Home ইউকে যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের গোপন “বর্ণবৈষম্য” ব্যবস্থা: রিপোর্টে তীব্র সমালোচনা

যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের গোপন “বর্ণবৈষম্য” ব্যবস্থা: রিপোর্টে তীব্র সমালোচনা

128
0

লন্ডন, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ — যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব প্রত্যাহার (deprivation of citizenship) ব্যবস্থাকে “গোপন ও বর্ণবাদী দুই-স্তরীয় ব্যবস্থা” হিসেবে উল্লেখ করে একটি চরম সমালোচনামূলক রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে, যা সরকারের নাগরিকত্ব নীতি ও অনুশাসনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রানিমিড ট্রাস্ট (Runnymede Trust) ও রিপ্রিভ (Reprieve) নামে দুটি গণতান্ত্রিক ও অধিকার ভিত্তিক সংগঠনের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ২০১০ সালের পর থেকে ২০০ জনের বেশি ব্যক্তির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব “জনস্বার্থ” বা “public good” ভিত্তিতে প্রত্যাহার করা হয়েছে, সংখ্যার বিচারে যা বিশ্বের মূলধারা দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

রিপোর্টে আরও উল্লেখ হয়েছে যে এই ব্যবস্থা এতটাই গোপনীয়ভাবে পরিচালিত হয় যে অনেকে জানতে পায়নি যে তাদের নাগরিকত্ব ইতোমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। বড় সংখ্যক ব্যক্তি বৈধ তথ্য বা প্রমাণ দেখার সুযোগও পায় না এবং ন্য়ায়িক প্রক্রিয়া প্রায়শই সীমাবদ্ধ থাকে।

রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে যে বিদ্যমান আইন প্রায় ৯ মিলিয়ন মানুষ, বা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশকে নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বিশেষ করে সেই সব নাগরিক যারা ভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্কযুক্ত বা ডুয়াল নাগরিক, তাদের জন্য এই ঝুঁকি বেশি।

রিপোর্ট বলেছে যে এই শক্তি “অস্পষ্ট ও সংজ্ঞাহীন” বিধানগুলোর মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়, যার ফলে রঙ, ঐতিহ্য বা পটভূমি অনুসারে মানুষের ওপর বেশি প্রভাব পড়ে। আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আফ্রিকার বংশোদ্ভূত নাগরিক।

এই রিপোর্টে শামিমা বেগমের মতো কিছু উচ্চ-প্রোফাইল মামলা উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি ১৫ বছর বয়সে সন্ত্রাসী সংগঠনের এলাকায় গিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তার নাগরিকত্ব তুলে নেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এটিকে শিশু পাচারের ঘটনায় জড়িত একজন নাগরিকের ক্ষেত্রে অভিযোগ ভিত্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

রান্নিমিড ট্রাস্টের প্রধান শাবনা বেগম বলেন, “নাগরিকত্ব একটি অধিকার; এটি কোনো সংরক্ষিত বা প্রিভিলেজ হওয়া উচিত নয়।” তিনি আরও বলেন, এই ক্ষমতাগুলি বর্ণভিত্তিক বৈষম্য সৃষ্টি করছে এবং মৌলিক ন্যায়ের মূল নীতির সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক।

পড়ুনঃ  'ইসলামবিরোধী পক্ষপাতিত্বের' শিকার হয়েছে সৈন্য, স্বীকার করলো ব্রিটিশ সেনাবাহিনী

হোম অফিস এর সমালোচনাকে “ভীতিকর ও ভুল” বলে খারিজ করেছে এবং তাদের দাবী যে নাগরিকত্ব প্রত্যাহার কেবল “ব্রিটিশ জনসাধারণকে সন্ত্রাসবাদ ও কঠোর নিষ্ঠুর অপরাধীসহ বিপজ্জনক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে” পরিচালিত হচ্ছে এবং মাত্র সামান্য সংখ্যক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হ

