আজকের বিশ্বে ইসলাম ও মুসলমানদের অবস্থান এক গভীর বৈপরীত্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ইসলামকে নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে বিভ্রান্তি, ভীতি ও ভুল ধারণা; অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের ভেতরেই ছড়িয়ে আছে দুর্বলতা, পশ্চাৎপদতা ও আত্মসমালোচনার অভাব। অথচ ইসলাম এমন এক ধর্ম ও সভ্যতা যা মানবিকতা, জ্ঞান, যুক্তি, সমতা এবং ন্যায়পরায়ণতার উপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছিল। ইতিহাস বলে—ইসলাম কখনোই আধুনিকতার শত্রু ছিল না; বরং গুণগত মানবিক মূল্যবোধ ও যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তার মাধ্যমে নতুন নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় মুসলিম বিশ্ব পৃথিবীর সবচেয়ে সংকটময় অঞ্চলগুলোর অন্যতম।
আজ প্রায় দুইশো কোটি মুসলমান পৃথিবীতে বাস করলেও তাদের মধ্যে প্রকৃত শক্তি, নেতৃত্ব এবং জ্ঞান–ভিত্তিক অগ্রগতির অভাব প্রকট। ৫৭টি স্বাধীন মুসলিম দেশের বেশিরভাগই যুদ্ধ, গৃহদ্বন্দ্ব, দুর্নীতি, স্বৈরাচার, দুর্বল প্রশাসন ও বৈদেশিক প্রভাবের কারণে স্থবির হয়ে আছে। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন বা আফগানিস্তানের মতো দেশগুলো ভেঙে পড়েছে নতুন আধিপত্য, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ত্রিমুখী চাপে। বিশ্বের সমস্ত শরণার্থীর ৮০ শতাংশই মুসলমান—এ সত্যটি মুসলিম বিশ্বের মানবিক পতনকে আরও প্রকটভাবে তুলে ধরে। অথচ আরব বিশ্বের কাছে রয়েছে বিপুল সম্পদ, তেল, গ্যাস, বাণিজ্য ও ভৌগোলিক শক্তিমত্তা; কিন্তু এসব সম্পদ উন্নয়ন নয়, বরং প্রতিযোগিতাহীন বিলাসিতা, অস্ত্র ক্রয়, অস্থিরতা মোকাবিলা এবং স্বৈরাচার রক্ষায় ব্যয় হয়।
মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞান–অর্থনীতির পতন। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে প্রায় আট হাজার বিশ্ববিদ্যালয়, মুসলিম বিশ্বের মোট ৫৭টি দেশে এক হাজারও সঠিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়া যায় না। শুধু সংখ্যা নয়—গবেষণা, নতুন জ্ঞান উৎপাদন, তত্ত্বের বিকাশ, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন—এসব ক্ষেত্রেই পার্থক্য বিস্ময়কর। বিশ্বের যে এক শতাংশ উচ্চমানের গবেষণাপত্র আধুনিক জ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যায়, মুসলিম দেশগুলো মিলেও তার ভগ্নাংশ পর্যন্ত উৎপাদন করে না। গুণগত গবেষণার পরিবেশ, ল্যাব, অর্থায়ন, মুক্তচিন্তা, সমালোচনার স্বাধীনতা—এসবই ভয়াবহভাবে অনুপস্থিত। ফলে মেধাবী তরুণরা পড়াশোনা শেষ করেই পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যায় এবং বেশিরভাগই আর ফিরে আসে না। এটি সেই ব্রেইন ড্রেইন, যা একদিকে মুসলিম বিশ্বকে আরও দুর্বল করছে, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বকে আরও জ্ঞানসমৃদ্ধ করে তুলছে।
