Home ধর্ম ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : নামাজ আত্মাকে সতেজ করার এক অনন্য...

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : নামাজ আত্মাকে সতেজ করার এক অনন্য মুহূর্ত

184
0

শায়খ আবদুল কাইয়ূম

“সব ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে মধুর ইবাদত হলো সালাত বা নামাজ । নামাজ আমাদের ঈমানের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে এবং আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে। নামাজের মিষ্টতা নিজে নিজে আসে না। এটা অর্জন করতে হয় । আর তখনই নামাজ হয়ে ওঠে আমাদের শান্তির আশ্রয়স্থল। আত্মাকে সতেজ করার এক অনন্য মুহূর্ত।”
কথাগুলো বলেছেন ইস্ট লন্ডন মসজিদের প্রধান ইমাম ও খতীব শায়খ আব্দুল কাইয়ূম। তিনি ৭ নভেম্বর শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদে জুমার খুতবা উপস্থাপন করছিলেন।

শায়খ আব্দুল কাইয়ূম বলেন, আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য।” (সূরা আদ-ধারিয়াত, ৫১:৫৬)। ইবাদত কখনো বোঝা হওয়ার জন্য নয়, বরং এটি সেই পথ যা আমাদের অস্থির জীবনে শান্তি ও প্রশান্তি এনে দেয়।

আমরা কত আছি—যারা প্রতিদিন নামাজ পড়ি, কিন্তু নামাজের সেই মিষ্টতা অনুভব করতে পারি না? দাঁড়াই, রুকু করি, সেজদা করি—কিন্তু হৃদয় দূরে থেকে যায়। অথচ সালাত শান্তির উৎস হওয়ার কথা । এটি শুধু একটি ফরজ বা কর্তব্য পালন নয়, বরং মহান রাজাধিরাজের সামনে ব্যক্তিগত উপস্থিতি ।

রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন -‘নামাজ আমার চোখের প্রশান্তি’। কষ্ট বা দুঃখের মুহূর্তে তিনি (সা:) সালাতের দিকে ফিরে যেতেন—পালানোর জন্য নয়, বরং আশ্রয় খুঁজতে।

যখন আমরা বলি “আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল ‘আলামীন”- এটি একতরফা কথা নয়। আল্লাহ বলেন—“আমার বান্দা আমাকে প্রশংসা করল।”

ভাবুন তো! প্রতিবার আমরা সূরা ফাতিহা পড়ি—আল্লাহ শুনছেন, সাড়া দিচ্ছেন, আমাদেরকে স্বীকার করছেন। এরচেয়ে সুন্দর কথোপকথন আর কী হতে পারে?

তাহলে কেন আমাদের নামাজ অনেক সময় ভারী বা শুকনো মনে হয়? এর কারণ—নামাজের মিষ্টতা নিজে নিজে আসে না। এটা অর্জন করতে হয়। চেষ্টা করতে হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও; নিশ্চয়ই তা কঠিন, কিন্তু নম্র ও খুশু‘শীলদের জন্য কঠিন নয়।” (সূরা আল-বাকারা, ২:৪৫)। এই অবস্থানে পৌঁছানো সহজ নয়। কিন্তু যখন আন্তরিকভাবে চেষ্টা করি, আল্লাহ পথ খুলে দেন।

পড়ুনঃ  জিসিএসই পরীক্ষায় লন্ডন ইস্ট একাডেমিরশিক্ষার্থীদের অসাধারণ সাফল্য লাভ

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- “যারা আমার পথে চেষ্টা করে—আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করি। (সূরা আল-আনকাবূত, ২৯:৬৯)।

সুতরাং প্রথম ধাপ হলো চেষ্টা করা। দোয়া করা। হৃদয়কে প্রস্তুত করা। নামাজে দাঁড়ানো শুধু কাজ শেষ করার জন্য নয়—বরং আল্লাহর সঙ্গে সংযোগের মনোভাসনা নিয়ে দাঁড়াতে হয়।

