মুসলিম আন্দালুসিয়া পতনের ৫৩৪তম বছর।
১৪৯০ সালে বাজা নগরের পতন এবং আল-জাঘালের বন্দিত্বের পর মনে হয়েছিল গ্রানাডা যুদ্ধ কার্যত শেষ। ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা তাই ভেবেছিলেন। কিন্তু গ্রানাডার শেষ শাসক আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ—বোয়াবদীল—এই অবস্থায় সন্তুষ্ট ছিলেন না। যেসব ভূখণ্ড তার জন্য প্রতিশ্রুত ছিল, সেগুলো সরাসরি খ্রিস্টান প্রশাসনের অধীনে চলে যাচ্ছিল। এই বিশ্বাসঘাতকতার বোধ থেকেই তিনি আনুগত্য ভেঙে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, যদিও তখন তার নিয়ন্ত্রণে ছিল কেবল গ্রানাডা নগর ও আলপুজারাস পর্বতমালা। এই অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা যে অসম্ভব—তা তিনিও জানতেন। তাই তিনি মরিয়া হয়ে বাইরের সাহায্যের জন্য হাত বাড়ান।
তিনি মিসরের সুলতানের কাছে সাহায্য চান। সুলতান কেবল কূটনৈতিক ভর্ৎসনাই করেন; কার্যকর কোনো সহায়তা দেন না। কারণ তখন মামলুকরা অটোমানদের সঙ্গে প্রায় অবিরাম যুদ্ধে জড়িত। কাস্তিল ও আরাগন ছিল অটোমানদের শত্রু—এই বাস্তবতায় বিদ্যমান জোট ভাঙতে সুলতান আগ্রহী ছিলেন না। বোয়াবদীল মরক্কোর ফেজ রাজ্যের কাছেও আবেদন করেন, কিন্তু ইতিহাস সেখানে নীরব। উত্তর আফ্রিকা পুরো যুদ্ধকালেই কাস্তিলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখে। উপরন্তু গ্রানাডার হাতে তখন আর কোনো উপকূল ছিল না, যেখান দিয়ে সমুদ্রপথে সাহায্য আসতে পারত। ফলে গ্রানাডা সম্পূর্ণ একা পড়ে যায়।
১৪৯১ সালের এপ্রিল মাসে গ্রানাডা নগরী আট মাসব্যাপী অবরোধের মুখে পড়ে। সময় যত গড়ায়, প্রতিরক্ষাকারীদের অবস্থা ততই শোচনীয় হয়। অবরোধ ভাঙার শক্তি ফুরিয়ে আসে, আর নগরের ভেতরে শুরু হয় উপদেষ্টাদের ষড়যন্ত্র, ঘুষ ও বিশ্বাসঘাতকতা। বোয়াবদীলের অন্তত একজন প্রধান উপদেষ্টা পুরো সময়জুড়েই কাস্তিলের হয়ে কাজ করছিল—এমন প্রমাণও পাওয়া যায়। অবশেষে ১৪৯১ সালের ২৫ নভেম্বর ‘গ্রানাডা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। দুই মাসের বিলম্ব ছিল মূলত গ্রানাডার অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার ফল। শেষ পর্যন্ত তুলনামূলক উদার শর্তে সমঝোতা হয় এবং ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি গ্রানাডা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। কোনো প্রতিরোধ হয়নি। আলহাম্ব্রায় খ্রিস্টান সৈন্য প্রবেশ করে নিঃশব্দে। প্রতিরোধ এখানেই শেষ।
গ্রানাডা যুদ্ধের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল কামান ও ভারী গোলন্দাজ অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার। যুদ্ধের শুরুতে কাস্তিল ও আরাগনের হাতে কামান ছিল সীমিত, কিন্তু ফরাসি ও বার্গুন্ডীয় বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় তারা দ্রুত এই শক্তি বাড়ায়। মুসলিম বাহিনী এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে ছিল। ইতিহাসবিদ ওয়েস্টন এফ. কুক জুনিয়রের ভাষায়, “বারুদভিত্তিক গোলন্দাজ অবরোধই গ্রানাডা যুদ্ধ জিতিয়ে দেয়; অন্যান্য কারণ ছিল গৌণ।” ১৪৯৫ সালের মধ্যে কাস্তিল ও আরাগনের হাতে ১৭৯টি কামান ছিল।
