বাংলাদেশের প্রধান চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ইসলামি ছাত্রশিবিরের ব্যাক টু ব্যাক নিরঙ্কুশ বিজয় শুধুমাত্র ছাত্র রাজনীতিতে ইসলামি ছাত্র শিবিরের জন্য বড় কোন ঘটনা নয়; একই সাথে যেকোন ছাত্র সংঘঠনের জন্যও বড় কোন ঘটনা। আমার জানা মতে বাংলাদেশের ইতিহাসে পরপর চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বছরে সংঘঠিত কোন ছাত্রসংসদ নির্বাচনে কোন ছাত্রসংঘঠনের এভাবে একক নিরঙ্কুশ বিজয়—এটাই প্রথম। একই সাথে একই সংঘঠনের চারজন ভিপি সহ প্রায় শতখানেক বিজয়ী হওয়া, নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে বড় একটা ঘটনা। অদূর ভবিষ্যতে কারো পক্ষে এই রেকর্ড ভঙ্গ করা সম্ভব হবে কি না—তা ভবিষ্যতে কথা বলবে। আর ভবিষ্যত তো ভবিষ্যতই…।
ইতিপূর্বে ইসলামি ছাত্রশিবিরের ইতিহাসে একমাত্র চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে শিবির মনোনীত জসিম—গাফ্ফার পরিষদ বিজয়ী হওয়ার পর আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রশিবিরের জন্য সে সুযোগ আসে নাই। সন্ত্রাস, সম্মিলিত প্রতিপক্ষ আর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার কারণে ছাত্রশিবিরের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহনই করতে পারে নাই। পরবতীর্তে কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ হল পযার্য়ে বিজয়ী হওয়ার উদাহরণ রয়েছে।
যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ শিবিরের বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতিকে “অত্যন্ত ভাগ্যবান ও ওর ধারে কাছেও কেউ নেই” ইত্যাদি বলে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলছেন—তাদের মনে রাখা উচিত যে ছাত্রশিবিরের এই অর্জন শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির কোন অর্জন নয়—বরং এটা সম্মিলিত অর্জন যা পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে সম্ভব হয়েছে। হ্যাঁ, ছাত্রশিবিরের বতমান কেন্দ্রীয় সভাপতিতে অনেক দিন দিয়েই আপাতত ভাগ্যবান বলা যায়। যেখান চার দশক আগের কোন কেন্দ্রীয় সভাপতিতে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপিকে ডিল করতে হয়েছে, সেখানে চার জন ভিপি সহ আর ৮ জন জিএস ও এজিএস-কে ডিল করার সৌভাগ্য। শিবির ছাড়া ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের ইতিহাসেও এমন নজীর বোধ হয় নেই। এটা হয়ত ঠিক যে আজ যদি সন্ত্রাস ও বাধাহীন এবং কোন প্রকার প্রভাবহীন এক প্রতিদ্বন্ধিতামূলক নির্বাচনে সকল প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করে শিবির জয়ী হতো তবেই প্রকৃত সামথ বেরিয়ে আসতো। যদিও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা চিন্তা করাও মুসকিল। আমার তো মনে হয় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও যদি ছাত্রসংসদ নির্বাচন হতো—তবে সন্ত্রাস ও প্রভাবহীন নির্বাচন আদৌ হতো কি না—তা আমার প্রশ্ন। আরেকটা বিষয় লক্ষ্যনীয় যে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে কোন প্রকার সন্ত্রাস ও হানা—হানি ছাড়া একটা নির্বাচন সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়েছে—তা—ও এই প্রথম ও বিরল! ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে ভবিষ্যতের জন্য মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে দেশের মানুষের মত আরও দৃঢ় বিশ্বাস।
