক্তা যেহেতু আমারই বউয়ের ভাই, তাই সে আমাকে বলল ভ্রমনটাকে যেভাবে আনন্দদায়ক করা যায় তার জন্য যা যা করার তা যেন করি।
ভেনিসকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে অবাস্তব শহর, সেই সাথে সবচেয়ে রোমান্টিকও! পরতে পরতে রোমাঞ্চ আর রোমান্টিকতায় কত ভরপুর । যতক্ষন নিজ চোখে না দেখবেন ততক্ষন অনুভব করা অসম্ভব। সে এক অন্য ভুবন, অনন্য তার রূপ, সেই সাথে এমন এক অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ভেনিস যে তার তুলনা কেবলমাত্র সে নিজেই। অথচ, মজার ব্যাপার হচ্ছে ভেনিসের মোট আয়তন মাত্র ৮ বর্গ কিমি, কিন্তু প্রায় ৪০০ সেতুর মাধ্যমে সংযুক্ত একশ সতেরটি ক্ষুদে দ্বীপের এই শহরে একবার প্রবেশ করলেই একে মনে হয় সীমাহীন, চারিদিকে কেবল অথৈ পানির রাজত্ব।
ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায় প্রায় দেড় হাজার বছর আগে আত্তিলা নামের এক হান দস্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য উপকূলবর্তী এলাকার জনগণ এই দ্বীপপূর্ণ জলাভূমিতে ক্ষুদে ক্ষুদে বসতি গড়ে করে বাস করতে আরম্ভ করে, আত্তিলা অন্তত সেই জলকাদা অধ্যুষিত ভূখণ্ডে ঘোড়ায় চেপে আক্রমণ করতে পারবে না, এই আশায়। সেই থেকেই ধরণীর বুকে ভেনিসের যাত্রা শুরু। বাংলাদেশের মানিকমিয়া এ্যাভিনিউসম প্রসস্থ তিলোত্তমা ভিয়া লিবেরিয়া নামক রাস্তাটি দ্বারা ভেনিসিয়া-মেস্রের মূল ভূখন্ডের সাথে ৮.৯০ কিলোমিটারের দূ্রত্বে আদরিয়াটিক সাগরে ভেনিসের অবস্থান। বাসের চার লেন আর ট্রেনের ৮ নেল মিলে মোট ১২ লেনের এ রাস্তাটি সমুদ্রের উপর দিয়ে মহাসাগরের বুক ছিরে সান্তালুসিয়ার দিকে এগিয়ে গেছে। এই সান্তালুসিয়াই যানবাহন বা বাস-ট্রেনের শেষ ষ্টেশন। সান্তালুসিয়া থেকে পানিবাহনে কল্পলোককে হার মানানো মহাসাগরের বক্ষে আরো তিন কিলোমিটারের সমূদ্র গভীরে আশ্চার্যময় স্থাপনা ভেনিসের পর্যটকবেষ্টিত যানবাহনগুলি যখন শো শো করে অত্রিক্রম করে মনে হয় শান্ত সমুদ্রের বুকে কেউ তীব্র ছুরিকাঘাতের ফলে তীব্র আর্তনাদ করছে। এখানে দেখা মিলে হাজার জাতের ও রং বেরংয়ের সাদাকালো নারী পুরুষ। ভাষার সমস্যা? পৃথিবীর প্রত্যেকটি ভাষাভাষি মানুষের দেখা মিলবে। এমনকি পৃথিবীর প্রত্যেকটি স্থানীয় ভাষার মানুষকে এখানে হয়ত পাবেন। এখানেও নোয়াখালির মানুষদের প্রাধান্য কম নয়।
