Home Uncategorised স্রেব্রেনিচার পথে

স্রেব্রেনিচার পথে

240
0

সারাজেভো থেকে স্রেব্রেনিচা — দূরত্ব মাত্র ১১০ কিলোমিটার। কিন্তু এই পথ শুধু কিলোমিটার দিয়ে মাপা যায় না। প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পাহাড়ি মোড় যেন চাপা কান্নার ইতিহাসে ভরা। আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার এই যাত্রা যেন সময়ের গহ্বর পেরিয়ে মৃত্যুর উপত্যকায় প্রবেশ করা।

সারাজেভো ছাড়িয়ে যত এগোনো যায়, পাহাড় আর গভীর অরণ্যের আলিঙ্গনে আলো ক্রমে গিলে ফেলে অন্ধকার। দুপুরের রোদও কোথাও কোথাও গাছের ঘন ছায়ায় হার মানে। উঁচু পাহাড়ের গায়ে মেঘ ঘষে যায়, আর সেই মেঘের ভেতর লুকিয়ে আছে এক সময়ের আতঙ্ক, রক্ত, এবং চিৎকারের প্রতিধ্বনি।

রিপাবলিক অংশে ঢুকতেই চোখে পড়ে সার্ব জাতীয়তাবাদীদের পতাকা—যেন এখনো তারা এই পথের ওপর ক্ষমতার ছায়া ফেলছে। ভাষা সার্বিয়ান, মুখগুলো গম্ভীর, দৃষ্টি কেমন যেন শীতল। পথের ধারে এক সময় মুসলমানদের ঘরবাড়ি ছিল, আজ নেই। একেক গ্রামে এক সময় সত্তর, নব্বই শতাংশ মুসলিম ছিল—এখন শুন্য। মসজিদ নেই, নেই আজানের ধ্বনি। কেবল নতুন নতুন গির্জা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, যেন পুরনো প্রার্থনাগুলোকে চিরতরে ঢেকে দিয়েছে।

ক্রাভিচা… নামটি উচ্চারণ করলেই বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দেয়। ১৯৯৫ সালের জুলাই—মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এখানে ১৩০০ মুসলিম পুরুষ ও ছেলেকে এক গুদামে ঠেলে ঢুকিয়ে গ্রেনেড আর মেশিনগানের গুলিতে শেষ করে দেওয়া হয়েছিল। গুদামটি আজো দাঁড়িয়ে আছে—দেয়ালে গুলির দাগ, ছাদের নিচে রক্তের ইতিহাস শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। পাশে স্যান্ডিচির মাঠে আটক হয়েছিল আরও হাজার খানেক মানুষ—কেউ ফেরেনি।

পোটোচারি পৌঁছাতেই প্রথম যা চোখে পড়ে—সবুজ ঢালে সারি সারি সাদা পাথরের পিলার, প্রতিটির নিচে একটি জীবন, একটি গল্প, একটি নাম। প্রতিটি কবর কেবলার দিকে মুখ ফেরানো, মাথায় আরবীতে খোদাই করা—”আল-ফাতিহা”—যেন পথিককে স্মরণ করিয়ে দেয়, দাঁড়াও, পড়ো, প্রার্থনা করো।

৮,৩৭২… এই সংখ্যা স্মৃতিসৌধের গেটে খোদাই করা আছে, আর পাশে তিনটি বিন্দু—কারণ তালিকা এখনও বাড়ছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিদিন নতুন কবর চিহ্নিত হয়, নতুন সবুজ পিলার বসে যায়। কখনো পাশে দাঁড়িয়ে থাকে খালি কাঠের চিহ্ন—অপেক্ষা করছে, মৃতের পরিচয় মেলাতে পারলেই সাদা পাথর পাবে।

পড়ুনঃ  হিজাবি নারীদের একটি নতুন প্রজন্ম বিনয়ী স্টাইলকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে

প্রধান স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, বাতাস পর্যন্ত ভারী হয়ে গেছে। চারপাশের নীরবতা যেন চিৎকার করে বলে, “আমরা এখানে শুয়ে আছি—যেন তোমরা ভুলে না যাও।”

সেই ওল্ড ব্যাটারি ফ্যাক্টরি… ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে যখন হাজার হাজার মানুষ এখানে আশ্রয় নিয়েছিল, তখন জাতিসংঘের ডাচ সৈন্যরা ছিল দরজায়। কিন্তু বাঁচাতে পারেনি, বরং তুলে দিয়েছিল হত্যাকারীদের হাতে। ৫ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতার গুদামে ঠেসে রাখা হয়েছিল কয়েক গুণ বেশি মানুষকে। পুরুষদের আলাদা করে নেওয়া হলো—বয়স যদি ১৫ থেকে ৫০-এর মধ্যে হয়, তাহলে তাদের ভাগ্য সীলমোহর হয়ে গেল। নারীরা, শিশু, বৃদ্ধদের পাঠানো হলো ট্রাকে, দূরে তুজলার দিকে। আর পুরুষেরা? হয় পাহাড় পেরোতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরেছে, না হয় গুলির আঘাতে এখানেই মাটির নিচে।

গুদামের ভেতর আজো পড়ে আছে কাপড়, ছেঁড়া স্কুলব্যাগ, শিশুর খেলনা, পানির বোতল, রক্তে দাগ ধরা জামা। এগুলো নীরব জাদুঘরের প্রদর্শনী নয়—এগুলো আর্তনাদ, অভিযোগ, অমোচনীয় স্মৃতি।

১১ জুলাই বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে যখন জেনারেল ম্লাদিচ স্রেব্রেনিচায় প্রবেশ করে ঘোষণা দিল—“শহর এখন সার্বদের”—তখন শহরের আকাশ যেন হঠাৎ আরও গাঢ় কালো হয়ে গেল। আর ১৫ মিনিটের মধ্যেই জাতিসংঘের শরণার্থী শিবির জানিয়ে দিল—তাদের আর জায়গা নেই। মৃত্যু তখন দরজায় দাঁড়িয়ে, আর রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরো শহর ভরে গেল প্রার্থনা, কান্না, আর গুলির শব্দে।

যারা পালাল, তারা পাহাড়ের পথে এগোল—১৫ হাজার মানুষ একসাথে। কেউ শেষ গন্তব্যে পৌঁছাল না। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, আর হত্যার ফাঁদ কেটে কেটে তাদের জীবন নিভে গেল পথেই।

স্রেব্রেনিচা—এটি শুধু একটি শহর নয়, এটি ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণহত্যার প্রতীক। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬—চার বছরে দুই লাখ মুসলমান নিহত হয়েছে, বিশ লাখ হয়েছে শরণার্থী। কিন্তু স্রেব্রেনিচার জুলাই—এ যেন পুরো জাতির বুকের ভেতর পুঁতে দেওয়া এক রক্তাক্ত খঞ্জর।

পড়ুনঃ  The future steps of Scala – What to expect from upcoming releases

এখানে দাঁড়ালে মনে হয়—পাহাড়গুলো এখনো রক্তের গন্ধ বহন করে, বাতাসে এখনো লুকিয়ে আছে চিৎকার, আর মাটির নিচে প্রতিটি দেহ বলে যাচ্ছে—“আমাদের ভুলে যেও না।”

সুমন‌ মাহমুদ, লেখক, গবেষক ও টিভি উপস্থাপক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here