লন্ডন, ২১ নভেম্বর ২০২৫ (শুক্রবার) — বাংলাদেশ সেন্টারের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ও দ্বন্দ্ব আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে ১৭ নভেম্বর আহ্বানকৃত কাউন্সিল অফ ম্যানেজমেন্টের চেয়ার-অ্যাকশন সভাকে কেন্দ্র করে। লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সেন্টারের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর শহীদুর রহমান অভিযোগ করেন, জনাব দেলোয়ার হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে সভা নাশকতার মাধ্যমে ভণ্ডুল করে রাষ্ট্রদূতকে অসম্মানিত করেছেন। তাঁদের এই কর্মকাণ্ডের কারণে সেন্টারের সাংগঠনিক কার্যক্রমে চরম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মুহিবুর রহমান মুহিব, ভাইস প্রেসিডেন্ট কবির মিয়া, চিফ-ট্রেজারার ফাইজুল হক এবং সদস্য ফেরদৌসি রহমান।
প্রফেসর শহীদুর রহমান জানান, ২০২৩ সালের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনের পর সংবিধান লঙ্ঘন করে জনাব দেলোয়ার হোসেন নিজেকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করেন, যা Articles of Association-এর নিদিষ্ট বিধানবিরোধী। এর ফলে দুইটি প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাহী কমিটি জন্ম নেয় এবং সেন্টার টানা দুই বছর কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে। তিনি দাবি করেন, এই সময়ে একটি অবৈধ কমিটির মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে চেক স্বাক্ষর করে অর্থ উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, লাল প্যানেলের নির্বাচিত ১৭ সদস্যের মেয়াদ এক বছর আগে শেষ হয়ে গেছে, ফলে সাংবিধানিকভাবে তাঁরা আর কাউন্সিল সদস্য নন।
দীর্ঘ অচলাবস্থা নিরসনে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম সংবিধান অনুযায়ী চেয়ার-অ্যাকশন গ্রহণ করে ১৭ নভেম্বর কাউন্সিল সভা আহ্বান করেন। হাইকমিশনের অফিসিয়াল প্যাডে পাঠানো এই নোটিশ সম্পূর্ণ বৈধ বলেই উল্লেখ করেন সাধারণ সম্পাদক। রাষ্ট্রদূতের উদ্দেশ্য ছিল আসন্ন AGM-এর তারিখ ও স্থান নির্ধারণ, নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচন আয়োজন এবং নতুন কাউন্সিলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে সেন্টারকে অচলাবস্থা থেকে উদ্ধার করা।
কিন্তু ওই সভার দিন পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সাধারণ সম্পাদক অভিযোগ করেন, সভাকক্ষে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়, হলরুম থেকে চেয়ার-টেবিল সরিয়ে ফেলা হয় এবং অনুমতি ছাড়াই সাংবাদিকদের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। এতে কাউন্সিল মিটিংকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে “পাবলিক শোডাউন”-এ রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। রাষ্ট্রদূত সেন্টারে প্রবেশের পর কয়েকজন সদস্য ও তাঁদের সমর্থকরা তাঁকে ঘিরে চরম অশালীন আচরণ করেন। ভিডিও ফুটেজেও এ ঘটনা ধরা পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এসময় মাহবুব আহমেদ রাজু, আলী আহমেদ বেবুল ও শিব্বির আহমেদসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে গালিগালাজ, হৈচৈ, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও রাষ্ট্রদূতের গাড়ি ধাওয়ার অভিযোগ তোলা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে জননিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ ডাকা হয়। পরে পুলিশ উপস্থিত হলে রাষ্ট্রদূত আবার সভায় ফিরে এসে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। তিনি জানান, দুই বছর ধরে চলমান বিরোধ নিরসনে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন এবং সংবিধান অনুযায়ী চেয়ার-অ্যাকশন নেওয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো বিকল্প ছিল না। সেন্টারের সংকট সমাধানে AGM ও নির্বাচন আয়োজনই একমাত্র পথ বলে তিনি মত দেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ সেন্টারকে স্বচ্ছ, কার্যকর ও আধুনিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রফেসর শহীদুর রহমান বলেন, ১৭ নভেম্বরের এই নাশকতামূলক আচরণ শুধু রাষ্ট্রদূতকেই অসম্মানিত করেনি, বরং পুরো ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক ডিসিপ্লিনারি পদক্ষেপ ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। প্রয়োজনে Company Act 1948 অনুযায়ী নিরাপত্তা যাচাই (CRB/DBS চেক) করারও আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, “বাংলাদেশ সেন্টারের ভবিষ্যৎ রক্ষায় পরিবর্তন অনিবার্য। তবে সেই পরিবর্তন হতে হবে প্রগতিশীল পথে—নাশকতা বা বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে নয়।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নেতারা ঐকমত্যে জানান, সেন্টারকে অচলাবস্থা থেকে বের করে আনতে হলে সকল সদস্যকে সংবিধান মেনে চলতে হবে এবং যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাঁদের মতে, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই বাংলাদেশ সেন্টারের স্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।





