Home ধর্ম ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : সবচেয়ে সহজ যে ইবাদতটি আমরা অবহেলা...

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : সবচেয়ে সহজ যে ইবাদতটি আমরা অবহেলা করি

74
0

শায়খ আবদুল কাইয়ুম

আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো।
আর সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করো। (সূরা আহযাব, ৩৩:৪১–৪২)

এই নির্দেশ খুবই স্পষ্ট । এতে কোনো শর্ত নেই, কোনো নির্দিষ্ট মানুষের জন্য নয় । আল্লাহ আমাদের কাছে কঠিন কিছু চাননি। তিনি আমাদের কষ্টে ফেলতে বলেননি। তিনি শুধু বলেছেন- তাঁকে বেশি বেশি স্মরণ করতে।

সত্যি করে ভাবলে দেখব—এটাই আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে সহজ ইবাদতগুলোর একটি । কিন্তু দুঃখজনকভাবে এটিই আমরা সবচেয়ে বেশি অবহেলা করি।

আল্লাহকে স্মরণ করা (যিকির) অন্য সব ইবাদতের চেয়ে আলাদা । নামাজের শর্ত আছে। রোজার নির্দিষ্ট সময় আছে। হজের জন্য সামর্থ্য ও সফর দরকার। কিন্তু যিকিরের কোনো বাধা নেই। মানুষ দাঁড়িয়ে, বসে, হাঁটতে হাঁটতে বা শুয়ে থেকেও আল্লাহকে স্মরণ করতে পারে। ওজু থাকুক বা না থাকুক, সুস্থ হোক বা অসুস্থ- সব অবস্থাতেই যিকির করা যায়।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন- যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে।  এর মানে—জীবনের এমন কোনো সময় নেই, যখন আল্লাহকে স্মরণ করা অসম্ভব। কেউ যদি নামাজ পড়তে না পারে, রোজা রাখতে না পারে, এমনকি নড়াচড়া করতেও না পারে—তবুও জিহ্বা দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করতে পারে।

এই কারণেই আলেমরা বলেছেন- যিকির শরীরের জন্য হালকা, কিন্তু আমলের পাল্লায় খুব ভারী। এর জন্য দরকার নেই বিশেষ জায়গা, বিশেষ সময়, বিশেষ প্রস্তুতি শুধু দরকার ইখলাস (খাঁটি মন) ও সচেতনতা।

সকাল ও সন্ধ্যার যিকির :
আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁকে স্মরণ করার কথা বলেছেন। এটি রাসুল (সা:) এর শেখানো পরিচিত সকাল-সন্ধ্যার যিকিরের দিকেই ইঙ্গিত করে।

এই যিকির শুধু আলেমদের জন্য নয় । এটি সব মুমিনের জন্য। ছোট-বড়, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার জন্য। এই যিকির মানুষকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। দুশ্চিন্তা কমায়। ঈমানকে শক্ত করে। শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচায়।

পড়ুনঃ  ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা: ইসলামে পারিবারিক নির্যাতনের কোনো স্থান নেই 

আমাদের অনেকেই সকাল শুরু করি ফোন দেখে, কাজের চিন্তায় । সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে যাই, মন অস্থির থাকে। কিন্তু আল্লাহর যিকির করার জন্য সময় বের করি না। এটা অক্ষমতার কারণে নয়, বরং গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে। রাসুল (সা:) একবার বলেছিলেন মুফাররিদুনরা এগিয়ে গেছে। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন—তারা কারা? তিনি বললেন “যারা বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করে—পুরুষ ও নারী।

তারা সম্পদ বা মর্যাদার কারণে এগিয়ে যায়নি। তারা এগিয়ে গেছে কারণ তাদের হৃদয় আল্লাহর যিকিরে জীবিত ছিল। আল্লাহ কুরআনে মুমিনদের গুণাবলি উল্লেখ করে শেষে বলেন:
যেসব পুরুষ ও নারী আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে—আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন । (সূরা আহযাব, ৩৩:৩৫)।

