লন্ডন, ২০ নভেম্বর ২০২৫ — লন্ডনের বাংলাদেশ সেন্টারে গত ১৭ নভেম্বর ঘটে যাওয়া উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে কাউন্সিল অব ম্যানেজমেন্ট কমিটি এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম, ডেপুটি হাইকমিশনার নজরুল ইসলাম এবং মিনিস্টার হেড অব চ্যান্সারি এমকে শাহরিয়ার মোশাররফের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং কমিউনিটিতে বিভাজন সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছে। সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় গ্রান্ড রসই রেস্টুরেন্টে, যেখানে কমিটির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বিস্তারিত ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়—হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম বাংলাদেশ হাইকমিশনের লেটারহেড ব্যবহার করে বাংলাদেশ সেন্টারের কাউন্সিল অব ম্যানেজমেন্ট কমিটির একটি সভা ১৭ নভেম্বর আহ্বান করেন। তবে ওই সভার নোটিশ কমিটির সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ বেশ কয়েকজন বৈধ সদস্যকে না পাঠিয়ে হাইকমিশনের পছন্দের কয়েকজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিষয়টি জানতে পেরে কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা ১৩ থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত হাইকমিশনারকে ই-মেইল ও সলিসিটরের মাধ্যমে সভা বাতিল করার অনুরোধ জানান। কিন্তু হাইকমিশনার কোনো পদক্ষেপ নেননি।
১৭ নভেম্বর সেন্টারে উপস্থিত হলে সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন সভা আহ্বানের প্রক্রিয়া নিয়ে হাইকমিশনারের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে গেলে তিনি কথা শুনতে অপারগতা প্রকাশ করেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের দেখেই তিনি উত্তেজিত হয়ে কড়া ভাষায় ক্যামেরা বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং সাংবাদিকদের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানান। পরে সেন্টারের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কথা বলতে চাইলে হাইকমিশনার বলেন, “Do you know who I am. I am the chair.” এর পরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
কমিটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়—ডেপুটি হাইকমিশনার নজরুল ইসলাম তখন সদস্যদের উদ্দেশ্যে হুমকিসূচক ভাষায় বলেন, “You are in serious trouble… বাংলাদেশ আসো, দেখে নেবো।” এ মন্তব্যে সেন্টারে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ প্রটেকশন নিয়ে হাইকমিশনার পুনরায় সেন্টারে প্রবেশ করেন, কিন্তু তখনও তিনি কমিটির বক্তব্য শুনতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উঠে আসে অতীতের কিছু ঘটনা। ২৬ সেপ্টেম্বর হাইকমিশনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মিনিস্টার হেড অব চ্যান্সারি এমকে শাহরিয়ার মোশাররফ কমিটির সদস্যদের উদ্দেশ্যে আঙুল তুলে বলেন, “আপনাদের গাজাখুরি বক্তব্য আর শুনতে চাই না।” এরপর কমিটি ক্ষমা প্রার্থনা চেয়ে ইমেইল পাঠালেও হাইকমিশনার কোনও জবাব দেননি।
হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক মন্তব্য—যে বাংলাদেশ সেন্টারের “এক্সিকিউটিভ কমিটি নেই”, “পদ-পদবি সঠিক নয়” বা “আর্থিক লেনদেনে প্রশ্ন আছে”—এসব অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর’ বলে দাবি করেছে সেন্টারের নেতৃত্ব। কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে বৈধভাবে নির্বাচিত কাউন্সিল অব ম্যানেজমেন্ট কমিটি নিয়মিতভাবে কাজ পরিচালনা করেছে, AGM-এ পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদন সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং ১৫টিরও বেশি ইভেন্ট আয়োজন করা হয়েছে।
১৭ নভেম্বরের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সেন্টার স্পষ্টভাবে দাবি জানিয়েছে—হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম, ডেপুটি হাইকমিশনার নজরুল ইসলাম এবং মিনিস্টার হেড অব চ্যান্সারি শাহরিয়ার মোশাররফকে অবিলম্বে লন্ডন হাইকমিশন থেকে প্রত্যাহার করতে হবে।
সভায় বাংলাদেশ সেন্টারের ঐতিহাসিক গুরুত্বও তুলে ধরা হয়। বক্তারা স্মরণ করেন—১৯৭১ সালে এটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রচারণার কেন্দ্র, এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় ও প্রবাসী বাঙালিদের অবদানে ভবনটি গড়ে উঠেছিল। সংস্কারের অভাবে ভবনটি মালিকানা হারানোর পথে থাকলেও সাম্প্রতিক পুনর্নির্মাণে সেন্টার如今 ‘স্ব-গৌরবময়’ অবস্থানে ফিরেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়—২০২৩ সালের নির্বাচনের পর থেকে কিছু বাহিনী কমিটির কাজে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করলেও সদস্যদের সমর্থন ও আইনগত কাঠামোর মধ্য দিয়ে কমিটি সেন্টারের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং সংবিধান যুগোপযোগী করতে সলিসিটরের মাধ্যমে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সম্মেলনের শেষে সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন,
“বাংলাদেশ সেন্টার কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়—এটি প্রবাসী বাঙালিদের সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতীক। সেন্টারের মর্যাদা রক্ষায় আমরা এক ইঞ্চি পিছু হটব না।”