একদিকে হাজারো পর্যটকের গমগম আওয়াজ,পানিবাহনগুলিতে দর্শনার্থীদের উঠানামার ভিড়, এরই মাঝে দূরে নগরীর দিকে তাকালেন। পানিতে যেন মসজিদের গম্বুজ দূলছে! আপুনি দূলছেন তো গম্বুজও দূলছে। আসলে কিন্তু তাই নয়:এখানকার প্রত্যেকটি বড় স্থাপনা গম্বুজসাদৃশ্য। গীর্জায় ভরপুর। প্রত্যেকটি গীর্জাই গম্বুজ আকৃতির।
স্থাপত্যকলা,মননশীলতা ও রুচিভেদের অনন্য নিদর্শণ পানিবেষ্টিত এই স্থাপনাগুলি।
ভেনিসে বছরের ৩৬৫ দিনই (লিপিয়ারে ৩৬৬ দিন) পর্যটকদের ভিড়ে সরগরম, মানুষের ভিড়ে হাটাই মুস্কিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই লাখো লাখো লোকের মধ্যে শতকরা ৭৫ জনই বিমুগ্ধ দর্শনার্থী, যারা দিকভ্রান্ত হয়ে চলাচল করতে করতে দুচোখ ভরে পান করছে সেই রূপসুধা। এ এক অনন্য শহর যেখানে গাড়ী, ঘোড়া, বাস যাবতীয় স্থলযান অচল, শহরের যেখানে শেষ সেখানকার প্রান্তসীমায় রেলষ্টেশনে নামার পর থেকেই যাত্রা শুরু হয় পদব্রজে নতুবা নানা ধরনের জলযানে, এই সবার ভরসা।
এমন উদভ্রান্ত হয়েই আমরা একদল বাংলাদেশি হেটে চলেছি । আমাদের দলে আছেন চাকুরীজীবি, ব্যবসায়ী ও কর্মহীন মানুষ। সেই সাথে আমাদের পরিবারের সকল সদস্য। বাংলাদেশ কমিউনিটর দয়াল, নেতা ফারুক আহমদ, সাধারণ সম্পাদক ইমরান কবির ডন,সহসভাপতি আবদুল আহাদসহ অনেকে। সার্বক্ষনিক হাসি,আনন্দ ও ক্লান্তিদূরিকরনে তো আয়োজনের শেষ নেই। মিসেস লিমা, পলি, লাভলী এরা যে যার মত তো একটার পর একটা আয়োজন করেই যাচ্ছে। সত্যি বলতে কি সেদিনটা মনে হয়েছিল কারো কোন পাওনা আর দেওনা নেই।
কয়েক হাত পরপরই সরু সরু এক একটা খাল মাকড়শার জালের মত ভেনিসের বুক চিরে চলে গেছে, আর তাই বা বলি কি করে! আক্ষরিক অর্থে ভেনিস তো নির্মিতই হয়েছে এই জলভূমির উপরে! এর মাঝে আবার আছে শহরটিকে সমান দুই ভাগে ভাগ করা সবচেয়ে চওড়া খাল যা পরিচিত গ্র্যান্ড ক্যানেল নামে জগদ্বিখ্যাত, স্থাপনার জগতে এক অটুট বিস্ময় এই গ্র্যান্ড ক্যানেল। সেই সাথে খানিক পরপরই খাল বিধায় পারাপারের জন্য বাহারী সব সেতু। নয়ন জুড়ানো রঙ, নকশা, স্থাপত্যশৈলীর। এর মাঝে গ্র্যান্ড ক্যানেলের উপরের বিশাল সেতুটাই সবচেয়ে জমকালো।
ভেনিসে বসবাসরত সব পরিবারেরই নিজস্ব জলযান আছে, যা বাড়ীর সদর বা খিড়কি দরজার কাছে বাঁধা, নামী হোটেলগুলোরও প্রত্যেকেরই আছে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা।
