Home সম্পাদকীয় প্রবাসী ভোটাধিকার: সম্ভাবনার আলো নাকি হারিয়ে যাওয়ার সতর্কতা

প্রবাসী ভোটাধিকার: সম্ভাবনার আলো নাকি হারিয়ে যাওয়ার সতর্কতা

187
0

– সুমন মাহমুদ

পত্রিকায় জানলাম যে, প্রবাসীদের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো শুরু হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। দীর্ঘদিনের দাবি, আন্দোলন ও প্রতীক্ষার পর প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু এই অর্জনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর হতাশা ও ভবিষ্যতের জন্য বড় এক সতর্ক সংকেত।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দিতে এখন পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ১৭ হাজারের কিছু বেশি ভোটার। এর মধ্যে প্রবাসী ভোটার, ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোটার, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নিজ এলাকার বাইরে অবস্থানরত সরকারি চাকরিজীবীরাও রয়েছেন। অথচ বাস্তবতা হলো—বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা আনুমানিক ১ কোটি ৩৫ লাখের মধ্যে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই বসবাস করেন কয়েক মিলিয়ন বাংলাদেশি শ্রমজীবী মানুষ। সেই তুলনায় প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য।

পরিসংখ্যান আরও হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরে। সৌদি আরবে যেখানে বাংলাদেশির সংখ্যা কয়েক মিলিয়নের কাছাকাছি, সেখানে নিবন্ধন হয়েছে মাত্র দেড় লাখের কিছু বেশি। কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত—এই দেশগুলোতে লাখ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করলেও নিবন্ধনের হার তুলনামূলকভাবে খুবই কম। পুরো মধ্যপ্রাচ্য মিলিয়ে নিবন্ধিত প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা মোট প্রবাসীর একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। প্রশ্ন ওঠে—এই ঘাটতি কেন?

প্রথমত, দূতাবাসগুলোর ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনার জায়গা রয়েছে। প্রবাসী ভোটাধিকার একটি রাজনৈতিক অধিকার হলেও এর প্রচার, ব্যাখ্যা ও উৎসাহ দেওয়ার কাজ অনেক দূতাবাসই প্রত্যাশিত মাত্রায় করতে পারেনি। দূতাবাসভিত্তিক সক্রিয় প্রচারণা, কমিউনিটি সভা, বিভিন্ন আবাসস্থল ও ক্যাম্পে সরাসরি সচেতনতা কার্যক্রম কিংবা স্থানীয় ভাষায় সহজ নির্দেশিকা—এসব উদ্যোগ খুব সীমিত পরিসরেই দেখা গেছে। অনেক প্রবাসী এখনো জানেন না, কীভাবে নিবন্ধন করতে হয়, কী প্রয়োজন, কিংবা এটি আদৌ তাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

পড়ুনঃ  Allama Sayeedi: The Nitinghale of Quran

দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা আলাদা। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ছুটি সংকট, ক্যাম্পজীবন, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা—এই বাস্তবতার ভেতরে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ হয়তো অনেকের কাছে সহজ মনে হয়নি। অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র, সংশ্লিষ্ট দেশের মোবাইল নম্বর বা কাগজপত্র সংক্রান্ত জটিলতায় আগ্রহ হারিয়েছেন। প্রযুক্তিনির্ভর একটি ব্যবস্থা চালু করলেও মাঠপর্যায়ে সহায়তা না থাকলে তা বড় অংশের মানুষের কাছে পৌঁছায় না—এ সত্যটি এখানে প্রমাণিত হয়েছে।

তৃতীয়ত, প্রবাসীদের মধ্যেও আগ্রহ ও বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার কারণে অনেকের মনে ধারণা তৈরি হয়েছে—“ভোট দিয়ে কী হবে?” এই মানসিকতা ভাঙার জন্য কেবল প্রযুক্তি নয়, রাজনৈতিক ও নাগরিক সচেতনতার ধারাবাহিক কাজ প্রয়োজন ছিল, যা এবার পর্যাপ্তভাবে হয়নি।

আরেকটা হতাশাজনক চিত্র, যেখানে মধ্যপ্রাচের দেশগুলোকে ঠিকানা ও আইডিকার্ড সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে, সেখানে ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাসকারীদের সে জটিলতা নেই বললেই চলে । এসব দেশে কয়েক মিলিয়ন বাংলাদেশির বড় একটা অংশ ভোটার আইডি থাকার পরও কেন তারা রেজিস্ট্রেশন করছে না; বিষয়টা অবশ্যই চিন্তা করা উচিত। কমিউনিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আরও সচেতন হওয়া জরুরী মনে করি।
এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যৎ আরও উদ্বেগজনক হতে পারে। নির্বাচন কমিশন যদি দেখে যে এত আয়োজন, এত ব্যয় এবং প্রশাসনিক ঝুঁকির পরও প্রবাসীদের অংশগ্রহণ খুব সীমিত, তাহলে ভবিষ্যতে প্রবাসী ভোট ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে। তখন বলা হতে পারে—চাহিদা নেই, সাড়া নেই, তাই এই ব্যবস্থা টেকসই নয়। এর দায় তখন কার ওপর পড়বে?

দূতাবাসগুলোর উচিত এখনই সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া। শুধু ব্যালট পাঠানো নয়, নিবন্ধন বৃদ্ধির জন্য মাঠপর্যায়ের সহায়তা কেন্দ্র, ভ্রাম্যমাণ হেল্পডেস্ক, বাংলাদেশি বিভিন্ন মসজিদ ও কমিউনিটি নেতাদের সম্পৃক্ত করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনেরও উচিত অ্যাপ ব্যবহারের জটিলতা কমানো, ভাষাগত ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানো এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা মাথায় রেখে বিশেষ নির্দেশনা তৈরি করা।

পড়ুনঃ  বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমার কারণঃ একটি ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান

আর প্রবাসীদের নিজেদেরও ভাবতে হবে। ভোটাধিকার শুধু একটি সুবিধা নয়, এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের মৌলিক প্রকাশ। আজ যদি প্রবাসীরা উদাসীন থাকেন, কাল এই অধিকার আবার হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য এটি একটি পরীক্ষার মুহূর্ত—তারা কি কেবল রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ হয়ে থাকবেন, নাকি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যত গঠনের অংশীদার হবেন?

এই নির্বাচন শুধু একটি ভোট নয়, এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি বার্তা দেওয়ার সুযোগ। সেই বার্তা যদি দুর্বল হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রবাসী ভোটাধিকার নিয়ে যে আলো জ্বলেছে, তা নিভে যাওয়ার দায় আমাদের সবার ওপরই বর্তাবে।

সুমন মাহমুদ
লেখক, গবেষক ও টিভি উপস্থাপক
কর্যনির্বাহী পরিষদ সদস্য, প্রবাসী ভোটাধিকার আন্দোলন, যুক্তরাজ্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here