Home বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আদম এবং ইভ সত্যিই ছিলেন। বিশ্বাস করছেন বিজ্ঞানীরা।

আদম এবং ইভ সত্যিই ছিলেন। বিশ্বাস করছেন বিজ্ঞানীরা।

105
0

মানবজাতির আদি উৎস কোথায়? আমরা কি কোনো এক জোড়া আদি পিতা-মাতা থেকে এসেছি, নাকি বিবর্তনের এক বিশাল জনসমষ্টির ফল আমরা? হাজার বছর ধরে এই প্রশ্নগুলো ধর্ম ও বিজ্ঞানের বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। সম্প্রতি কিছু চাঞ্চল্যকর জেনেটিক গবেষণা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অনেক বিজ্ঞানী এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, বাইবেলে বর্ণিত ‘আদম ও ইভ’ (Adam and Eve)-এর অস্তিত্ব থাকা কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং বৈজ্ঞানিক দিক থেকেও এটি সম্ভব।

জেনেটিক্সের চমক: একই সময়ের ‘আদম’ ও ‘ইভ’

এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, আধুনিক মানুষের আদি পুরুষ (Y-chromosomal Adam) এবং আদি নারী (Mitochondrial Eve) কয়েক হাজার বছরের ব্যবধানে পৃথিবীতে বাস করতেন। কিন্তু আধুনিক ডিএনএ বিশ্লেষণ পদ্ধতি বদলে দিয়েছে সেই ধারণা।

ইতালির ইউনিভার্সিটি অফ স্যাসারি-র গবেষকদলের মতে, মানুষের ডিএনএ-তে থাকা আদি পিতা বা ‘আদম’ পৃথিবীতে ছিলেন প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার থেকে ২ লক্ষ বছর আগে। আশ্চর্যজনকভাবে, জেনেটিক্সবিদরা মানুষের আদি মাতার বা ‘ইভ’-এর সময়কালও একই (প্রায় ২ লক্ষ বছর) বলে চিহ্নিত করেছেন। এই গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবীর সমস্ত মানুষের বংশধারা সম্ভবত একটি নির্দিষ্ট যুগল থেকেই শুরু হয়েছিল, যা বাইবেলের জেনেসিস (Book of Genesis) কাহিনীর প্রতিধ্বনি করে।

ইডেন উদ্যানের অবস্থান: মেসোপটেমিয়া বনাম আফ্রিকা

আদম ও ইভের অস্তিত্বের পাশাপাশি তাদের আদি নিবাস বা ‘ইডেন উদ্যান’ নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুটি প্রধান তত্ত্ব কাজ করছে:

১. মেসোপটেমিয়া তত্ত্ব (প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি)

জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এরিক ক্লাইন এবং অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক মনে করেন, ইডেন উদ্যানটি ছিল বর্তমানের মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে (যা এখন ইরাক, পূর্ব সিরিয়া এবং উত্তর-পশ্চিম তুরস্কের অংশ)। তাদের যুক্তির মূলে রয়েছে বাইবেলের নিখুঁত বর্ণনা। সেখানে ইডেন উদ্যানের সাথে টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর উল্লেখ রয়েছে—যা আজও এই অঞ্চলে প্রবাহিত। অধ্যাপক ক্লাইনের মতে, ভৌগোলিক তথ্যগুলো ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েলের পূর্ব দিকে কোনো এক উর্বর স্থানেই ছিল সেই উদ্যান।

পড়ুনঃ  ১৫ সেকেন্ড অতীতে আছি আমরা

২. কালাহারি মরুভূমি তত্ত্ব (জেনেটিক দৃষ্টিভঙ্গি)

বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত একটি ভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, মানুষের আদি জন্মভূমি মেসোপটেমিয়া নয়, বরং আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমি অঞ্চল (বর্তমান বতসোয়ানা)। জেনেটিক্সবিদ ভ্যানাস হেইস এবং তার দল মানুষের প্রাচীনতম ডিএনএ বংশধারা ‘L0’ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, প্রায় ২ লক্ষ বছর আগে সেখানেই প্রথম আধুনিক মানুষের বিকাশ ঘটেছিল। তখন এই অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত উর্বর এবং জলাভূমি ঘেরা এক স্বর্গোদ্যান।