এই যুদ্ধে আদিম আগ্নেয়াস্ত্র ও আর্কেবুস সীমিতভাবে ব্যবহৃত হয়। ভারী অশ্বারোহীদের ভূমিকা কমে গিয়ে হালকা অশ্বারোহী জিনেতেসরা গুরুত্ব পায়। গ্রানাডার বাহিনী সংখ্যায় কম হওয়ায় বড় মাঠযুদ্ধ এড়িয়ে চলে। কাস্তিলীয় বাহিনী ব্যাপক সহায়ক শ্রমিক ব্যবহার করে—ফসল ধ্বংস, গ্রাম লুট ও রসদ নিশ্চিত করার কাজে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি সত্ত্বেও তারা নতুন রাস্তা নির্মাণ করে সরবরাহ সচল রাখে।
রাজনৈতিকভাবে ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা সেনাবাহিনীর ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হন। অপরদিকে গ্রানাডা ছিল অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত। ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বের অভাব রাজ্যটিকে আরও দুর্বল করে তোলে। সেনাসংখ্যা নিয়ে প্রচলিত হিসাবগুলো অতিরঞ্জিত। আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী, কাস্তিলীয় বাহিনী সাধারণত ৮,০০০–১২,০০০ সৈন্য নিয়ে অভিযান চালাত। মুসলিম বাহিনীর প্রকৃত সংখ্যা ছিল আরও কম। যুদ্ধের শেষদিকে শক্তির অনুপাত দাঁড়ায় প্রায় দুই বা তিনের বিপরীতে এক।
আল-আন্দালুস ছিল আট শতাব্দীর জ্ঞান, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। কর্ডোভা, সেভিয়া, তোলেডো, গ্রানাডা—একদিন ইউরোপকে আলোকিত করেছিল। কিন্তু লাস নাভাস দে তোলোসার পর থেকে সেই আলো ধীরে ধীরে নিভতে থাকে। শহর পতন, জনসংখ্যা হ্রাস, গৃহকলহ ও বহিরাগত আক্রমণ মিলিয়ে আকাশে জমে ওঠে শোকের মেঘ। তবুও মুহাম্মদ ইবন আল-আহমার তাঁর বুদ্ধি ও ধৈর্যে শেষ প্রদীপটি দুই শতাব্দীর বেশি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন।
গ্রানাডা ছিল শেষ আশ্রয়। পাহাড়ি উপত্যকায় আলহাম্ব্রা—যেখানে কবিতা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা আর দর্শন একসঙ্গে শ্বাস নিত। কিন্তু বাইরে ছিল অবরোধের নীরব বলয়। ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ১৪৬২ সালে জিব্রাল্টার পতনের মাধ্যমে গ্রানাডা উত্তর আফ্রিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে—যেন শিরায় রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ১৪৮২ থেকে ১৪৯২—এই দশক ছিল নিঃশব্দ মৃত্যুযাত্রা।
১৪৯২ সালের সেই জানুয়ারির দিনে যখন গ্রানাডার চাবি ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার হাতে তুলে দেওয়া হয়, আলহাম্ব্রার মিনারগুলো যেন নীরবে তাকিয়ে থাকে অতীতের দিকে। কথিত আছে, বোয়াবদীল শহর ত্যাগ করার সময় ফিরে তাকিয়ে শেষবারের মতো গ্রানাডাকে দেখেছিলেন। ইতিহাস একে বলে—“মুরের শেষ দীর্ঘশ্বাস।”
এরপর প্রতিশ্রুতি ভেঙে আসে দমন। ধর্মান্তর, গ্রন্থদাহ, আরবি ভাষার নিষেধাজ্ঞা। আলপুজারাস বিদ্রোহের রক্তাক্ত পরিসমাপ্তিতে আন্দালুসের গান, কবিতা, স্মৃতি বাতাসে মিলিয়ে যায়। কিন্তু আলহাম্ব্রার দেয়াল আজও ফিসফিস করে বলে—
“আমাকে জয় করেছ, কিন্তু আমার আত্মা তোমাদের কখনো হবে না।”
আল-আন্দালুসের পতন শুধু একটি সামরিক পরাজয় নয়। এটি ছিল জ্ঞান, সহাবস্থান ও সৌন্দর্যের ওপর আঘাত। একটি স্বপ্নরাজ্যের সমাধিলিপি। তবুও তার উত্তরাধিকার বেঁচে আছে মানুষের জ্ঞানচর্চা ও সভ্যতার স্মৃতিতে—যতদিন মানুষ আলো খুঁজবে, ততদিন আন্দালুস স্মরণীয় থাকবে।
সুমন মাহমুদ
লেখক ও টিভি উপস্থাপক




