অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তের মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৬০, আহত ৮০৫০
ঢাকা, ১৪ অক্টোবর ২০২৫:
নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তের মাস পূর্ণ হলেও দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি দেখা যায়নি—এমনই চিত্র উঠে এসেছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সারাদেশে ১০৪৭টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৬০ জন নিহত এবং ৮০৫০ জন আহত হয়েছেন। যদিও গুম ও ক্রসফায়ারের মতো ঘটনা কমেছে, তবে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, মব সহিংসতা, নারী নির্যাতন, সাংবাদিক নির্যাতন ও বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বেড়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার ধরন ও পরিসংখ্যান
এইচআরএসএস জানায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বকালে সংঘটিত ১০৪৭টি ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দল ও বিএনপি-সম্পৃক্ত সংঘর্ষে।
| সংঘর্ষের ধরন | ঘটনার সংখ্যা | আহত | নিহত |
|---|---|---|---|
| বিএনপি-বিএনপি | ৫৩৯ | ৫০১৭ | ৮৫ |
| ছাত্রদল-ছাত্রদল | ৩৮ | ৩২০ | ৩ |
| বিএনপি-আওয়ামী লীগ | ২২১ | ১১৪১ | ৩৪ |
| বিএনপি-জামায়াত | ৪০ | ৩২৫ | ২ |
| আওয়ামী লীগ-আওয়ামী লীগ | ২৪ | ২৫০ | ১২ |
| অন্যান্য রাজনৈতিক সংঘর্ষ | ৮৩ | ৪৪৭ | ২১ |
| মোট | ১০৪৭ | ৮০৫০ | ১৬০ |
দলভিত্তিক নিহতের সংখ্যা
| দল | নিহত |
|---|---|
| বিএনপি | ১০৪ |
| আওয়ামী লীগ | ৩৮ |
| জামায়াত | ৩ |
| এনসিপি | ১ |
| ইউপিডিএফ | ১০ |
| অন্যান্য | ৪ |
| মোট | ১৬০ |
উল্লেখযোগ্য সহিংস ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৫–৭ ফেব্রুয়ারি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর, সুধা সদন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে।
১২ মে ২০২৫-এ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপরও রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকে।
১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ৫ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হন। একইভাবে ২৯–৩০ আগস্ট ঢাকায় জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরসহ বহুজন গুরুতর আহত হন।
বিগত বছরগুলোর তুলনামূলক চিত্র
| বছর | ঘটনা | নিহত | আহত |
|---|---|---|---|
| ২০২১ | ৪৬০ | ৮২ | ৪৩৫২ |
| ২০২২ | ৭৫৮ | ৯২ | ৭৭৮৯ |
| ২০২৩ | ৯২১ | ৯৬ | ৯২১৯ |
| ২০২৪–২৫ (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) | ১০৪৭ | ১৬০ | ৮০৫০ |
এই তুলনা থেকে দেখা যায়, রাজনৈতিক সহিংসতার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে এবং মৃত্যুর হারও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সুপারিশ
এইচআরএসএস জানায়,
“দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় সকল রাজনৈতিক দলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। দলীয় কোন্দল, প্রতিহিংসা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব পরিহার করে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।”
সংস্থাটি রাজনৈতিক দলসমূহ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে মানবাধিকার সুরক্ষা ও সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আরও সোচ্চার হওয়ার অনুরোধ করেছে।


