– জোবায়ের হোসাইন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কয়েক বছরে যে পরিবর্তনের ঢেউ এসেছে, তা অস্বীকার করা কঠিন। জুলাই-পরবর্তী সময় বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের অপ্রত্যাশিত সাফল্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। দীর্ঘদিন পর ইসলামপন্থী রাজনীতি মাঠে এমন দৃশ্যমান উপস্থিতি দেখিয়েছে, যা মূলধারার রাজনীতির চিত্রকে নতুনভাবে আঁকতে পারে।
তবে এই পরিবর্তনের মাঝেও এক শ্রেণির প্রাক্তন কর্মী ও সমর্থকের মধ্যে এখনো সংশয় রয়ে গেছে। তাদের বক্তব্য— “জামায়াত এখনো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়”, “এখন ক্ষমতায় গেলে মুরসি’র মিশরের মতো অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে।” এই ধরনের মন্তব্য শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকোচের প্রতিফলনও বটে।
রাজনীতির নতুন বাস্তবতা
বাংলাদেশের ভোটাররা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। তারা পেশীশক্তি বা কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি নয়— সহযোগিতা, কল্যাণ, ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি চায়। সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রেক্ষাপট এবং তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ তারই প্রমাণ। বিশেষ করে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী তরুণ ভোটারদের একাংশ আবারও জামায়াত-শিবিরের দিকে ঝুঁকছে।
মাঠপর্যায়ে জামায়াতের অনেক নেতাকর্মী এখন স্থানীয় পর্যায়ে নারী, শ্রমিক ও তরুণদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা-সমাবেশ করছেন। এসব সমাবেশে ইসলামভিত্তিক ন্যায়পরায়ণ সমাজের স্বপ্নকে সামনে রেখে তারা যে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছেন, তা মানুষের মনে সাড়া ফেলছে— অন্তত স্থানীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতায় সেটিই প্রমাণিত।
সমালোচনা বনাম নিষ্ক্রিয়তা
সমালোচনা একটি দলের জন্য প্রয়োজনীয়। কারণ তা শুদ্ধি ও আত্মসমালোচনার পথ উন্মুক্ত করে। কিন্তু সমালোচনার ধরন গুরুত্বপূর্ণ— কেউ যদি কেবল দূর থেকে মন্তব্য করেন, কিন্তু বাস্তব কাজের সঙ্গে যুক্ত না থাকেন, তবে সে সমালোচনা কার্যকর হয় না। রাজনীতির জগতে ‘এসি সমালোচক’ আর ‘মাঠের কর্মী’-র মধ্যে পার্থক্য সবসময়ই দৃশ্যমান।
যারা মাঠে কাজ করছেন, তারা দেশের পরিবর্তনকে হাতে-কলমে অনুভব করছেন। কিন্তু যারা কেবল দূর থেকে পর্যবেক্ষক, তাদের কাছে সেই পরিবর্তনের গতি ও গভীরতা স্পষ্ট নয়। ফলে তারা অজান্তেই এক ধরনের হতাশাবাদে ভোগেন।
‘মুরসি আশঙ্কা’ কতটা বাস্তব?
মিশরের মুহাম্মদ মুরসি ইসলামপন্থী রাজনীতির একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানকার সামাজিক গঠন, ভোটার আচরণ ও প্রশাসনিক বাস্তবতা মিশরের মতো নয়। অতএব “জামায়াত ক্ষমতায় এলে মুরসি’র মতো হবে”— এই আশঙ্কা সরলীকৃত তুলনার ফাঁদে পড়ে যায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে টেকসই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন গণআস্থা, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং জাতীয় ঐক্যের বার্তা। জামায়াত যদি সেই তিনটি উপাদান নিশ্চিত করতে পারে, তবে “ক্ষমতায় টিকতে পারবে কি না” প্রশ্নটি অর্থহীন হয়ে পড়বে।
আজ যারা জামায়াতের সমালোচনা করছেন, ভবিষ্যতে যদি দলটি গণসমর্থন নিয়ে নতুন রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে সেই সমালোচকরাই হয়তো বিজয়ের অংশীদার হয়ে উঠবেন। ইতিহাসের প্রতিটি পরিবর্তনের সময় এমনই ঘটেছে।
তবে তার আগে প্রয়োজন, সমালোচনাকে ভয় নয়— আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা, এবং মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নেতৃত্বকে পরিণত করা।
বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন প্রজন্ম হয়তো এই ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জই এখন সামনে পেয়েছে।
উৎস: facebook.




