প্রতি বছর ৩০ আগস্ট বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। এ উপলক্ষে আজ শুক্রবার সকাল ১০.০টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS)-এর উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে গুমের শিকার ভিকটিম পরিবারের সদস্যরা, মানবাধিকার কর্মী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, গুম কমিশনের সদস্য এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় স্বাগত বক্তব্য ও প্রোগ্রামের ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। এরপর একে একে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার ও স্বজনেরা তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
গুমের শিকার ভিকটিম ও পরিবারের পক্ষে বক্তব্য রাখেন— মাইকেল চাকমা, কর্নেল হাসিনুর রহমান, জিয়াউর রহমান (গুমের শিকার হাফেজ জাকিরের ভাই), গুমের শিকার মো. আল আমিন ও তার স্ত্রী জেসমিন আরা বিউটি, আব্দুল বাসেত মারজান, শহিদুল ইসলাম (গুমের শিকার মহিদুল ইসলামের ভাই), আশিকুর রহমান (গুমের শিকার আতিকুর রহমানের ভাই), জামাল উদ্দিন আহমেদ (গুমের শিকার ইশরাক ফাহিমের পিতা), ও ভারত থেকে ফেরত আসা গুমের শিকার রহমাতুল্লাহসহ প্রমুখ।
বিগত সরকারের আমলে গুমের শিকার মাইকেল চাকমা বলেন- গুম কমিশন গঠনের এক বছর পার হলেও যারা গুম হয়েছে তাদের সন্ধান দিতে পারে নি এই সরকার। গুমের বিচার কোন আইনে, শাস্তি, সুরক্ষা কিভাবে হবে তা চূড়ান্ত করা হয়নি। আমরা ভেবেছিলাম এই সরকারের আমলে গুমের বিচার হবে, তবে যে প্রক্রিয়ায় সরকার আগাচ্ছে, তাতে গুমের সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হবে কি না তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। সরকার যে উদ্যোগ গুলো নিয়েছে তা বাস্তবায়ন হোক, ভবিষ্যতে যারা আসবে তারা যেন এই কমিশনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। ভবিষ্যতে যেন কোনো সরকার গুম খুনের চিন্তাও যেন করতে না পারে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে গুম কমিশনের সদস্য মো. নূর খান লিটন, জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার উপদেষ্টা হুমা খান, ব্যারিস্টার সারা হোসেন (নির্বাহী পরিচালক, ব্লাস্ট), ব্যারিস্টার এস এম মইনুল করিম (প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল, ICT) এবং ড. নাবিলা ইদ্রিস (গুম কমিশনের সদস্য) গুম প্রতিরোধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
গুম কমিশনের সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, “সিস্টেম পরিবর্তন না করে যদি শুধু আমরা ব্যক্তি বিশেষকে টার্গেট করে এই গুমের সংস্কৃতি দূর করা সম্ভব নয়। আমাদেরকে সশস্ত্র বাহিনীগুলোর ক্যারেক্টার পরিবর্তন করতে হবে। বাহিনী গুলোকে পর্যাপ্ত ম্যানপাওয়ার দিতে হবে। কিভাবে ননলিথাল ওয়েতে টর্চার না করে তথ্য বের করতে হয়, সেই ট্রেনিংয়েরও ব্যবস্থা করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত পলিটিক্যাল পার্টি গুলো এই বাহিনী গুলোকে নিজেদের পলিটিক্যাল পান্ডা হিসেবে ব্যবহার করবে, ততদিন পর্যন্ত ঘুম খুন দূর হবে না। এজন্য ভবিষ্যৎ নেতাদের কাছ থেকে আমাদের এসব ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে এবং সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তাদেরকে দায়বদ্ধ করতে হবে।”
ব্লাস্ট-এর নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, “দল মত নির্বিশেষে সকলেই গুম খুনের শিকার। আইনের খসড়ায় অনেক প্রশ্ন রয়েছে। বিগত সময়ের সরকারি আমলারা এখনও পরিবর্তন হয়নি। আগামীতে আবারও কোন দলীয় সরকার প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কিছু করতে চান, তখন সেটি আটকাবে কে? আমরা আর সেদিনে যেতে চাইনা। ন্যায় বিচার প্রয়োজন। বিচারের দায়িত্ব ভুল ব্যক্তির কাছে গেলে হবেনা।”
জাতিসংঘের আবাসিক অফিসের জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার উপদেষ্টা হুমা খান বলেন, “গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার এখনও ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি হস্তান্তর ও মৃত্যু সনদের মতো মৌলিক বিষয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেকের নামে এখনো মিথ্যা মামলা চলছে, যা দ্রুত নিষ্পত্তি করা দরকার। প্রস্তাবিত নতুন আইনে গুমের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে মিল নেই এবং শুধু বিভাগীয় শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যা যথেষ্ট নয়। আইনটি যেন ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য নয় তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।”
মানবাধিকার কর্মী ও গুম কমিশনের সদস্য মো. নূর খান লিটন আশা ব্যক্ত করে বলেন, “আগামীর বাংলাদেশে যেন গুম শব্দটি না থাকে, সে জন্য আমাদের যা যা করণীয় তা করতে হবে। আমরা সবাই মিলে ফ্যাসিজম তাড়িয়েছি, কিন্তু আমাদের নিজেদের মধ্যে যে ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিস্ট মনোভাব রয়েছে সেটিও দূর করতে হবে। আমাদের যে কাজগুলো ফ্যাসিজম ফিরে আসার পথ খুলে দেয়, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। গুম মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ রূপ। তাই এর প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য রাখেন— ড. মাহদী আমিন (বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা), এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী), আরিফুল ইসলাম আদীব (জাতীয় নাগরিক পার্টি) এবং শহীদুল্লাহ কায়সার (নাগরিক ঐক্য)।
জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, “গুম কমিশন তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, কিন্তু আমরা সেখানে ডিজিএফআই, এনএসআই এর কোন বক্তব্য পাইনি। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে নানান সংস্থা। পুরনো স্টাবলিশমেন্ট এখনো যার যার যায়গায় সক্রিয় রয়েছে, তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি । আমরা এর আগেও বলেছি এনএসআই, ডিজিএফআই সংস্কার করতে হবে। তাদের যেসকল কর্মকর্তা ও সদস্যরা গত ১৫ বছর গুম ও খুনের সাথে জড়িত ছিলো, তাদের নাম তালিকা করে প্রকাশ করতে হবে এবং বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এই পুরনো স্ট্যাবলিশমেন্ট বহাল তবিয়তে রেখে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করা হলে তাদেরকে পুনরায় নির্বাচন প্রভাবিত করার সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু এই নতুন বাংলাদেশে তা আর হতে দেওয়া হবে না।”
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে আমরা এই গুম খুনের সংস্কৃতিকে কোন অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না। একই সাথে এই ধরনের সংস্কৃতি যেন আর ফিরে না আসে, তার জন্য যত ধরনের আইনি, রাজনৈতিক এবং নৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন তা আমাদের করতে হবে। এ বিষয়ে আমাদের সকল রাজনৈতিক দলের টপ লিডারদের একসাথে কাজ করা উচিত। ভিন্ন মত, রাজনীতি, সংস্কৃতি থাকবে, কিন্তু এসব দমাতে কোন ধরনের অমানবিক কার্যক্রমের সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন জড়িত থাকতে না পারে, এটি আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে।”
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন জনাব তারেক রহমানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, “আমরা যদি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাই, সেক্ষেত্রে আমাদের তিনটা উদ্দেশ্য থাকবে। মানবাধিকার, আইনের অনুশাসন এবং বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এই তিনটা বিষয় নিশ্চিত করতে তার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম অবশ্যই আমাদের করতে হবে। এর পাশাপাশি গুম খুনসহ মানবাধিকার বিরোধী কার্যক্রমের বিচার প্রয়োজন। যারা গুম খুনের শিকার হয়েছেন তাদের একটা তালিকা করা হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে আমরা তাদের পাশে দাড়াবো, এটা আমাদের একটা প্রতিশ্রুতি। গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের নামে আমরা তাদের এলাকায় সরকারি স্থাপনা গড়ে তুলবো। তাদের পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সাহায্য নিশ্চিত করবো। এই মানুষগুলোর আবেগ, আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে। আমাদের মত ও পথ ভিন্ন হলেও আমরা বিশ্বাস করি সবার আগে বাংলাদেশ। এটা আমাদের কাজে প্রমাণ করতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের উর্ধ্বে গিয়ে দেশের স্বার্থে একযোগে কাজ করতে হবে।”
সভায় HRSS এর সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান গুম প্রতিরোধে সাত দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবি গুলো হলো-
১. বাংলাদেশকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন তাদের সম্পর্কে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের পরিবারকে তথ্য দিতে হবে। প্রতিটি গুমের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃস্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। চলমান মামলা ও অভিযোগসমূহের ক্ষেত্রে আলামত সংরক্ষণ, ভুক্তভোগী, ও স্বাক্ষী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. গুমের ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশনকে আরও শক্তিশালী, কার্যকর ও স্থায়ী করতে হবে।
৪. গুমের শিকার ভিকটিম ও তাদের পরিবারের জন্য আইনি, আর্থিক ও মানসিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। যারা দীর্ঘদিন গুমের শিকার তাদের পরিবারকে ভিকটিমের ব্যাংক একাউন্ট ও সম্পদ ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংসদীয় তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং বাহিনীর সকল সদস্যকে নিয়মিত মানবাধিকার বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।
৬. দেশের দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলসমূহকে তাদের নেতাকর্মীকে নিয়মিত মানবাধিকার বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান এবং দলের নীতিমালা ও ইশতিহারে মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৭. জনসচেতনতার জন্য পাঠ্যপুস্তক ও গণমাধ্যমে মানবাধিকার, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম বিষয়ে গুরুত্বসহ উল্লেখ করতে হবে।
- প্রেস বিজ্ঞপ্তি



