Home Uncategorised হৃদয়ে বসনিয়া

হৃদয়ে বসনিয়া

212
0


যে শহরটির আকাশজুড়ে প্রাচীন মসজিদের মিনার আর ইউরোপীয় ক্যাথেড্রালের ঘণ্টাধ্বনি একসাথে বেজে ওঠে, সেই শহরটির নাম সারায়েভো। আর এই সারায়েভোর হৃদয় জুড়েই যে দেশ, তার নাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। নির্জন পাহাড়ের অঙ্গুরীয়ালতা, কুয়াশায় ঢাকা অলিগলি, বরফে মোড়া গিরিখাত আর ইতিহাসে লেপ্টে থাকা কান্না—হাসির দোলাচল। এই দেশটিকে একবার চোখে দেখলে, মন তাকে আর ছাড়তে চায় না। বসনিয়া যেন এক দীর্ঘশ্বাসে বলা ভালোবাসার নাম, এক ছুঁয়ে যাওয়া অতীত আর প্রতিশ্রুত ভবিষ্যতের রঙিন চিঠি।
এই দেশের মাটি শুধু পাহাড়ে গড়া নয়, ইতিহাসে রক্তমাখা। ১৯৯০—এর দশকের গোড়ার দিকে যে দেশটি যুদ্ধ আর বিভাজনের বিভীষিকায় পুড়েছিল, সেই দেশই আজ ধীরে ধীরে দাঁড়াচ্ছে। নতুন প্রজন্মের চোখে আমি দেখি সম্ভাবনার ঝিলিক। বসনিয়া আমাদের শিখিয়েছে, ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস কাকে বলে, ধর্ম ও জাতির পার্থক্য সত্ত্বেও ভালোবাসা কিভাবে একে অপরের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। সরায়েভোর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বোসনা আর মিলজ্যাকা নদীর ঢেউগুলোর মতই, এই দেশের মানুষও যেন বলে—‘তুমি ফিরে এসো, আমরা অপেক্ষায় থাকবো।’
বসনিয়ার পথে পথে হাঁটলে বোঝা যায়, ইতিহাস কেবল জাদুঘরের দেয়ালে টাঙানো চিত্র নয়, রাজনীতির ভাষা নয়, রাজনীতিবিদদের সস্তা কোন বুলি নয় বরং মানুষগুলোর চোখের ভাষা, কফির কাপের গন্ধ, হাম্মামের পুরনো দরজা, আর গানে গানে লুকানো হাজারো আশা। এই দেশটিকে বিদায় জানানো মানে, এক বন্ধুকে পেছনে ফেলে যাওয়ার বেদনা বুকে চেপে ধরা। অথচ বসনিয়া কাউকে আটকে রাখে না, সে বরং মনে করিয়ে দেয়—তুমি ফিরে এসো, দরজাটা খোলা আছে।
আমি জানি, এই জনপদে আমি আবার ফিরবো। আবার বসনিয়ান কফির কাপ হাতে বসে দূর পাহাড়ের দিকে চেয়ে থাকবো। মসজিদের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি শুনে মনে করবো—এই শহরের প্রতিটি প্রার্থনায় আমার নাম জড়িয়ে আছে। আমি আবার বসনিয়ার বাজারে হারিয়ে যাব, পুরনো বইয়ের দোকানে ঢুকে সযত্নে তুলে নেব কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত কবির লেখা কাব্যগ্রন্থ। আমি আবার বসনিয়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে বলবো, “তোমাকে চিরতরে ভালোবেসেছি।”
বসনিয়া কেবল একটি দেশ নয়, এটি এক অনুভূতির নাম। তৃতীয় বিশ্বের মুসলমান হিসেবে, একজন পর্যটক হিসেবে, একজন অতি ক্ষদ্রতায় লেখক হিসেবে, সর্বপরি একজন মানুষ হিসেবে আমি যে অনুভব করেছি, তা আমার রক্তে মিশে গেছে। বসনিয়ার দিগন্তপানে তাকিয়ে আমি আশাবাদী। এ দেশ আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে, শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতিতে নতুন আলো জ্বালাবে। পৃথিবীর মানচিত্রে একটি ক্ষুদ্র, কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে বসনিয়া ফিরে আসবে—এই আমার বিশ্বাস।
আমার ফেরা অবধারিত। কারণ বসনিয়া আমাকে নিজের করে নিয়েছে। আমি চলে গেলেও, সে রয়ে গেছে আমার হৃদয়ে। আর হৃদয়ের সঙ্গে কারই বা বিচ্ছেদ ঘটে! বসনিয়া, আমি আবার আসবো। এই কথা তোমার আকাশে গুঞ্জন তুলুক, তোমার মিনারে গেয়ে উঠুক—“তোমাকে চিরতরে ভালোবেসেছি।”
বোসনা, ড্রিনা, নেরেৎভা, সাবা ও বুনার বুকের এই জনপদ যেমনি জেগেছে, তেমনি জাগবে পৃথিবীর প্রতিটি দরিয়ার অববাহিকার জনপদ। এই প্রত্যাশা…
“যদি তুমি এমন কোনো ভূমি দেখতে চাও, যেখানে যুদ্ধের ছাইয়েও আশা জন্মায়, তবে বসনিয়ায় এসো। এখানে ইতিহাস কাঁদে, আবার হাসেও…”

পড়ুনঃ  পুরুষের লম্বা চুল নিয়ে যে কারণে সমাজে বিতর্ক

সুমন মাহমুদ
লেখক, গবেষক ও টিভি উপস্থাপক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here