রাসুল (সা:) বলেছেন—নামাজে মনোযোগ নষ্ট করে শয়তান । আয়শা (রা.) নামাজে অন্যদিকে তাকানো সম্পর্কে রাসুল (সা:) কে প্রশ্ন করলে, তিনি (সা:) বলেন—’এটি শয়তান বান্দাকে নামাজ থেকে ছিনিয়ে নেয়। এই কারণে আমাদের দৃষ্টি সেজদার স্থানে রাখা উচিত—যাতে মন স্থির থাকে।

আরেকটি হাদিসে এসেছে- “এক ব্যক্তি নামাজ শেষ করে, কিন্তু তার নামাজের এক-দশমাংশ, এক-নবমাংশ, এক-অষ্টমাংশ… এমনটুকুই লেখা হয়।” সমাজের সময় যদি আমাদের মন ঘুরে বেড়ায়—আমরা আসলে কতটুকু লাভ করছি?

নামাজে ঢোকার আগে আমাদের মনকে প্রস্তুত করতে হবে। মোবাইল হাতে নিয়ে, দুনিয়ার চিন্তা মাথায় নিয়ে, তাড়াহুড়ো করে নামাজে দাঁড়ালে মনোযোগ আসবে না। আগেকার একজন আলেম নামাজের সময় কাঁপতেন। জিজ্ঞেস করা হতো কেন? তিনি বলতেন, “এখন সেই আমানত রক্ষার সময় এসেছে যেটি আসমান-জমিন ও পাহাড়ও নিতে ভয় পেয়েছিল’। সুবহানাল্লাহ! কী ভক্তি, কী সচেতনতা!

একজন সালাফ বলেছেন—“যখন আমি নামাজে দাঁড়াই, মনে করি—জান্নাত আমার ডানে, জাহান্নাম বামে, সামনে কাবা, পেছনে মালাকুল-মাউত, আর এটাই হয়তো আমার শেষ নামাজ।” এটাই খুশু‘। এটাই নামাজকে শুধু রুটিন নয়—আত্মার যাত্রায় রূপ দেয়।

আর যখন এ মিষ্টতা উপভোগ করি—নামাজ আর বোঝা মনে হয়না, হয়ে যায় আকাঙ্ক্ষা। একজন আলেম বলেন—“আমরা নামাজে যে আনন্দ পাই—রাজারা যদি তা জানত, তারা আমাদের কাছ থেকে তা ছিনিয়ে নিতে যুদ্ধ করত।”

তাহলে কীভাবে এই স্তরে পৌঁছাব?
তাকবিরে তাহরিমার আগে মনকে প্রস্তুত করি । দুনিয়াকে নামাজের বাইরে রেখে দিই। অনুধাবন করি যে, আল্লাহ আমার কথা শুনছেন। কুরআনের আয়াতগুলো ধীরে ধীরে পড়ি। অর্থ নিয়ে ভাবি। এমন নামাজ পড়ি যেন এটাই শেষ।

পড়ুনঃ  ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : সবচেয়ে সহজ যে ইবাদতটি আমরা অবহেলা করি

এর ফলে কী হয়? নামাজ হয়ে ওঠে শান্তির আশ্রয়স্থল । আত্মাকে সতেজ করার মুহূর্ত। আল্লাহ আমাদের প্রচেষ্টাকেই পুরস্কৃত করেন—পরিপূর্ণতা নয়।

হে আল্লাহ, সালাতকে আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন । আমাদেরকে অভ্যাসের বশে নয়—ভালবাসা দিয়ে নামাজ পড়ার তাওফিক দিন । আপনার ইবাদতের মিষ্টতার স্বাদ নেওয়ার সুযোগ দিন। বিনয় ও উপস্থিতির সঙ্গে আপনাকে স্মরণ করতে দিন। এবং নামাজ শেষে আমাদের হৃদয়কে শান্ত করুন। আমিন।

শায়খ আবদুল কাইয়ূম : প্রধান ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । ৭ নভেম্বর, শুক্রবার, ২০২৫।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here