Home সম্পাদকীয় এমন জানাজা কয়জনের ভাগ্যে জোটে?

এমন জানাজা কয়জনের ভাগ্যে জোটে?

127
0

– সুমন মাহমুদ


এমন জানাজা কয়জনের ভাগ্যে জোটে—এই প্রশ্নটি আজ আর অলংকারমাত্র নয়, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুসন্ধান। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে শরীফ ওসমান বিন হাদীর জানাজা এমন এক ঘটনা, যা কেবল একজন মানুষের মৃত্যুকে নয়, বরং একটি সময়, একটি প্রজন্ম এবং একটি দমন-পীড়নের ভেতর জন্ম নেওয়া চেতনার বহিঃপ্রকাশকে প্রতিনিধিত্ব করে। বাংলাদেশ বহু জানাজা দেখেছে, বহু শোক দেখেছে, কিন্তু সব জানাজা ইতিহাসে দাগ কাটে না। হাদীর জানাজা দাগ কেটেছে, কারণ এটি ছিল মানুষের অন্তরের আর্তনাদ, ক্ষোভ, ভালোবাসা ও প্রত্যয়ের একসাথে বিস্ফোরণ।

তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আসনে বসা নেতা ছিলেন না, কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পদে ছিলেন না। তবুও তার জানাজায় প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষের উপস্থিতি, রাজধানী ঢাকার কার্যত স্থবির হয়ে পড়া, দেশজুড়ে আলোড়ন এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে দেয় যে রাজনৈতিক শক্তি সবসময় ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে জন্মায় না। কখনো কখনো তা জন্ম নেয় নৈতিক অবস্থান, সাহসী উচ্চারণ এবং আপসহীনতার মধ্য দিয়ে। মানুষ তার জানাজায় এসেছে দলীয় পরিচয় মুছে ফেলে, এসেছে একজন মানুষকে নয়, একটি ধারণাকে বিদায় জানাতে।

মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে শরীফ ওসমান বিন হাদী এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিলেন, যেখানে পৌঁছাতে অনেক রাজনীতিবিদকে পুরো জীবন পার করে দিতে হয়। এই বয়সে তিনি সারাদেশের মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছেন—এটি নিজেই একটি বিস্ময়। আজ তাই মনে হচ্ছে, জীবিত হাদীর চেয়ে নিহত হাদী আরও বেশি শক্তিশালী। কারণ জীবিত মানুষকে দমন করা যায়, সীমাবদ্ধ করা যায়, কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষটি যখন প্রতীকে রূপ নেয়, তখন তাকে আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। হাদী এখন আর শুধু একজন ব্যক্তির নাম নয়, তিনি হয়ে উঠেছেন আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনীতির প্রতীক, তরুণদের প্রতিবাদের ভাষা এবং আপসহীন অবস্থানের সাহসী স্মারক।

পড়ুনঃ  ডারউইনবাদ এবং ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন

তার জানাজার পরিবেশ ছিল হৃদয়বিদারক, কিন্তু একই সঙ্গে শক্তিতে ভরপুর। মানুষের চোখে ছিল অশ্রু, আবার কণ্ঠে ছিল দৃঢ় উচ্চারণ। শোক আর প্রতিবাদ সেখানে আলাদা ছিল না; বরং একে অপরকে শক্তি জুগিয়েছে। এই জানাজা দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ কেবল শোক প্রকাশ করতে জানে না, শোককে রাজনৈতিক চেতনায় রূপান্তর করতেও জানে। এটি ছিল নিছক বিদায়ের আয়োজন নয়, বরং একটি নীরব ঘোষণাপত্র—যেখানে বলা হয়েছে, এই সমাজ এখনো প্রশ্ন করতে চায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়।

আন্তর্জাতিক মহল থেকে শোকবার্তা, ঢাকায় বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের উপস্থিতি এবং বৈশ্বিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি প্রমাণ করে যে ঘটনাটি কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগও নতুন করে তৈরি করেছে। একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু কীভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে, হাদীর ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

এই জানাজা বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের জন্যও একটি নিঃশব্দ কিন্তু গভীর শিক্ষা রেখে গেছে। মানুষ কাকে অনুসরণ করে, কেন অনুসরণ করে—এর উত্তর ক্ষমতার হিসাবের খাতায় পাওয়া যায় না। মানুষ অনুসরণ করে তাদের, যারা ভয় পায় না, যারা সত্য উচ্চারণে দ্বিধা করে না, যারা নিজের জীবনকে আদর্শের সঙ্গে একাকার করে ফেলে। হাদীর জানাজা দেখিয়ে দিয়েছে, তরুণ সমাজকে অবহেলা করে, ভিন্নমতকে দমন করে দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাজনীতি টিকে থাকতে পারে না। দমন অনেক সময় আদর্শকে হত্যা করে না, বরং তাকে আরও বিস্তৃত করে দেয়।

আজ মনে হচ্ছে, হাদী নেই, কিন্তু তার উপস্থিতি আগের চেয়ে বেশি। তিনি আর মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেবেন না, কিন্তু তার নামেই স্লোগান উঠছে। তিনি আর বক্তৃতা দেবেন না, কিন্তু তার চিন্তা ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের কথায় কথায়। তার মৃত্যু যেন এক অদ্ভুত রূপান্তর ঘটিয়েছে—একজন মানুষ থেকে তিনি পরিণত হয়েছেন একটি চলমান শক্তিতে, যা নানা মত, নানা ধারার আধিপত্যবাদবিরোধী শক্তিকে আবারও এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

পড়ুনঃ  যে বিপর্যয় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায়

এমন জানাজা সবার ভাগ্যে জোটে না। এটি তাদের ভাগ্যে জোটে, যারা জীবনের চেয়ে বড় কিছু হয়ে উঠতে পারে। শরীফ ওসমান বিন হাদী হয়তো রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে পারেননি, কিন্তু তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের হৃদয়ের গভীরে। আর রাজনীতিতে, ইতিহাসে এবং সমাজে—এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান। কিছু মৃত্যু শেষ নয়, কিছু মৃত্যু শুরু। হাদীর মৃত্যু ঠিক তেমনই এক শুরু, যা বাংলাদেশকে নতুন করে ভাবতে, নতুন করে জাগতে এবং নতুন করে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে।
সুমন মাহমুদ
লেখক, গবেষক ও টিভি উপস্থাপক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here