Home বাংলাদেশ রাতের ভোট দিনে দেওয়া হবে এমন বাংলাদেশ আমরা চাই না: অ্যাটর্নি জেনারেল

রাতের ভোট দিনে দেওয়া হবে এমন বাংলাদেশ আমরা চাই না: অ্যাটর্নি জেনারেল

70
0

গুমের সংখ্যা সরকারি হিসেবে যতটা বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি- মোঃ নূর খান লিটন

এইচআরএসএস এর উদ্যোগে মানবাধিকার দিবস উদযাপন

“Human Rights: Our Everyday Essentials” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ইউএন হিউম্যান রাইটস অফিস বাংলাদেশ ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) যৌথ উদ্যোগে উদযাপিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। দিবসটি উপলক্ষে র‌্যালি ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
বুধবার (১০ ডিসেম্বর) সকাল ৯টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে র‌্যালিটি শুরু হয়। র‌্যালিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর ঘুরে পুনরায় জাতীয় জাদুঘরে ফিরে আসে। এরপর জাতীয় জাদু ঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে এইচআরএসএস এর চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাদা আল আমিন কবির এর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ আসাদুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন ওএইচসিএইচআর এর জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার উপদেষ্টা হুমা খান, গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য ও এইচআরএসএস এর উপদেষ্টা নূর খান লিটন, ওইচসিএইচআর এর মানবাধিকার কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন ও এইচআরএসএস এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন এইচআরএসএস এর সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।


অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনে শহীদ সামিউ আমান নূর এর বাবা আমান উল্লাহ, শহীদ শাহরিয়ার খান আনাস এর মা সানজিদ খান দীপ্তি, শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের মা মোছাঃ শাহিনা বেগম ও আহত মিয়া মোহাম্মদ কাজল বক্তব্য রাখেন।


এতে বিভিন্ন সময়ে গুম-খুনের শিকার বিভিন্ন ব্যক্তি ও তার স্বজনর মধ্য থেকে জেলে মারা যাওয়া বডি বিল্ডার ফারুক হোসাইনের স্ত্রী ইমা আক্তার, গুমের শিকার হাফেজ জাকির হোসেনের ভাই জিয়াউর রহমান, নির্যাতনের শিকার মো. লিমন হোসেন, জেলে মৃত্যুবরণকারী ইশতিয়াক হোসেন জনির ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি এবং গুমের শিকার ইশরাত জাহান মৌ আলোচনা রাখেন‌।


হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, গুম ও ক্রসফায়ার বন্ধ হলেও সাংবাদিক নির্যাতন, মব ভায়োলেন্স, ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার মতো ঘটনা এখনও ঘটছে। মানবাধিকার রক্ষায় সামাজিক সাহসিকতা ও সক্রিয়তার প্রয়োজন।

পড়ুনঃ  বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে শহীদ-গাজী ফাউন্ডেশন ইউকে‘র উদ্যোগে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ‘বিজয়ের কথা‘ অনুষ্ঠিত


পুলিশ হেফাজতে নিহত বডিবিল্ডার ফারুক হোসেনের স্ত্রী ইমা আক্তার জানান, ২০২৪ সালের ১২ জানুয়ারি স্বামীকে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার পরদিন তার লাশ পাওয়া যায়। তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশায় ভুগছেন। দুই বছর পরও বিচার পাননি।
হাফেজ জাকির হোসেনের ভাই জিয়াউর রহমান জানান, ২০১৩ সালে র‍্যাব পরিচয়ে তার ভাইকে তুলে নেওয়ার পর আর খুঁজে পাননি। সংগঠন করার অধিকার থাকা সত্ত্বেও তার ভাইকে গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।


ইশতিয়াক জনির ভাই রকি বলেন, পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তার ভাইকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয় এবং পরে ভুয়া তথ্য প্রচার করা হয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০২০ সালে রায় পেলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আর্থিক, পেশাগত ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
গুমের শিকার খাদিজা পারভীন মেঘলা বলেন, গুমের শিকার হওয়া মানুষদের জীবন থেকে সময়, চাকরির সুযোগ ও নিরাপত্তা—সবই ছিনিয়ে যায়। “আমরা সবসময় ভয় নিয়ে বাঁচি।”

জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদ পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য
জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত আনাসের মা জানান, ১৬ বছর বয়সী আনাস অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বিশ্বাসের কারণে প্রাণ হারিয়েছে। তিনি বলেন, “প্রতিটি মানুষ একেকটি প্রদীপ—সব প্রদীপ মিললে দেশ আলোকিত হয়।”
সামিউ আমান নূরের বাবা জানান, বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগোতে থাকা ছেলেকে তারা হারিয়েছেন। তিনি বলেন, দ্বিতীয় স্বাধীনতার পর যেন গণহত্যার বিচার সম্পন্ন হয়।
সজলের মা বলেন, আশুলিয়ায় পুলিশের ভ্যানে আগুন দিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। “আমি মৃত সন্তানকেও দেখতে পারিনি”—বলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

অতিথিদের বক্তব্য
জাতিসংঘ মানবাধিকার কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন বলেন, মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা মানবসমাজে শান্তি, সাম্য ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তৈরি হয়েছে। অধিকার দাবি ও সচেতনতার মাধ্যমেই অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।