সুবর্ণ যুগে ভেনিসে ৮০ ধরনের জলযান চলাচল করত, এর মধ্যে সেই মধ্য যুগ থেকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও আকর্ষণ বজায় রেখে চলেছে বিশ্বের সবচেয়ে রোমান্টিক জলযান বলে খ্যাত গনডোলা। ইন্যুইটদের (এস্কিমো) কথা বললেই যেমন কুকুরটানা স্লেজ গাড়ির কথা মানসপটে ভেসে ওঠে তেমন ভেনিস শব্দটা কর্ণকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সরু সুসজ্জিত গনডোলা।
গন্তব্যহীন ও দলবদ্ধভাবে ঘুরতে ঘুরতেই দেখি সেখানকার ন্যাচারাল হিস্ট্রি জাদুঘরের সামনে হাজির হয়ে গেছি, টিকিটের বালাই নেয়, সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সোজা চোখ পড়ে কোটি বছর আগে সাগর দাপিয়ে বেড়ানো ইকথিওসরের জীবাশ্মের উপরে।
বিশ্বের নানা কালে সংঘটিত প্রাকৃতিক পরিবর্তন আর জীবজগতের বিবর্তনের নমুনা থরে থরে সাজানো। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মনে হল ১১ কোটি বছরের পুরনো ৩৩ ফিট লম্বা সুপ্রাচীন কুমির সুপার ক্রোকের জীবাশ্ম, যার খাদ্য তালিকার অন্যতম ছিল নানা প্রজাতির ডাইনোসর!
এখানেই কোন বাড়ীতে জন্মে ছিলেন পর্যটক গুরু মার্কো পোলো, ১৭ বছর বয়সে ভেনিস ছেড়ে সুদূরের পিয়াসে বাবা-কাকার সাথে রওনা দিয়েছিলেন কুবলাই খানের চীনদেশের উদ্দেশ্যে, প্রথম দিককার একজন ইউরোপিয়ান হিসেবে চীনে যাবার পর দীর্ঘ ২৬ বছর পর আবার ফিরে আসেন ভেনিসে, বিশ্বকে শোনান তার অবিশ্বাস্য ভ্রমণ কাহিনী। ভেনিসের সবচেয়ে বিখ্যাত অধিবাসী হিসেবে তাকে বলা হয়ে থাকে, আমি খুজে বাহির করতে চেষ্টা করছিলাম কোন বাড়ীতে থাকতেন এই ভ্রমণপিপাসু। কিন্তু ভাষার সীমাবদ্ধতা আর সময়ের কৃপনতার কারনে তা অজানাই থেকে গেল।
এখানেই হয়ত হেঁটে বেড়াতেন চিন্তামগ্ন বিজ্ঞানী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, যিনি ভেনিসে স্বল্প সময়ের অবস্থান কালে বিশ্বের প্রথম ডুবুরীর পোশাকের নকশা করেছিলেন।
দ্বিতীয় কিস্তি
ভেনিসের বাড়ীগুলো আজো তেমনটাই আছে যেমন ছিল পাঁচশ বা হাজার বছর আগে, অনেক জায়গাতেই চুন পলেস্তারা খসে পড়েছে, ছাদটাও মনে হচ্ছে ভেঙ্গে পড়ার যোগাড় কিন্তু মহাকালের করাল গ্রাসকে অগ্রাহ্য করে টিকে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। অধিকাংশ বাড়ীর ফটক বা ফলকে খোদাই করা আছে বাড়ীর প্রতিষ্ঠা সন। এমনকি কোন কোন বাড়ীর ইতিহাসও লিখা আছে। রীতিমত তাজ্জব বনে যাবার মত সবই।
