নিজে নির্বাচনে জেতার মতো শক্তি না থাকায় জামায়াতে ইসলামী (জেআই) জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের জন্য।
লেখক: মুবাশার হাসান
১৯ আগস্ট, ২০২৫
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং সংগঠিত ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী (জেআই) তাদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত করেছে।
হাসিনা সরকারের আমলে দলটি ভীষণ দমন-পীড়নের শিকার হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জেআই নতুনভাবে শক্তি অর্জন করেছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, জেআই এখন এক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে তাদের লোকজনকে বসাতে সক্ষম হয়েছে।
জেআই বহুদিনের মিত্র বিএনপিকে ছেড়ে দিয়েছে এবং নতুন গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোট বেঁধেছে। এই পার্টি মূলত ছাত্রনেতাদের দ্বারা গঠিত যারা হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল। বিএনপির তুলনায় ভিন্ন অবস্থান নিয়ে তারা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার এজেন্ডায় প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। উদাহরণস্বরূপ, জেআই ও এনসিপি গত মে মাসে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার দাবিতে আন্দোলন করে চাপ সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ইউনূস তাদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত করেন।
কেন জেআই বাংলাদেশে আবার প্রভাবশালী হচ্ছে? এর স্থানীয় ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে অর্থ কী?
হাসিনা সরকারের আমলে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে জেআই ভয়াবহ দমননীতি মোকাবিলা করেছে। গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মতো শীর্ষ নেতাদের হয় ফাঁসি দেওয়া হয়, নয়তো কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন। হাসিনার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতার অভিযোগে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করেছিল। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো আইসিটিকে প্রচণ্ড সমালোচনা করেছে বিচার প্রক্রিয়ার ত্রুটির কারণে। শত শত জামায়াত নেতা-কর্মী কারাগারে গিয়েছেন অথবা গুম-খুন হয়েছেন।
২০১৩ সালে জেআই-এর নিবন্ধন বাতিল করা হয় এবং ২০২৫ সালের ১ আগস্ট এটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ হয়—হাসিনা ভারতে পালানোর মাত্র চার দিন আগে। দমননীতির কারণে অনেক জামায়াত কর্মী নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে আওয়ামী লীগের সদস্য সেজে থেকেছে। কেউ কেউ ছাত্রলীগ ও সরকারি আমলাতন্ত্রেও অনুপ্রবেশ করেছে।
জেআই ইসলামি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং স্থানীয় পর্যায়ে দাতব্য কার্যক্রমের মাধ্যমে সামাজিক, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে শক্তিশালী তৃণমূল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। তবে সমালোচকরা মনে করেন, দলটির দর্শন মূলত অলিবারেল বা অগণতান্ত্রিক কারণ এটি নারী ও সংখ্যালঘুদের সমান অধিকার স্বীকার করে না। সাম্প্রতিক সময়ে দলটি নারী ও সংখ্যালঘু-বান্ধব বক্তব্য দিলেও সমালোচকেরা একে উপরিভাগের পরিবর্তন বলে মনে করেন, মূল আদর্শে নয়।
সমালোচকেরা এটাও তুলে ধরেন যে দলটি মাঝে মধ্যেই সহিংসতায় জড়ায়; যেমন ২০২০ সালে তাদের ছাত্রসংগঠন শিবিরের কর্মীরা এক ছাত্রলীগ নেতার রগ কেটে দেয়। অনেকে বলেন, জেআই নির্বাচনে অংশ নেয় শুধুমাত্র শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। তবে জামায়াত অভ্যন্তরে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়।
জামায়াতের সংবিধান-এ বলা আছে, “আল্লাহ ও নবী মুহাম্মদের নির্দেশনা ছাড়া কোনো নীতি প্রণয়ন করা হবে না।”
দলের ওয়েবসাইট ও প্রশিক্ষণসূচিতে এর প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মওদূদীর রচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় জামায়াত আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মওদূদীকে অনেকে চরমপন্থা ছড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। যদিও কিছু গবেষক মনে করেন, তাঁর কঠোরতা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দমননীতির প্রেক্ষাপটে বোঝা দরকার।
নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে জেআই অনলাইন কর্মীদের মধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, যারা বিএনপি-বিরোধী আলোচনাকে মূলধারায় আনার ক্ষেত্রে কিছুটা সফল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে তারা উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করেছে। সম্প্রতি জেআই-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ নিয়ে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে, যেখানে এক সাবেক মার্কিন কূটনীতিকসহ বিদেশি অতিথিরা অংশ নেন, অথচ অনেকে জানতেন না অনুষ্ঠানটি জামায়াত আয়োজন করেছে।
শিবির এখন এনসিপির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক জোটে কাজ করছে, ফলে ঢাবিতে বিএনপিপন্থী ছাত্রদলের প্রভাব কমে গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে জেআই মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগী হওয়ার কলঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগের ‘৭১-এর চেতনা’কে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর কারণে এই ইস্যুটি ধীরে ধীরে ভোটারদের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টা ছিলেন, সম্প্রতি বলেছেন যে “‘৭১-এর পক্ষে বা বিপক্ষে’ রাজনীতি যারা পুনর্জীবিত করতে চাচ্ছে, তারা দেশকে পুরোনো কাঠামোয় টেনে নিতে চাইছে।” অনেকে এটিকে জেআই-এর প্রতি সহানুভূতিশীল মন্তব্য হিসেবে দেখছেন।
জেআই আরও বড় জোট গঠনের চেষ্টা করছে খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন ও হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামপন্থী দল ও ধর্মভিত্তিক সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে। এতে বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতি আরও ডানদিকে সরে যাবে। এর ফলে বিএনপি, যা আগে ডান-ঘেঁষা দল হিসেবে পরিচিত ছিল, হাসিনা-পরবর্তী সময়ে আরও কেন্দ্রঘেঁষা অবস্থান নিয়েছে।
তবে বাস্তবিক অর্থে জেআই এককভাবে বড় ভোট পাবে না। তাই এনসিপির সঙ্গে তারা জোট করেছে, যদিও এনসিপিও নির্বাচনে তেমন জনসমর্থন পায় না।
আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, জেআই বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে—বিদ্যমান ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (এফপিটিপি) থেকে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ব্যবস্থায়। এতে আসন বণ্টন হবে ভোটের শতকরা হারের ভিত্তিতে, যা ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে। বিএনপি এ পরিবর্তনের বিপক্ষে।
জেআই-এর এই পুনরুত্থান শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য নয়, বৈশ্বিক ইসলামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার বাইরে বেশিরভাগ দেশে ইসলামপন্থীরা সরকারি চাপের মুখে।
তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বাংলাদেশের জামায়াতকে সমর্থন দিচ্ছে। এরদোয়ান সরকার বাংলাদেশে রক্ষণশীল রাজনীতি সমর্থনকারী দল ও গোষ্ঠীর ওপর তাদের আর্থিক, কৌশলগত ও আদর্শিক প্রভাব বাড়িয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব আরও কমবে।
🖋 লেখক: মুবাশার হাসান, পিএইচডি
সিডনিভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির গবেষক ও বিশ্লেষক।
দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুদিত।





