Home মতামত ইসরাইল হতে ইন্ডিয়া: সৌদিআরব ও পাকিস্তানের সামরিক চুক্তি।

ইসরাইল হতে ইন্ডিয়া: সৌদিআরব ও পাকিস্তানের সামরিক চুক্তি।

150
0

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, রিয়াদের আল ইয়ামামাহ প্রাসাদে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে যে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, তা শুধু দুটি দেশের সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেয়নি, গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণকে নতুন এক বাস্তবতায় এনে দাঁড় করিয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, যেকোনো এক দেশের ওপর আক্রমণ হলে তা অপর দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবেই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আক্রমণ মানে সৌদি আরবের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা, কিংবা সৌদির ওপর আক্রমণ মানে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা যন্ত্রণা সক্রিয় হয়ে উঠবে। এই ঘোষণার পেছনে গভীর ভূরাজনৈতিক উত্তাপ রয়েছে—ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ইসরায়েলের সামরিক প্রভাব বিস্তার, এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন জোট-প্রবণতা।

সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি। একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। চুক্তির ফলে সৌদি আরব কার্যত সেই “পারমাণবিক ছাতার” সুরক্ষা পাচ্ছে। যদিও রিয়াদ সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র হাতে পাচ্ছে না, তবুও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য এটি এক গুরুতর বার্তা—সৌদি আরব এখন এমন এক জোটের অংশ, যার হাতে কার্যকরী পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে। এটি ইরানের জন্য নিঃসন্দেহে নতুন এক ধাক্কা এবং ইসরায়েলের জন্যও চিন্তার কারণ, কারণ পাকিস্তান এতদিন সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণে অংশ না নিলেও, এখন আনুষ্ঠানিকভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে।

চুক্তিটি কেবল পারমাণবিক প্রতিরোধেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে প্রচলিত সামরিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। পাকিস্তানি সেনারা সৌদি আরবে আগেও উপস্থিত ছিল, তবে এবার তাদের ভূমিকা আরও আনুষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি হয়ে উঠবে। এর মাধ্যমে রিয়াদ শুধু সামরিক দক্ষতাই পাচ্ছে না, বরং ইসলামাবাদের যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সেনাদের কৌশলগত পরামর্শও কাজে লাগাতে পারবে।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের জন্য এই চুক্তি আর্থিক লাইফলাইন হিসেবে কাজ করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশটি আর্থিক সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ও ঋণের বোঝায় জর্জরিত। সৌদি আরবের আর্থিক সহায়তা, বিনিয়োগ এবং জ্বালানি সরবরাহে সুবিধা ইসলামাবাদের জন্য টিকে থাকার এক অবলম্বন। সৌদি তেল ও বিনিয়োগের প্রবাহ পাকিস্তানি অর্থনীতিতে স্বস্তি আনতে পারে, আর বিনিময়ে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা সৌদি রাজতন্ত্রকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে। এটি এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, যেখানে এক পক্ষ নিরাপত্তা দেয় আরেক পক্ষ অর্থনৈতিক স্বস্তি যোগায়।

পড়ুনঃ  মসীহের জন্য অপেক্ষা করেনি জায়ানবাদীরা

তবে এই জোট আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। ভারত বিষয়টিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার সাথে এখন সৌদি আরব সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে। ভারতের কাছে এটি শুধু পাকিস্তানের শক্তি বৃদ্ধি নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইসলামাবাদের প্রতি খোলাখুলি কৌশলগত সমর্থন। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলও সমানভাবে অস্বস্তি অনুভব করছে। পাকিস্তান এতদিন তাদের প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী না হলেও এখন নতুন এক অক্ষ গড়ে উঠছে, যেখানে রিয়াদ ও ইসলামাবাদ একত্রে অবস্থান করছে।

এই চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে, ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারত ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করে আসছে। ভারত ইসরায়েলের জন্য অস্ত্র তৈরি করছে এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, ইসরায়েল ভারতের নিরাপত্তায় বিশ্বাসযোগ্য সহযোগী এবং বিভিন্ন সময় বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে। এই চুক্তি ভারতের জাতীয় স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল এবং দেশের নিরাপত্তা ও চুক্তির দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতি শর্তহীন সমর্থন প্রদান করে আসছে। এদিকে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে, আমেরিকা এই চুক্তির প্রতি নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। অন্যদিকে, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি পেলে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব কমে যেতে পারে।
এ চুক্তিকে তাই অনেক বিশ্লেষক দেখছেন দ্বিমুখী বাস্তবতায়। একদিকে এটি সৌদি আরবের নিরাপত্তায় নতুন নিশ্চয়তা দিচ্ছে এবং পাকিস্তানের অর্থনীতি ও কূটনীতিকে মজবুত করছে। অন্যদিকে এটি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও জোট রাজনীতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইসরায়েলের কৌশলগত পরিকল্পনা এবং ভারতের ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ সব মিলিয়ে এই চুক্তি ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে একটি প্রশ্ন এখন সামনে—এই জোট কি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে, নাকি নতুন এক অনিশ্চয়তার দরজা খুলে দেবে?

পড়ুনঃ  লাল নীল লাল নীল বাত্তি দেইখা নয়ন জুড়াইছেলন্ডন শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে

(সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর, গাল্ফ নিউজ ও আল জাজিরা)
সুমন মাহমুদ
লেখক, গবেষক ও টিভি উপস্থাপক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here