ওএইচসিএইচআর এর জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার উপদেষ্টা হুমা খান বলেন, একটি স্বাধীন দেশের বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত—আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, আমলাতন্ত্র, জন প্রশাসন ও বিচার বিভাগ জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে, তাদের শাসক হিসেবে নয়। কিন্তু এই মনোভাব আমাদের কাঠামোতে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে প্রোথিত। তাই এই মানসিকতা এক-দুই বছরে পরিবর্তন সম্ভব নয়। এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া, এবং কাঠামোগত সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই এটিকে দেখতে হবে।

পড়ুনঃ  বিশ্বনাথে মুক্তিযোদ্ধার প্রজন্মর উদ্যোগে পিঠা উৎসব অনুষ্ঠিত


গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য ও এইচআরএসএস এর উপদেষ্টা মোঃ নূর খান লিটন বলেন, দেশে গত ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে স্বৈরশাসন চলেছে, সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে নিয়মিতভাবে মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে—যাদের অনেককে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। গুমের সংখ্যা সরকারি হিসেবে যতটা দেখা যায়, বাস্তবে তা তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। কারণ একজন অভিযোগকারী যখন সামনে আসেন, তার কাছ থেকে আরও দুইজনের ঘটনার কথা জানা যায়, যারা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করতে পারেননি।


তিনি বলেন, ক্রসফায়ারের নামে বহু নাটক সাজানো হয়েছে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে সেসব ঘটনার বৈধতা দেয়া হয়েছে। দেখানো হতো অভিযুক্তদের অস্ত্র বহনের সময় ‘যুদ্ধ’ হয়েছে এবং তারা নিহত হয়েছে। দেশে যখনই কোনো আন্দোলন বা প্রতিবাদ উঠেছে, তখনই এ ধরনের ঘটনা বেড়েছে। সাবেক সরকার দাবি করত যে দেশ ‘নিরাপত্তার চাদরে’ ঢাকা—আসলে তা ছিল ভয়-তৈরি করা এক আবহ।


জুলাই অভ্যুত্থানে কত মানুষ নিহত হয়েছেন, এ নিয়েও বিভিন্ন সংখ্যা শোনা যায়—কেউ বলেন ১,৪০০, কেউ বলেন ২,০০০। সবাইকে নিয়ে এগোনোর বদলে বিভক্তির রাজনীতি বেছে নেয়ার ফলেই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার রক্ষার যে সুযোগ ছিল, তা নষ্ট হয়েছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর। তিনি আরও বলেন, ৫ই আগস্টের আগের অবস্থান থেকে আমরা সরে আসতে পেরেছি ঠিকই, কিন্তু এখনও নদী থেকে অজ্ঞাত লাশ ভেসে ওঠে। মানুষগুলো কীভাবে নিহত হয়েছে, তা চিহ্নিত করতেও আমরা পারছি না।


অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অনেকের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে—মানবাধিকার কতটা এগিয়েছে সে প্রশ্নও উঠছে। তিনি একজন আইনজীবী হিসেবে জানান, ৫ আগস্টের পর এখন পর্যন্ত একটি গুমের ঘটনাও রিপোর্ট হয়নি, যা মানবাধিকার পরিস্থিতির ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্র অতীতে যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, বর্তমান সরকার সেসব বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক। বিশেষ করে নির্দোষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যাতে কোনো মিথ্যা মামলা না হয়, তা নিশ্চিত করতে সরকার সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। অতীতে দায়ের করা বেশ কিছু মিথ্যা মামলারও সমাধান করা হয়েছে, যাতে কোনো নিরীহ মানুষ অবিচারের শিকার না হন।

পড়ুনঃ  মাধ্যমিক স্তরে আবারও ফিরে আসছে বিজ্ঞান, মানবিক, ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ


তিনি বলেন, আগামী দিনে আগামীর বাংলাদেশে রাতের ভোট দিনে দেওয়া হবে এমন বাংলাদেশ আমরা চাই না। আমরা চাই না আর কবর থেকে উঠে এসে মানুষ ভোট দিক। আমরা চাই না শহীদ আনাস আবার তার মায়ের কাছে চিঠি লিখুক। আর চাই না আবু সাইদদের বুক চিতিয়ে শহীদ হতে হোক, কিংবা শিশুদের প্রাণ দিতে হোক। যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদের মাথায় রাখতে হবে—খুন করা যাবে না, গুম করা যাবে না, অন্যায় করা যাবে না। কারণ শেষ পর্যন্ত তাদের জনগণের সামনে দাঁড়াতে হবে।” তিনি উল্লেখ করেন যে জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা শেখ হাসিনার ফাঁসি নিয়ে কনসার্ন নই; আমাদের উদ্বেগ জুলাই বিপ্লবে ঘটে যাওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে।”
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির চেয়ারপারসন ও অনুষ্ঠানের সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাদা আলামিন বলেন, আগে মানবাধিকার কর্মীদের খুনের ভয় নিয়ে প্রোগ্রাম করতে হতো, এখন মুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তিনি মানবাধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here