আফ্রিকা থেকে বিশ্ব বিজয়: এক দীর্ঘ পরিযায়ন

বিজ্ঞান ও ইতিহাস যেখানে মিলেছে, তা হলো মানুষের বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার গল্প। প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ তাদের আদি জন্মভূমি (তা মেসোপটেমিয়া হোক বা আফ্রিকা) থেকে বেরিয়ে পড়ে।

আফ্রিকা থেকে মানুষের সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার এই রোমাঞ্চকর যাত্রাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘আউট অফ আফ্রিকা’ (Out of Africa) মডেল। প্রায় ২ লক্ষ বছর আগের সেই যাত্রা কীভাবে ঘটেছিল, তা নিচে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. যাত্রার শুরু: আফ্রিকার সেই সবুজ ভূমি

বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ২,০০,০০০ বছর আগে বর্তমান বতসোয়ানার কালাহারি মরুভূমি অঞ্চলটি এখনকার মতো শুকনো ছিল না। সেখানে ছিল বিশাল এক হ্রদ এবং চারপাশ ছিল সবুজে ঘেরা। প্রায় ৭০ হাজার বছর সেখানে বসবাসের পর জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষের দলগুলো খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে।

২. প্রথম ধাপ: লোহিত সাগর পাড়ি দেওয়া

প্রায় ৬০,০০০ থেকে ৭০,০০০ বছর আগে, একদল সাহসী মানুষ আফ্রিকার শিং (Horn of Africa) বা বর্তমান ইথিওপিয়া অঞ্চল থেকে লোহিত সাগর পাড়ি দেয়। তখন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অনেক কম ছিল, ফলে তারা সহজেই আরব উপদ্বীপে পৌঁছে যায়।

৩. মেসোপটেমিয়া ও এশিয়ায় বিস্তার

আরব উপদ্বীপ থেকে মানুষের এই দলগুলো উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক-সিরিয়া) অঞ্চলে পৌঁছায়। এখান থেকেই মানুষের শাখাগুলো বিভিন্ন দিকে ভাগ হয়ে যায়:

পড়ুনঃ  পৃথিবীতে প্রাণের উন্মেশ হলো কিভাবে?

পরিযায়নের সংক্ষিপ্ত সারণী:

সময়কাল (প্রায়)স্থান
২,০০,০০০ বছর আগেআফ্রিকার কালাহারি অঞ্চলে উদ্ভব।
৭০,০০০ বছর আগেআফ্রিকা ছেড়ে আরব উপদ্বীপে প্রবেশ।
৫০,০০০ বছর আগেদক্ষিণ এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানো।
৪০,০০০ বছর আগেইউরোপে প্রবেশ।
১৫,০০০ বছর আগেবেরিং প্রণালী পার হয়ে আমেরিকায় পৌঁছানো।

৪. বেরিং ল্যান্ড ব্রিজ: আমেরিকা বিজয়

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো মানুষ কীভাবে আমেরিকায় পৌঁছালো। প্রায় ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ বছর আগে, তুষার যুগের সময় সাইবেরিয়া এবং আলাস্কার মাঝে সমুদ্র জমে গিয়ে একটি স্থলপথ (Beringia) তৈরি হয়েছিল। মানুষ পায়ে হেঁটে সেই বরফের রাস্তা দিয়ে উত্তর আমেরিকায় প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

ধর্ম ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন

যদিও বিজ্ঞানীরা বাইবেলের অলৌকিক সৃষ্টিতত্ত্বকে হুবহু সমর্থন করছেন না, তবে আধুনিক জিনতত্ত্ব একটি বিষয়ে একমত: আমরা সবাই মূলত একই পরিবারের সদস্য। আমাদের ডিএনএ-র শেকড় খুঁজতে গেলে আমরা শেষ পর্যন্ত সেই এক জোড়া আদি পিতা-মাতার কাছেই ফিরে যাই, যাদের হাত ধরে ২ লক্ষ বছর আগে আজকের এই মানব সভ্যতার সূচনা হয়েছিল। মেসোপটেমিয়া হোক বা আফ্রিকা—আদম ও ইভ হয়তো কোনো রূপকথা নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের এক বিস্ময়কর বাস্তব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here