রাজ্যায়ত্ত রাজনৈতিক ও সাংসদরা এই নিয়ে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কনসার্ভেটিভ এমপি অ্যান্ড্রু মিচেল বলেছেন যে সরকারের কাছে এমন ক্ষমতা থাকা “সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করা উচিত” এবং এই ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায়ের পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন আছে। লেবার পীয়ার লর্ড আল্ফ ডাবস এই ব্যবস্থাকে “অত্যন্ত ঘৃণ্য” বলে অভিহিত করেছেন এবং পরিবর্তনের দাবি তুলে ধরেছেন।

এমন অবস্থায় নাগরিকত্বে থাকা ব্যক্তিদের অধিকার ও ন্যায়ের নিশ্চয়তা নিয়ে যুক্তরাজ্যের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গভীর আলোচনা ও চাপ তৈরি হচ্ছে।

নাগরিকত্ব কি শর্তাধীন অধিকার?

যুক্তরাজ্যে নাগরিকত্ব প্রত্যাহার সংক্রান্ত সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন দেশটির গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসন নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ‘জনস্বার্থ’ দেখিয়ে যেভাবে গোপনে নাগরিকত্ব বাতিল করা হচ্ছে, তা কার্যত একটি দুই-স্তরীয় নাগরিকত্ব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে—যেখানে সবাই সমান নয়।

২০১০ সালের পর থেকে দুই শতাধিক ব্রিটিশ নাগরিকের নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি, এমনকি আপিলের সুযোগও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। নাগরিকত্বের মতো একটি মৌলিক আইনি অবস্থান যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে, সীমিত স্বচ্ছতায় এবং প্রায় গোপন প্রক্রিয়ায় বাতিল করা যায়, তবে তা কেবল অভিবাসন নীতির প্রশ্ন নয়—এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের মূল ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়।

সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো এই ক্ষমতার প্রয়োগে বৈষম্যের অভিযোগ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে বা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে—বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার পটভূমির মুসলিম নাগরিকরা—এই ঝুঁকির মুখে বেশি। এর ফলে জন্মসূত্রে একক নাগরিকত্বধারী ও অভিবাসী পটভূমির নাগরিকদের মধ্যে একটি অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, নাগরিকত্ব কি তবে সবার জন্য সমান নয়?

পড়ুনঃ  ব্রিটেনের কারাগারে বন্দী বাংলাদেশীদের ৪২.৩ যৌন অপরাধী

সরকারের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। হোম অফিসের দাবি, নাগরিকত্ব প্রত্যাহার একটি ব্যতিক্রমী ক্ষমতা, যা কেবল জাতীয় নিরাপত্তা ও গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু নিরাপত্তার যুক্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তা যদি ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার মৌলিক নীতিকে অগ্রাহ্য করে, তবে সেই নিরাপত্তা নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকত্ব কেবল একটি প্রশাসনিক সুবিধা নয়; এটি অধিকার, দায়িত্ব ও সুরক্ষার একটি সমন্বিত চুক্তি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও রাষ্ট্রহীনতা এড়ানো, ন্যায্য শুনানি এবং কার্যকর আপিলের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়। অথচ বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই এসব নীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা ও অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ অনেক সময় ভোটের রাজনীতিতে লাভজনক হতে পারে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য নাগরিকত্বের মতো একটি মৌলিক ধারণাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিকর। এতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভীতি, অনিশ্চয়তা ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বাড়ে, যা সামাজিক সংহতির পরিপন্থী।

এই প্রেক্ষাপটে নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা না হলেও, এর ওপর কঠোর সংসদীয় নজরদারি, স্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা এবং স্বাধীন বিচারিক তদারকি অপরিহার্য। নাগরিকত্ব কখনোই এমন একটি শর্তাধীন পরিচয়ে পরিণত হওয়া উচিত নয়, যা কেবল কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নিরাপদ আর অন্যদের জন্য অনিশ্চিত।

যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও সমতার প্রতীক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছে। সেই পরিচয় বজায় রাখতে হলে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নীতিতেও সেই মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। অন্যথায় প্রশ্ন থেকেই যাবে—এই রাষ্ট্রে নাগরিকত্ব কি সত্যিই সবার জন্য সমান?

সূত্রঃ The Independent

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here