নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি ২০২৬
২০২৫ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব জাস্টিস (গণপিটুনি), সাংবাদিক নির্যাতন এবং নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই চিত্র তুলে ধরেছে। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও নিজস্ব তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়।
রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধ এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ৯১৪টি সহিংসতায় ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির ৯৩ জন এবং আওয়ামী লীগের ২৩ জন কর্মী রয়েছেন। আহত হয়েছেন ৭,৫১১ জন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে ৫৪টি ঘটনায় ৩ জনের মৃত্যু ও ৪৯৪ জন আহতের খবর পাওয়া গেছে।
এছাড়া, গত এক বছরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামে কমপক্ষে ২৪৪টি মামলা হয়েছে, যেখানে ৪২ হাজারেরও বেশি অজ্ঞাতনামা আসামিসহ বিপুল সংখ্যক মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। যৌথবাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
মব সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত মৃত্যু
এইচআরএসএস মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালে চুরির অপবাদ, ধর্মীয় অবমাননা ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগে ২৯২টি ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত ও ২৪৮ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে, নির্যাতন বা গুলিতে ৪০ জন নিহত হয়েছেন। কারাগারে অসুস্থতা বা নির্যাতনে মারা গেছেন আরও ৯২ জন কয়েদী ও হাজতি।
সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
সংবাদকর্মীদের জন্য ২০২৫ সাল ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৩১৮টি হামলায় ৫৩৯ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের অধীনে অভিযুক্ত করা হয়েছে ৫৪ জনকে।
নারী ও শিশু নির্যাতন
গত এক বছরে ২,০৪৭ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৮২৮ জন ধর্ষণের শিকার হন, যার বড় একটি অংশ (৪৭৪ জন) শিশু। যৌতুক ও পারিবারিক সহিংসতার কারণেও প্রাণ হারিয়েছেন অনেক নারী। অন্যদিকে, ১৩৭১ জন শিশু বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৮৮ জন মারা গেছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে ও নির্যাতনে ৩২ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। এছাড়া সীমান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষকে পুশইন করা এবং জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মিয়ানমার সীমান্তেও আরাকান আর্মির হামলায় হতাহত ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।
অন্যান্য সহিংসতা
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ২৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ৫৬টিরও বেশি মাজার ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১৬৮ জন এবং শ্রমিক অসন্তোষ ও সংঘর্ষে আরও ৯৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন।
সমাধানে এইচআরএসএস-এর আহ্বান
এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, “আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে।” তিনি সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