আল্লাহ বলেন, আমার স্মরণের জন্য নামাজ কায়েম করো। নামাজের প্রতিটি অংশই যিকির—তাকবির, কিরাত, রুকু, সিজদা সবই। নামাজের বাইরে যদি যিকির দুর্বল হয়, তাহলে নামাজও তাড়াহুড়ো ও মনোযোগহীন হয়ে যায়। আর সারাদিন যিকিরে অভ্যস্ত হলে নামাজ হয় গভীর ও প্রাণবন্ত। যিকির কোনো ছোট ইবাদত নয়। এটাই ইবাদতের মূল।

আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই অন্তর শান্তি পায়। আজকের যুগে অস্থিরতা খুব বেশি। বাইরে সব ঠিক থাকলেও ভেতরে মানুষ অশান্ত। আল্লাহ পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন শান্তি কোথায়। তা বিনোদনে নয়, সব সময় ব্যস্ত থাকায় নয়, অযথা কথা বা স্ক্রলিংয়ে নয়।
শান্তি আসে সেই হৃদয়ে, যা নিয়মিত আল্লাহকে স্মরণ করে। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জীবন হবে সংকীর্ণ। আল্লাহর স্মরণ ছাড়া জীবন ভারী ও অস্থির হয়ে যায়। শয়তানের নীরব জয় হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, শয়তান তাদের কাবু করে ফেলেছে এবং আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে। কেউ যদি দীর্ঘ সময় “সুবহানাল্লাহ” বা “আস্তাগফিরুল্লাহ” না পড়ে তাহলে বুঝতে হবে ওই ব্যক্তির অন্তরে শয়তান জায়গা করে নিয়েছে।

পড়ুনঃ  প্রসঙ্গ: এক কালেমায় রুজি-রুটি ও আরেক কালেমায় ফাঁসি..

ইসলাম আমাদের কাজ বা পরিবার ছেড়ে দিতে বলেনি। বরং ব্যস্ত জীবনের মাঝেই আল্লাহকে স্মরণ করতে শিখিয়েছে। রাসুল (সা:) বলেছেন, যে আল্লাহকে স্মরণ করে আর যে করে না—তাদের উদাহরণ জীবিত ও মৃতের মতো। (বুখারি ও মুসলিম)। যিকিরহীন হৃদয় ধীরে ধীরে মৃত হয়ে যায়। ব্যস্ততা কোনো অজুহাত নয়। অনেকে বলে—আমরা খুব ব্যস্ত। আল্লাহ এর জবাব দিয়েছেন তোমাদের সম্পদ ও সন্তান যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। আর যারা তা করবে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। (সূরা মুনাফিকুন, ৬৩:৯)।

ব্যস্ততা সমস্যা নয়। সমস্যা হলো—আল্লাহকে ভুলে যাওয়া। একজন মুমিন হাঁটতে হাঁটতে, কাজ করতে করতে, গাড়ি চালাতে চালাতে, অপেক্ষার সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করে।

সহজভাবে শুরু করুন । শুরু করুন ছোট ছোট আমল দিয়ে । সকাল ও সন্ধ্যার যিকির।
নামাজের পর তাসবিহ । দিনে কয়েকবার ইস্তিগফার । ঘুমানোর আগে আল্লাহকে স্মরণ।

এই ছোট আমলগুলো নিয়মিত হলে জীবনে নূর, শান্তি ও নিরাপত্তা আসবে।

আল্লাহ আমাদের জিহ্বাকে তাঁর যিকিরে জীবিত রাখুন, আমাদের হৃদয়কে গাফেলতি থেকে রক্ষা করুন এবং তাঁর নৈকট্যের মাধ্যমে আমাদের শান্তি দান করুন। আমাদের সামান্য আমল কবুল করুন এবং আমাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন। আমিন।

শায়খ আবদুল কাইয়ুম : প্রধান ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মসজিদ এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার ।  ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here