Home মতামত প্রবাসী ভোটার তালিকার বিড়ম্বনার অবসান চাই

প্রবাসী ভোটার তালিকার বিড়ম্বনার অবসান চাই

187
0


আমার স্ত্রী একজন জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক। জন্মগ্রহণ করেছেন বাংলাদেশে, এবং শিশুকালেই বাবা-মায়ের সাথে ইউরোপে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এখনো তার পাসপোর্টে “বাংলাদেশি নাগরিক” পরিচয় বহাল রয়েছে। হাতে রয়েছে বাংলাদেশের ডিজিটাল এমআরপি পাসপোর্ট, অনলাইন জন্মসনদ, নাগরিকত্ব সনদ এবং বাবা-মায়ের এনআইডি। তদুপরি, তার স্বামীর এনআইডিও জমা দেওয়া হয়েছে।
সব কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর সম্প্রতি লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে ভোটার তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করেন তিনি। যথানিয়মে ফিঙ্গারপ্রিন্ট গ্রহণ করা হয়, রিসিটও দেওয়া হয় এবং হাইকমিশনের কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানান—আর কোনো কাগজপত্র বাকি নেই।
কিন্তু সমস্যার শুরু এখানেইঃ
আমাদের পরামর্শ দেওয়া হয়—প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করতে চাইলে স্থানীয় নির্বাচন অফিসে একটু যোগাযোগ করলে ভালো হয়। সেই অনুসারে আমরা সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাচন কমিশন অফিসে যোগাযোগ করি। কিন্তু সেখানে যা বলা হলো তা হতবাক করার মতো:
আবেদনকারীর চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট দিতে হবে,

এসএসসি সার্টিফিকেট লাগবে,

বিদ্যুৎ বিল, হোল্ডিং নাম্বার,

আবারও পিতা-মাতার এনআইডি,

এসব না দিলে নাকি “তদন্তপূর্বক ভোটার আইডি হবে না”।
আমার প্রশ্ন—এসব যুক্তিযুক্ত নাকি প্রশাসনিক জটিলতা?
একজন প্রবাসী নারী, যিনি শৈশবেই দেশ ছেড়েছেন, যাঁর নামে দেশে কোনো বাড়ি নেই, কোনো ইউটিলিটি বিল নেই, তার নামে হোল্ডিং নাম্বার বা বিদ্যুৎ বিল কীভাবে থাকবে?
তার যদি এসএসসি বা কোনো বাংলাদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত সনদ না থাকে, তাও কি অপরাধ?
তাহলে ডিজিটাল পাসপোর্ট, নাগরিকত্ব সনদ, জন্মসনদ এবং অভিভাবকদের এনআইডি থাকা সত্ত্বেও একজন নাগরিককে ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না?
নাগরিক অধিকার কি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদনে নির্ভরশীল?
হাইকমিশনে যে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে—যেখানে বায়োমেট্রিক, নথিপত্র সব জমা দেওয়া হয়েছে—তা কি যথেষ্ট নয়? তাহলে কেন আবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেট চাই? নির্বাচন কমিশনের এই স্থানীয় পর্যায়ের প্রক্রিয়াকে অনেক সময় “ব্যক্তিনির্ভর”, “পছন্দ-অপছন্দ নির্ভর” বলেও অভিযোগ ওঠে।
বৈষম্য মূলক আচরণ ও অব্যবস্থাপনার চিত্র
এই পরিস্থিতি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের উদাহরণ। যেখানে রাষ্ট্র প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে নির্ভরশীল, সেখানে তাদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রশাসনিক সদিচ্ছার স্পষ্ট অভাব দেখা যায়। এ যেন ‘ডলার পাঠাও, কিন্তু ভোট চাও না’—এই মনোভাব।
বিশেষ করে প্রবাসী নারীদের ক্ষেত্রে এসব বাধা আরো জটিল আকার ধারণ করে। একদিকে পাসপোর্টে “বাংলাদেশি”, অপরদিকে নির্বাচনী তালিকায় “অযোগ্য”!
আমরা কী চাই?
১. একক প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা: হাইকমিশনের মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধনের পর আর কোনো আলাদা যাচাইয়ের প্রয়োজন না থাকুক।
২. যৌক্তিকতা ও বাস্তবতা: প্রবাসীদের পক্ষে যেসব কাগজপত্র (বিদ্যুৎ বিল, হোল্ডিং নাম্বার ইত্যাদি) সংগ্রহ অসম্ভব, সেসবের পরিবর্তে বিকল্প পদ্ধতি নিশ্চিত হোক।
৩. ভোগান্তি রোধে নির্দেশনা: নির্বাচন কমিশন অফিসে প্রবাসীদের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক যেন হয়রানি বন্ধ হয়।

  1. নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি: প্রবাসী নারীরা যেন বাড়তি জটিলতার শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা হোক।
    এটি শুধু আমার স্ত্রীর সমস্যা নয়। হাজারো প্রবাসী নারী-পুরুষ এই অস্পষ্ট নীতিমালা, দ্বৈত প্রক্রিয়া এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এই প্রতিবেদন কোনো অভিযোগ নয়—এটি একটি ন্যায্য দাবির উচ্চারণ। নাগরিক হিসেবে ভোটাধিকার শুধু অধিকার নয়—এটি সংবিধান স্বীকৃত মর্যাদা। এই মর্যাদা যেন হয়রানির বিনিময়ে না কিনতে হয়।
পড়ুনঃ  প্রথম আলো -ডেইলি ষ্টার শেষ পর্যন্ত প্রতিবিপ্লব শুরু করে দিল?

সুমন মাহমুদ, লন্ডন।

লেখক ‘সদস্য, প্রবাসী ভোটাধিকার বাস্তবায়ন পরিষদ যুক্তরাজ্য’ ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here