এর পাশাপাশি আছে রাজনৈতিক সংকট। অধিকাংশ মুসলিম দেশের শাসন ব্যবস্থায় গণতন্ত্র নগণ্য, নির্বাচন প্রায়ই প্রহসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত, মানবাধিকার ক্ষয়িষ্ণু, নারীর অধিকার অবহেলিত এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিমূলক কাঠামো দুর্বল। যে ইসলাম ন্যায়, সমতা, পরামর্শ, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির উপর দাঁড়িয়ে ছিল, রাষ্ট্রব্যবস্থায় তার ছিটেফোঁটাও অনেক দেশে আর নেই। শেরজাদ রেহমান ও হুসেন আসকারির গবেষণা বলছে—ইসলামের আদর্শকে যে দেশগুলো সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করে, সেগুলো মুসলিম দেশ নয়; বরং নিউজিল্যান্ড, লুক্সেমবুর্গ, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ডের মতো রাষ্ট্র, যেখানে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও স্বচ্ছতা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।
তবুও ইতিহাসের শিক্ষা হলো—মুসলিম সভ্যতা কখনো এক পতনের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়নি। ১২৫৮ সালে বাগদাদ ধ্বংস হওয়ার পর মনে হয়েছিল ইসলামি সভ্যতার ভিত্তি যেন চিরতরে ভেঙে গেল। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো, সেই মঙ্গোল শক্তির মধ্যেই ইসলাম পরে ছড়িয়ে পড়ে। বার্কে খান, ওজবেগ খান, গাজান, তুঘলগ তৈমুর—এদের মতো মঙ্গোল শাসকরা ইসলাম গ্রহণ করে মধ্য এশিয়া, ইরান ও চীনে নতুন ইসলামি সংস্কৃতির বিস্তার ঘটায়। বাগদাদে বন্দী হওয়া মুসলিম নারীরাও তখন মঙ্গোল বিস্তৃত অঞ্চলে ইসলামি মূল্যবোধ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বীজ বপন করেন—এ এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী ঐতিহাসিক প্রবাহ। স্পেনে মুসলিম শাসনের পতনের পরও বলকান ও পূর্ব ইউরোপে উসমানীয় শক্তির উত্থান মুসলিম বিশ্বের নতুন কেন্দ্র তৈরি করেছিল। স্মরণ করায়—সভ্যতার আলো কখনো এক জায়গায় নিভে গেলে অন্য জায়গায় জ্বলে ওঠে।
আজকের মুসলিম বিশ্বেরও প্রয়োজন সেই নবজাগরণের মনোভাব—নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার শক্তি। হযরত সালমান ফারসির প্রস্তাবিত পরিখার যুদ্ধ কৌশল কিংবা দুর্ভিক্ষের সময় হযরত ওমরের শাস্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত—এসব উদাহরণ দেখায় ইসলাম কখনো সময়ের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। নতুন পরিস্থিতিতে নতুন উত্তর খোঁজাই ইসলামের শক্তি ছিল। আজ তাই প্রয়োজন আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের মুক্তচিন্তা, নতুন গবেষণা, সৃষ্টিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ গ্রহণ করা। এর পাশাপাশি প্রয়োজন গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, জবাবদিহি, দুর্নীতির অবসান এবং শিক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ।
মুসলমানদের উচিত নিজেদের দুর্বলতাকে স্বীকার করা, তবে হীনমন্যতায় নয়—নতুন আত্মবিশ্বাসে। সংখ্যা নয়, সৃজনশীল মানবসম্পদই জাতির সম্পদ। ইসলাম ও পশ্চিমের মধ্যে যে সভ্যতাগত সংলাপ ও মানবিক মূল্যবোধের ঐতিহ্য আছে, তা পুনরুজ্জীবিত করাই পারে মুসলিম বিশ্বকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে। ভীতির রাজনীতি, গোঁড়ামি ও বিভক্তি নয়—জ্ঞান, ন্যায়, মানবিকতা, যুক্তি, উদারতা এবং দায়িত্বশীল নাগরিকত্বই হতে পারে নতুন ইতিহাস লেখার সূত্র।
সুমন মাহদুদ
লেখক, গবেষক ও টিভি উপস্থাপক




