Home মতামত বহুত্ববাদী রাজনীতির পথে জামায়াতের লোগো পরিবর্তন।

বহুত্ববাদী রাজনীতির পথে জামায়াতের লোগো পরিবর্তন।

379
0

পত্রিকায় দেখলাম যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি তাদের দলীয় লোগো থেকে কুরআনের আংশিক আয়াত সরিয়ে দিয়েছে। এই পরিবর্তন নিয়ে জনপরিসর ও সোস্যাল মিডিয়ায় নানা আলোচনাও শুরু হয়েছে। কেউ একে দলের নীতি থেকে সরে আসা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, আবার কেউ দেখছেন যে দলটির ইসলামি দৃঙ্গির উদারতা। আবার কেউ কেউ দলটিকে ইসলামি মর্যাদাহানির আশঙ্কা হিসেবে দেখছে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে জামায়াতের এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী, যৌক্তিক এবং সম্মানজনক বলেই প্রতীয়মান হয়। আমার তো মনে হয় জামায়াতের এই সিদ্ধান্ত আরও অন্তত বিশ বছর আগে নেওয়া উচিত ছিল। জামায়াতে এই সিন্ধান্ত দলটির ইসলামি আদশ পিছিয়ে আসা নয় বরং এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।
প্রথমত, কুরআনের আয়াত রাজনৈতিক প্রতীকে ব্যবহার করা পবিত্র কুরআনের মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন প্রচারসামগ্রী যেমন লিফলেট, পোস্টার বা ব্যানার সাধারণত জনসমাগমে ছিঁড়ে যায়, মাটিতে পড়ে থাকে কিংবা অবমাননাকর অবস্থায় ব্যবহৃত হয়। এতে অনিচ্ছাকৃতভাবেই কুরআনের আয়াত অসম্মানিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। প্রতীক থেকে আয়াত অপসারণের মাধ্যমে আসলে কুরআনের মর্যাদাকেই রক্ষা করা হয়েছে—একটি রাজনৈতিক দলের প্রচারণার সীমিত পরিসরের বাইরে রেখে। এমনকি এমনও দেখা গেছে যে দলীয় লিফলেটে কুরআনের আয়াত থাকার কারনে অনেক অমুসলিম কখনও কখনও দলটির লিফলেট বা প্রচারসামগ্রি গ্রহণ করতে ইতস্তত করতেন। ছোট বেলায় দেখেছি যখন দলীয় কোন পুরাতন বই বা লিফলেট দোকানে বিক্রি করতে যেতাম, তখন কুরআনের ছোট আয়াত সম্বলিত লোগো থাকাতে দোকানদার সেটা কিনতেও চাইতেন না। এটা শুধু তকের খাতিরে একটা উদাহরণ।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মুসলিম বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশ (বা কেউই) প্রতীকে সরাসরি কুরআনের আয়াত ব্যবহার করে না। এমনকি আংশিকও না। আমার দেখা মতে, উদাহরণস্বরূপ, তিউনিসিয়ার এনাহ্‌দা পার্টির প্রতীক কবুতর ও চাঁদ, মরক্কোর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির প্রতীক বাতি বা লন্ঠন, তুরস্কের একেপির প্রতীক লাইটবাল্ব। মালয়েশিয়ার PAS ব্যবহার করে সাদা চাঁদ, মালদ্বীপের আদালাথ পার্টি ব্যবহার করে খেজুরগাছ ও তারা। মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড কুরআনের ছবি ব্যবহার করলেও আয়াত অন্তর্ভুক্ত করেনি। অর্থাৎ, বাংলাদেশের জামায়াতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত কোনো বিচ্যুতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক ধারা অনুসরণেরই প্রকাশ। এমনকি আমি আরও কয়েকটি দেশের ইসলামিক রাজনৈতিক দলের লোগোতে এমনটাই দেখেছি।
তৃতীয়ত, এই পরিবর্তনের মধ্যে বহুত্ববাদী রাজনীতির চর্চা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন রয়েছে। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি দলের লক্ষ্য কেবল নির্দিষ্ট শ্রেণি বা সম্প্রদায় নয়; বরং সাধারণ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া। প্রতীক পরিবর্তন এই অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনাকেই স্পষ্ট করে, যা বহুত্ববাদ ও ভিন্নতার প্রতি সম্মানের প্রকাশ।
চতুর্থত, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জামায়াতের সামনে সাংগঠনিক সংস্কারের একটি নতুন সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রটি আরও প্রসারিত করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এখানে শিক্ষণীয়: তুরস্কের একেপি ও সাদত পার্টি নারী নিয়ে আলাদা বিভাগ গড়ে তুলেছে, পাকিস্তানের জামায়াত নারী শাখাকে কার্যকরভাবে অনেক সংগঠিত করেছে, মরক্কোর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি নারী নেতৃত্বকে স্থান দিয়েছে এবং সেখানে দেখেছি ডক্টর ঘানুশির মত একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা ইসলামি চিন্তাবিদ তার দলের কেন্দ্রে নারীকে স্থান দিয়েছেন। মালয়েশিয়াতেও তাই দেখেছি। মিশরের রাবা স্কয়ারে নারীদের ভূমিকাও বিশ্ববাসী দেখেছে। এসব দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে, ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলনের ভেতরে নারীর আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ ও উপস্থিতি কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতার অপরিহার্য অঙ্গ।
আমি নিজে কয়েকটি ইসলামি দেশের রাজনৈতিক সমাবেশে নারীর অংশগ্রহণ দেখেছি। মরক্কো ও তিউনিসিয়ায় তাদের দলীয় অফিসে নারীদের আসা যাওয়া করতেও দেখেছি। দেখেছি যে তারা সরাসরি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমি যখন বসনিয়া সফরে যাই তখন দেখি যে সারায়েভোর গাজী হুসরেভ মাদ্রাসায় একদল আরবি প্রতিনিধি দল প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করতে আসেন। জানতে পারি যে তারা মুসলিম ব্রাদারহুড জর্ডান শাখার নেতৃবৃন্দ। সেখানে পুরুষ ও নারীকে উভয়েই প্রতিনিধি দলের সমান সংখ্যক সদস্য হিসেবে দেখেছি।
ফলত, জামায়াতের প্রতীক পরিবর্তনকে কোনো বিতর্কিত বা নেতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায় না। বরং এটি ইসলামের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখার, বহুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষার এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে নিজেদের পুনর্গঠনের এক দূরদর্শী পদক্ষেপ। যদি এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারা সাংগঠনিক কাঠামোয়, বিশেষ করে নারী অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়, তবে জামায়াত শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিতেই নয়, বৈশ্বিক ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারায়ও একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে সক্ষম হবে।

পড়ুনঃ  মসীহের জন্য অপেক্ষা করেনি জায়ানবাদীরা

সুমন মাহমুদ
লেখক, গবেষক ও টিভি উপস্থাপক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here