প্রতিটি পানির গলির মুখে পাবেন মুখোশ ফেরি করে মুখোশ বিক্রেতা। যার অধিকাংশ বিক্রেটাই আমাদের বাংলাদেশি (ফরিদপুর/মাদারীপু/শরিয়তপুর)। ভেনিসের রঙবেরঙের মুখোশগুলো এমনিই জগদ্বিখ্যাত, তার উপর প্রতিবছর ফেস্টিভ্যালের সময় দর্শনীয় চিত্র-বিচিত্র সব মুখোশ শোভা পায় প্রায় সবার মুখে। সারা বছরই চলে তার বিকিকিনি গোটা শহর জুড়ে বসা দোকানগুলোতে। কি বাহারি এক একটা মুখোশ, কোনটা কেবল চোখ ঢাকার জন্য, কোনটা বা পাখির সুতীক্ষ ঠোঁটের মত, কোনটা বিশালাকৃতির, কোনটা আবার পালকময়। ওস্তাদ লোকের হাতের কাজ, দেখেই শ্রদ্ধা হয় তার সুক্ষ রুচি আর সমন্বয়ের মুন্সিয়ানার প্রতি। দুটো বাচ্চার জন্য দুটো ভেনিসের মুখোশ কিনেও ফেললাম ।
ভেনিসের মাছের বাজারও এক অনন্য। বাড়ীর কাছে ভুমধ্য সাগরের নানা রঙের রূপোলী ফসল তো আছেই, আরও আছে সুদূর উত্তর সাগর আর আটলান্টিক থেকে আসা জাত-বেজাতের সব সামুদ্রিক প্রাণী। রকমারি শামুক, ঝিনুক থেকে শুরু করে অক্টোপাস, স্কুইড কি নাই সেখানে!
পড়ন্ত বেলা। ক্লান্ত হয়ে বসে আছি সাগর কিনারে। হঠাৎ কানে এল পুলিশের ভোঁ ভোঁ সাইরেন, আরে পুলিশ আসবে কি করে এই জলময় ভূখণ্ডে! উত্তর মিলল তৎক্ষণাৎই, দ্রুতগতির দুটি স্পীডবোটে করে পুলিশ সাঁ করে সামনে দিয়ে জেমস বন্ড স্টাইলে উধাও হয়ে গেল!
গমমে জনসমুদ্র, ক্যাথেড্রালে ঢোকার লাইনটাতে কমপক্ষে হাজার তিনেক মানুষের ভিড়, যা চলে গেছে বিশাল চত্বরের উপর দিয়েই অদুরে দৃশ্যমান ভূমধ্যসাগরের ফেনিল ল্যাগুনের দিকে, নেপোলিয়ন এই চত্বরকেই ইউরোপের সবচেয়ে সুদৃশ্য ড্রয়িংরুম বলেছিল।
কাতারে দাঁড়ালেও পরে জানা গেল কাঁধের ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢোকা সম্ভব নয়, কাজেই সেটা ভবিষ্যতের জন্য মুলতুবী রেখে চারপাশে মনের সাধ মিটিয়ে দেখে নিলাম মানবসৃষ্ট বিস্ময়,এর সিংহদরজার উপরে শোভা পাচ্ছে চারটি প্রমাণ আকৃতির অতুলনীয় শৈল্পিক সৌন্দর্যের অধিকারী ধাতব ঘোড়ার ভাস্কর্য, এগুলো প্রায় হাজার বছর আগে বাইজেন্টাইন স্রামাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ইস্তাম্বুল থেকে লুট করে আনা হয়েছিল, সেই থেকে ভেনিসই এদের ঠিকানা।
বাহিরের দেয়ালে বাইবেলের নানা কাহিনী সুক্ষ চিত্রকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কাছের ল্যাগুনে গনডোলা আর জেলে নৌকার ভিড়, দৃষ্টিসীমার মাঝে কিছু ক্ষুদে দ্বীপ নজরে আসল, সেখানে বিস্ময় জাগানিয়া নানা স্থাপত্যে সমাহার ও কাঁচের কারখানা, উৎসাহীরা দল সেখানে যাচ্ছে দল বেঁধে।
