Home সম্পাদকীয় রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও প্রভাবের বাস্তব রাজনীতি

রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও প্রভাবের বাস্তব রাজনীতি

170
0

কামাল সিকদার

রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও গঠন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) বলেছেন, রাষ্ট্র মূলত একটি সামাজিক চুক্তির ফল। এই চুক্তি জনগণ ও ক্ষমতার কেন্দ্র, অর্থাৎ শাসকের মধ্যে সম্পাদিত হয়। কে শাসন করবে, কিভাবে শাসন করবে, জনগণ কোন সীমারেখা পর্যন্ত সেই শাসন মেনে নেবে, এসব বিষয় নির্ধারিত হয় এই অলিখিত সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে

রাষ্ট্রব্যবস্থা হতে পারে রাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক, তবে মূলত সেটি নির্ভর করে জনগণ কেমন শাসন কাঠামোকে মেনে নিতে রাজি তার ওপর। জনগণ যদি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়, তবে শাসনব্যবস্থা গণতান্ত্রিক চরিত্র ধারণ করে। বিপরীতে, যদি জনগণের ইচ্ছাশক্তি নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে রাষ্ট্র চলে কর্তৃত্ববাদী পথে।

শাসনব্যবস্থার ধরণ যাই হোক না কেন, প্রতিটি রাষ্ট্রই পরিচালিত হয় তিনটি মূল বিভাগের মাধ্যমে:
আইন বিভাগ (Legislature) – আইন প্রণয়ন করে।
শাসন বিভাগ (Executive) – সেই আইন কার্যকর করে।
বিচার বিভাগ (Judiciary) – আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।

তবে এই তিনটি বিভাগের বাইরে রাষ্ট্র পরিচালনায় আরও কিছু প্রভাবশালী শক্তি বা প্রেসার গ্রুপ (Pressure Groups) সক্রিয় থাকে। যেমন: সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র, পেশাজীবী সংগঠন, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, সিভিল সোসাইটি, এবং বিভিন্ন আদর্শিক বা মতাদর্শভিত্তিক সংগঠন। এরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে।

রাষ্ট্রের মূল ক্ষমতার উৎস জনগণ, কিন্তু জনগণের সেই ক্ষমতা পরিচালিত ও প্রভাবিত হয় এই প্রেসার গ্রুপগুলোর মাধ্যমে। বাস্তবতায় দেখা যায়, কেবল জনপ্রিয়তা বা জনসমর্থন থাকলেই রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছানো বা সেখানে টিকে থাকা সম্ভব নয়। ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সমন্বয় না থাকলে কোনো রাজনৈতিক দলই কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও জটিল। দীর্ঘ সামরিক শাসন ও কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির অভিজ্ঞতা পেরিয়ে আজকের বাংলাদেশে সরাসরি কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করা আর সহজ নয়। তবে একইসঙ্গে, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে—আমলাতন্ত্র থেকে বিচার বিভাগ, প্রশাসন থেকে নিরাপত্তা কাঠামো—যদি কোনো দলের আদর্শিক বা প্রভাবশালী উপস্থিতি না থাকে, তবে সেই দল ক্ষমতায় গিয়েও কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে না।

পড়ুনঃ  ইউরো ইসলাম

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রের মূল শক্তি কাঠামোগুলোর মধ্যে তাদের উপস্থিতি বা প্রভাব অত্যন্ত সীমিত। আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ কিংবা সিভিল প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নগণ্য। ফলে কেবল জনসমর্থনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া এবং তা ধরে রাখা—এটি বাস্তবতার বিচারে অত্যন্ত কঠিন।

এরপর আসে বহিঃশক্তির ভূমিকা। দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক শক্তিধর দেশগুলোর প্রভাব প্রায় অনিবার্য। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইসলামভীতির (Islamophobia) প্রবল ধারা এখনো আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। ফলে একটি ইসলামপন্থী দলের রাষ্ট্রক্ষমতায় আগমন অনেক সময় বহিঃশক্তির আশঙ্কা ও প্রতিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সবশেষে বলা যায়, বুদ্ধিমান রাজনৈতিক সংগঠন কখনো পরিস্থিতির দয়া প্রত্যাশা করে না; বরং প্রতিকূল অবস্থার জন্যও প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কারণ অন্ধ হলেই প্রলয় থেমে থাকে না; বরং প্রস্তুতিই একমাত্র অস্ত্র যা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার পথ তৈরি করে দেয়।

তাই রাষ্ট্রের ধারণা বোঝার পাশাপাশি, রাষ্ট্রক্ষমতার বাস্তব রাজনীতি বুঝতে হলে এই অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও বহির্বিশ্বের সম্পর্ক, দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here