Home ইতিহাস তুরস্কে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান ও ক্রমবিকাশ (১৯৪৫-১৯৬৫)

তুরস্কে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান ও ক্রমবিকাশ (১৯৪৫-১৯৬৫)

172
0


১৯৪৫ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সময়কালকে তুরস্কে রাজনৈতিক ইসলামের “আভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির সময়কাল” বলা যায়। আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষতার কঠোর কাঠামো ভেঙে ডেমোক্র্যাট পার্টি ধর্মকে রাজনীতিতে পুনরায় প্রবেশের সুযোগ দেয়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর রক্ষণশীলতা, নগরায়ণ, শিক্ষার প্রসার এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রায়ন রাজনৈতিক ইসলামের উত্থানের জন্য সামাজিক ভূমি তৈরি করে।

ফেলাফত থেকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র
অটোমান সাম্রাজ্য (১২৯৯—১৯২২) ইসলামী খেলাফতের ধারক হিসেবে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়। সুলতানরা রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি খলিফা হিসেবে ধর্মীয় কর্তৃত্বও বহন করতেন। তবে উনবিংশ শতাব্দীর তানজিমাত সংস্কার (১৮৩৯—১৮৭৬) ইসলামের রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত করতে শুরু করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯২৩ সালে মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। খেলাফত বিলুপ্তি, শরিয়াহ আদালত বাতিল, আরবি আযান নিষিদ্ধকরণ এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্র ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তবুও গ্রামীণ ও রক্ষণশীল জনগোষ্ঠীর গভীর ইসলামী পরিচয় পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ইসলামের পুনরুত্থানের ভিত্তি স্থাপন করে।

সাইদ নুরুসীর ভূমিকা
এই সময়ে বদিউজ্জামান সাইদ নুরুসি ইসলামের সংস্কারমূলক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর লেখা ও শিক্ষা, বিশেষ করে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সমাজের নৈতিক সংস্কারের ওপর জোর, তুরস্কের মুসলিম সমাজে চুপিসারে গভীর প্রভাব ফেলে। যদিও সাইদ নুরুসীর কার্যক্রম সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করেনি, তার আন্দোলন সামাজিক ও নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে, যা ১৯৪৫—১৯৬৫ সালের মধ্যে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থানের জন্য প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করে।

বহুদলীয় রাজনীতি ও ইসলাম
ইসমেত ইনোনু (১৯৩৮-১৯৫০) আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বজায় রাখলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক চাপের কারণে কিছুটা নমনীয়তা আনেন। ১৯৪৬ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয়। ১৯৫০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট পার্টি (ডিপি) বিপুলভাবে জয়লাভ করে।

ডিপি সরকার ধর্মকে সীমিতভাবে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনে-

১৯৫০ সালে আরবি আযান পুনঃপ্রবর্তন।

মসজিদের সংখ্যা ১৯৫০ সালে প্রায় ৪০,০০০ থেকে ১৯৬০ সালে ৬০,০০০-এ বৃদ্ধি।

পড়ুনঃ  একটি পানির পাত্র আর এক ফিলিস্তিনী কিশোরীর গল্প

১৯৫১ সালে ইমাম-হাতিপ স্কুল পুনঃপ্রতিষ্ঠিত, ১৯৬০ সালে ১৯টি স্কুলে বৃদ্ধি।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এসব পদক্ষেপে ডিপি গ্রামীণ ও রক্ষণশীল জনগোষ্ঠীর সমর্থন অর্জন করে এবং ইসলামের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

১৯৬০-এর সামরিক অভ্যুত্থান ও নতুন সংবিধান
১৯৬০ সালে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ডিপি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তবে ইসলামী ভোটব্যাংক অক্ষুণ্ণ থাকে। ১৯৬১ সালের সংবিধান নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি করে। ইসলামপন্থীরা সংগঠিত হওয়ার ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার নতুন সুযোগ পায়।
১৯৬৫ সালের নির্বাচন
১৯৬৫ সালের নির্বাচনে জাস্টিস পার্টি ৫২.৯% ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়। ইসলামী ভোটব্যাংক রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং ধর্মীয় প্রবণতা ক্রমশ রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশ করে।
১৯৪৫—১৯৬৫ সালকে তুরস্কে রাজনৈতিক ইসলামের প্রস্তুতি পর্ব বলা যায়। বহুদলীয় রাজনীতি, ডিপির ধর্ম-বান্ধব নীতি, গ্রামীণ রক্ষণশীলতা, সাইদ নুরুসীর সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব, এবং ১৯৬১ সালের সংবিধান মিলিয়ে ইসলাম রাজনীতিতে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে। এই প্রক্রিয়াই পরবর্তীকালে মিল্লি নিযাম পার্টির প্রতিষ্ঠার জন্য ভিত্তি তৈরি করে। (সংক্ষেপিত)

সুমন মাহমুদ
লেখক, গবেষক ও টিভি উপস্থাপক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here