পদব্রজে এত ঘোরাঘুরির পর প্রবল ক্ষিদেকে সাথী করে আমরা সবাই বসে পড়লাম এক নয়মাভিরাম পার্কে। সবার সাথে হাতে হাতে রান্না করা খাবার প্যাকেট( চুপিচুপি জানিয়ে রাখি, ভেনিস ইতালির সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর এবং বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল গুলোরও একটি হবার কথা!) আসলে তাইই। যেখানে কফির দাম সাধারণ দোকানে ৫ ইউরো আর একটু অভিজাত দোকানে সাড়ে সাত ইউরো! সারা ইতালির অন্যান্ন জায়গার কফির দাম ৯০ সেন্টস। সেখানে অন্যান্য খাবারের দামের কথা আর নাই বা বলি, হবে নাই বা কেন? সারা বছর এত পর্যটকের ভিড়! আমাদের খাবারের ম্যানু সামান্য সালাদ যা ইতোমধ্যে বাঁসি হয়ে উঠছে, পিংকীর হাতের রান্না করা শুকনা বিনিয়ানী এবং কোমনপানীয়। দুপুর বেলা।কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবার নগর পরিভ্রমণে।
গ্র্যান্ড চ্যানেলের উপরের বড় সেতুটাতে দাড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ তন্ময় হয়ে, কৈশোরের স্বপ্ন নগরী ভেনিসে দাড়িয়ে আছি, সেতুর নিচ দিয়ে সাবলীল ভাবে মাঝিরা চলে যাচ্ছে নানা ধরনের জলযান নিয়ে, কি আশ্চর্য! চারপাশে সারা বিশ্বের সব দেশের মানুষ হাজির হয়েছে মনে হল, মহা হট্টগোলে চলছে ছবি তোলা। এখানে সেখানে ইলিউড বলিউড ছবির শুটিং।
এই ভিড়েই খানিকটা ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে ঢুকে পড়লাম এক গলির মধ্যে, সার বেঁধে কংক্রিটের ব্লক বসানো সারা রাস্তায়, চলে গেছে ভিতরের দিকে, এর মাঝে কজন ভিড় করে আছে রাস্তার মাঝখানে। দেখি এক লাল পাথরের স্ল্যাবকে ঘিরে এত ভিড়, কি ব্যাপার , এমন লাল পাথরতো আর চোখে পড়ে নি! শোনা গেল ৫০০ বছর আগে প্লেগ মরণব্যধি হিসেবে ভেনিসে দেখা দেয়, প্লেগের আরেক নাম ছিল ব্ল্যাক ডেথ বা কালো মৃত্যু। ধারণা করা হত আগাগোড়া এক মস্ত কালো আলখেল্লা পড়ে এই মৃত্যুরূপী শয়তান মানুষ শিকার করে বেড়ায় (আমাদের অঞ্চলের আগের যুগের ওলাওঠা, শীতলাদেবীর সাথে কি আশ্চর্য মিল!)। কিন্তু এই ব্ল্যাক ডেথই এসে থেমে গিয়েছিল এই নির্দিষ্ট জায়গায়, সেই স্মরণেই এখানে স্থাপন করা হয় লাল পাথরের স্মারক, ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও বোমারু বিমানগুলো এই পাথরের অন্য পাশে কোন অজ্ঞাত কারণে বোমা বর্ষণ করে নি! এভাবেই বুঝি লোকবিশ্বাসের কিংবদন্তীর তৈরি হয়!
