Home মতামত প্রথমে দেশ: বসনিয়া–কসোভোর অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

প্রথমে দেশ: বসনিয়া–কসোভোর অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

184
0

(মাত্র তিন দশক আগে ভয়াবহ জাতিগত সংঘর্ষে বিধ্বস্ত হয়েছিল বসনিয়া ও কসোভো। তবুও আজ সারায়েভো থেকে প্রিস্টিনা— সর্বত্র আধুনিক রাস্তা, নিরাপদ শহর, এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানো মানুষ। অন্যদিকে, স্বাধীনতার অর্ধশতক পরও বাংলাদেশ রাজনৈতিক বিভাজন, দলীয় আনুগত্য আর অতীতের দ্বন্দ্বে বন্দি। প্রশ্ন জাগে— আমরা কবে শিখব “প্রথমে দেশ”?)
ইতিহাস আমাদের গর্ব, কিন্তু সেই ইতিহাসকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করি— সেটিই একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
আমার বসনিয়া ভ্রমণ ছিল এক দীর্ঘ যাত্রা — সারায়েভো থেকে তুজলা, মোস্তার, বানয়া-লুকা, স্রেব্রেনিকা হয়ে জেনিকা। একই পথ ধরে ক্রোয়েশিয়া পর্যন্ত। সর্বমোট প্রায় ১,৭০০ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিয়ে একটিও মুহূর্তে মনে হয়নি আমি কোনও ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত’ দেশে আছি। উন্নতমানের বিমানবন্দর ও অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা, প্রশস্ত ও মসৃণ রাস্তা, আধুনিক টোল ব্যবস্থা, সুপরিকল্পিত সেতু, পাহাড়ি উপত্যকার মধ্য দিয়ে ছুটে চলা গাড়ি — সবকিছু আধুনিক ইউরোপেরই অংশ। স্রেব্রেনিকার মতো ভয়ংকর গণহত্যার স্মৃতি বহন করা একটি শহরও আজ পরিচ্ছন্ন, শান্ত এবং এগিয়ে চলেছে।
কসোভোতেও একই দৃশ্য। প্রিজরেন, প্রিস্টিনা, ক্লিনা, টেটোভো হয়ে যখন নর্থ মেসেডোনিয়ার সীমান্তে পৌঁছালাম, তখনও চোখে পড়েনি হতাশা বা অচলাবস্থা। অথচ মাত্র তিন দশক আগে এই অঞ্চল জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল ভয়াবহ জাতিগত সংঘর্ষে। এখনও দেয়ালে গুলির দাগ, পুড়ে যাওয়া ভবন, আর রাস্তার মোড়ে মোড়ে শহীদদের নাম খোদাই করা স্মৃতিস্তম্ভ — কিন্তু সেই অতীত যেন কেবল ইতিহাসের পাতায়, বর্তমানের চলার পথে নয়।
সারায়েভোর প্রধান সড়কের একপাশে উড়ছে বসনিয়ান পতাকা, অন্যপাশে সার্বিয়ান পতাকা। রাস্তার ডানপাশের প্রতিটি বাড়ির সবুজ রঙের হোল্ডিং নাম্বার, আর বামপাশের বাড়িগুলোর হোল্ডিং নাম্বার নীল রঙের— একপাশে বসনিয়ান, অন্যপাশে সার্বিয়ান। অন্যদিকে মোস্তার যাবার পথের ধারে রাস্তায় উড়চে পাশাপাশি ক্রোয়েশিয়ান ও বসনিয়ান পতাকা। একদেশ তিন পতাকা- তিন জাতীয় সঙ্গীত। তবুও দেশটির মুদ্রা এতটাই স্থিতিশীল যে, দুই বসনিয়ান মার্ক সমান এক পাউন্ড। অর্থনীতি দৃঢ় ও শক্তিশালী।
কসোভোতেও মিলেমিশে বাস করছে আলবেনীয় ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী। নেই রাজনৈতিক বিদ্বেষের আগুন, নেই বিভাজনমুখী তীব্রতা। সেখানের তরুনেরা চমৎকার ইংরেজিতে কথা বলে। নেই কোন বেকারত্ব।
দুই জায়গার অভিজ্ঞতা আমাকে বিস্মিত করেছে। যুদ্ধের বিভাজন ভুলে, কিংবা অন্তত পেছনে ফেলে, সবাই একটি লক্ষ্যেই মন দিয়েছে — প্রথমে দেশ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য আছে, কিন্তু তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে জিম্মি করে না। মানুষের সস্তা আবেগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলগুলো জনগণের মাঝে বিভাজন তৈরি করেন না। বরং কাজের সুযোগ তৈরি, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, এবং অবকাঠামো উন্নয়নই তাদের অগ্রগতির মূল চিত্র।
তারপর মনে পড়ল বাংলাদেশের কথা। স্বাধীনতার পূর্ণ পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেছি আমরা। আমাদের স্বাধীনতার গল্প কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, মুক্তির এক বিরাট স্বপ্ন। কিন্তু আজও কেন আমরা বিভক্ত? কেন এখনও “স্বাধীনতার পক্ষ” ও “স্বাধীনতার বিপক্ষ” শিবিরে বিভাজিত হয়ে আছি? এই বিভাজনের রাজনীতির ফল কী পেয়েছি? অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসন — সবখানেই যখন দলীয় আনুগত্য মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন উন্নয়ন কতটা টেকসই হতে পারে?
বসনিয়া ও কসোভোতে আন্তর্জাতিক সহায়তা ছিল, কিন্তু মূল শক্তি ছিল মানুষের ইচ্ছা ও ঐক্য। তারা অতীতকে স্মরণ করে, কিন্তু অতীতের কারণে বর্তমানকে অবরুদ্ধ হতে দেয় না। অথচ বাংলাদেশে অতীতকে আমরা প্রায়ই বর্তমানের রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করি। এমনকি সাম্প্রতিক কালের এক রক্তক্ষয়ী গণআন্দোলনের পরও সেই ‘পক্ষ-বিপক্ষ’ শব্দটাই ঘুরেফিরে আসছে। এতে ইতিহাসের মর্যাদা যেমন ক্ষুণ্ণ হয়, তেমনি ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
আমরা এখনো জানি না — “গৌরবময় ইতিহাসকে ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার” করার সঠিক পদ্ধতি কী। মনে হয় যেন অতীতের গৌরবই বর্তমানের অচলাবস্থার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার চেতনা মানে শুধু অতীতের শ্লোগান নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা, প্রতিষ্ঠান ও সুযোগ তৈরি।
বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের জন্য কখন সময় আসবে প্রতিজ্ঞা করার — “প্রথমে দেশ।” রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, কিন্তু তা যেন জাতীয় স্বার্থের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। শেকড়ের গৌরব নিয়ে, বিভাজন নয় — ঐক্যের শক্তিতে এগোতে হবে আমাদের। তবেই বাংলাদেশও একদিন উন্নত অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধ জীবনযাত্রায় বিশ্বে উদাহরণ হতে পারবে।
সুমন মাহমুদ
লেখক, গবেষক ও টিভি উপস্থাপক

পড়ুনঃ  ওয়ান ইলেভেনের আঁতুড়ঘরে নতুন ডেলিভারীর আয়োজন। সাধু সাবধান !

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here