তারিখঃ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ঢাকা
বাংলাদেশে সেপ্টেম্বর মাসে সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক—এমন তথ্য উঠে এসেছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর মাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। সংগঠনটির প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, এ সময় রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন, শ্রমিক নির্যাতন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু এবং সীমান্তে নির্যাতনের মতো নানা ঘটনায় মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার অন্তত ৩৭টি ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ২৬৮ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অন্তর্কলহে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে। নরসিংদীর আলোকবালী ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
এ মাসে সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ৩২টি ঘটনায় অন্তত ৪২ জন সাংবাদিক হামলা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে দুই সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার হওয়া দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গণপিটুনির ঘটনায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও রয়েছেন। একই সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর ৮টি হামলা, ২টি মন্দির ভাঙচুর, ২০টি প্রতিমা ভাঙচুর এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৫টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। খাগড়াছড়ির গুইমারায় সেনা সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে তিন পাহাড়ি নিহত হওয়ার ঘটনাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নজির হিসেবে প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
সীমান্ত পরিস্থিতিও ছিল অস্থির। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ১৩২ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করেছে, আহত হয়েছে ২ জন এবং গ্রেফতার ১৩ জন। অপরদিকে মিয়ানমারের আরাকান আর্মি বঙ্গোপসাগর থেকে ৪০ জন বাংলাদেশি জেলে ধরে নিয়ে গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ও হেফাজতে ৮ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছে এইচআরএসএস। এছাড়া কারাগারে মারা গেছেন অন্তত ৫ জন বন্দী।
শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ জন, আর কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১৮ জন শ্রমিক। নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ—সেপ্টেম্বর মাসে ১৫৯ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার, যার মধ্যে অন্তত ৫৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১৩৩ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে ২৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
রাজনৈতিক মামলায়ও সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাপক গ্রেফতার অভিযান চালানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামে অন্তত ৬টি মামলা হয়েছে, যেখানে আসামি করা হয়েছে শত শত নেতাকর্মীকে। এছাড়া বিশেষ অভিযানে ১১ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এইচআরএসএস মনে করে, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সংগঠনটির আহ্বান—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেই কেবল মানবাধিকার পরিস্থিতি উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।