এই সকল বিজয় ইসলামি ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে ভবিষ্যত রাজনীতির পরিবর্তনে প্রভাব পড়বে তেমনি শিবিরের নেতা—কমীর্দের মাঝেও এক ধরণের “অজেয়” মানুষিকতা শুরু করতে পারে। “এখন অনেক বড় বা আমরা নিজেরা এখন স্বয়ংসম্পুর্ন—ইত্যাদি মানুষিকতা আসতে পারে”। সবাই তো আর সমান নয়। সব চাইতে বড় যে বিষয়টাকে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতিতে কার্যকরী পরিষদের সদস্যদের মধ্য হতে চার হতে পাঁচ জন নির্বাচিত ছাত্রসংসদ সদস্যকে ডিল করা। যাদের মধ্যে কেউ কেউ বিপুল ভোটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি বা জিএস বা অন্য কিছু। ছাত্রশিবিরের বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতির জন্য এটাই বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে আমার ধারণা। আগামী দিনের ব্যর্থতার জন্য ছাত্রজনতা তখন শিবিরকেই দোষারোপ করবে। তখন হয়তো বলবে “সর্বশেষ শিবিরকেও তো দেখলাম, সবই সমান”— ভবিষ্যতের জন্য পথ যেন সংকীর্ণ না হয়, সে বিষয়টা আশা করি শিবির ভাববে। কারণ, বিশ্বপ্রেক্ষাপটের অভিজ্ঞতা কোন ভাবেই সুখকর নয়।
একই সাথে যে বিষয়টার চ্যালেঞ্জ আসতে পারে সেটা হলো নেতৃত্বের প্রতিযোগীতা ও বহিঃবিভাগীয় লোভ ও মিডিয়া প্রভাব। আশির দশকের শুরুতে শিক্ষাঙ্গনে যখন শুধু শিবির আর শিবির, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির এক প্রকার শক্তি। তখন শিবির যতই শক্তি—সামর্থ দেখাচ্ছে বা শক্তিশালী হওয়া চেষ্টা করছে, বিপরীতে প্রতিপক্ষ ততই সতর্ক ও সংঘঠিত হচ্ছে। দেখা গেছে যে ওই সময়েই শিবিরের সবচেয়ে বেশি প্রতিভাবান নেতা কর্মী আহত ও নিহত হয়েছেন। ওই সময়েই আহমদ আবদুল কাদের বাচ্চুর নেতৃত্বে আলাদা একটা গ্রুপ হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘ কয়েক বছর পর্যন্ত ছাত্রশিবিরকে এই যন্ত্রণা বইতে হয়েছে। তিন দশক পর যখন জোট সরকার ক্ষমতায় আসে—তারপর আবারও অনেকটা একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। যদিও উভয় পরিস্থিতিই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। আর এখন তো মিডিয়া নির্ভর পৃথিবীতে কে কাকে কখন বড় করে ফেলে সেটাই বড় কঠিন বিষয়। কে কিভাবে কোন ট্রাপে পড়ে যান—তা কখনো বলা যায় না। চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গত পরশুর নির্বাচনে “বিদ্রোহী” শিবির প্রার্থী দেখেছি। পরিণতিতে এজিএস পদে শিবির হারার ঘটনা ঘটেছে।
ছাত্রশিবিরের এই বিজয় আগামী দিনের বাংলাদেশের সম্ভবনা। যদি শিবির নেতৃত্ব এই সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে। আমাদের বড় সমস্যা হলো তৃণমূল হতে উচ্চ পর্যন্ত—প্রতিযোগীতামূলক একাধিক নেতৃত্বের অনুপস্থিত। সাংগঠনিক শৃঙ্খলার খাতিরে কখনো একাধিক নেতৃত্ব গড়ে উঠেনা। আর সে কারনে বিভিন্নমূখী নেতৃত্বকে পরিচালনা করারও অভিজ্ঞতা কম। তাই, এখন অসংখ্য সম্ভবনাময়ী নেতৃত্বকে কাজে লাগানো শিবিরের জন্য যেমনি চ্যালেঞ্জ তেমনি ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।
লেখকঃ সুমন মাহমুদ
টিভি উপস্থাপক ও লেখক