ভেনিসে দারুণ ভাবে আকর্ষণীয় ক্যাথেড্রাল, জাদুঘর আর ভবনের সংখ্যা এত বেশী যে মাত্র একদিন নয়ই কয়েকদিনেও এর অর্ধেক দেখাও অসম্ভব। তাও প্রয়াস চালালাম, যদিও জানি বেশী সুখাদ্য একসাথে খেলে বদহজম হবার যেমন সমূহ সম্ভাবনা, তেমন বেশী সংখ্যক দর্শনীয় বস্তু অল্প সময়ের মাঝে দেখলে মনের পর্দায় সবগুলো উপরই চাপ পড়ে। যেহেতু আমাদের অবস্থানকাল একেবারেই সীমিত তাই অনেক কিছুই দেখার ও জানার অগোচরে রয়ে গেল। সেই সাথে ভাষার সমস্যা যদি না থাকত তবে মনের ভিতর উত্থিত অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হত। নগরীর একেবারেই শেষ মাথায় মানে দক্ষিণপ্রান্তে অবস্থিত উদ্যানটি দেখে মনে হবে কোন সুদক্ষ কারিগর তার নিখুত হাতের ছোয়া দিয়ে একটা ছবি বাধাই করে রেখেছে। ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি তন্ময় হয়ে। উদাস হয়ে ভাবছি কোথা আসলাম! উদ্যানটির নকশা, পরিকল্পনা,বাহারী ফুলের ও গাছের সারি গাছগুলির হিসেবে উচ্চতা, সমুদ্রের লোনাপানির রং, চিকন চিকন আঁকাবাঁকা রাস্তার গলি,বসার চেয়ার, ঘাসফুলের রং সবই মিলে এ অন্য জগত। কল্পনাকেও যা হার মানায়।না, আসলেই আমিতো যে ভেনিসে? একথাতো ভূলেই গিয়েছিলাম।
তবে অনেক জায়গায়ই ভেনিস একেবারে একরকম দেখতে। অনেকখানি হেটেও মনে হল হয়ত গোলকধাধার চক্করে পড়ে একই জায়গায় ঘুরে ঘুরে আসছি! এর মধ্যে কয়েকবার ফিরতি পথ ধরতে হল সামনে খাল পড়ার জন্য, অন্য যে কোন শহরে একে কানাগলি বলতাম, কিন্তু ভেনিসে কি বলে অভিহিত করি! ১৯৯৪ সালে ক্লাস নাইনে পড়ার সময় মনের কল্পনায় যে শহরকে আঁকিয়েছি, হেটে চলেছিলাম যে শহরের অলিগলিতে। আজ ২০১২ সালে আমি বাস্তবে সে শহরে। কল্পনার জগতের সাথে বাস্তবতার সবই মিল পেয়েছি। পার্থক্য কেবল একটা জায়গায় তখন আমি ছিলাম উড়ন্ত কিশোর আর পল্লীগায়েঁর এক দূরন্ত বালক। আর এখন কোন এক নারীর স্বামী ও দুটি সন্তানের বাবা।
এত ঘুরাঘুরি মাঝেও আমরা নামাজ বাদ দিতে চেষ্টা করিনি। পুরুষ মহিলা যে যার মত গামছা ও তোয়ালে বিছিয়ে খোলা জায়গায় যথাসময়ে ধীরস্থিরভাবে নামাজ আদায় করেছে। আবার দলব্ধভাবেও নামাজ আদায় করেছে। অনেক পর্যটক ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দের মাধ্যমে আমাদের নামাজের দৃশ্যধারন করেছে। কারন এখানে আমাদের জংগী বা জিহাদী হিসেবে আখ্যায়িত করার মত কেউ নেই। তবে, বড় সমস্যা হালাল খাবারের।
তড়িৎগতিতে শেষ হয়ে আসছে তিলোত্তমা নগরীতে অবস্থানের সময়গুলি, ক্যামেরায় এই অদ্বিতীয় স্বপ্নলোকের দৃশ্যপট ধারণ করতে করতেই চলে গেল সিংহভাগ সময়, শেষের বেলা গ্র্যান্ড ক্যানেলের পাড়ে বসে গোধূলিসূর্যের মৃদু আলো উপভোগ করতে করতে মনে হল, আহা, জীবন কতই না সুন্দর!
পুনশ্চঃ এটি লিখেছিলাম দুই হাজার বার সালের আগস্ট মাস
সুমন মাহমুদ
টেলিভিশন উপস্থাপক ও লেখক।



