Home মতামত জামায়াত–এনসিপি জোটের সম্ভাবনা, রাজনৈতিক যুক্তি ও ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা

জামায়াত–এনসিপি জোটের সম্ভাবনা, রাজনৈতিক যুক্তি ও ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা

172
0

বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে যে কোনো নতুন রাজনৈতিক জোটকে ঘিরেই আলোচনা, সংশয় ও সমালোচনা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে যখন সেই জোটে থাকে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ঐতিহ্য, সামাজিক ভিত্তি ও ভোটব্যাংক—তখন প্রশ্ন আরও তীব্র হয়। জামায়াত–এনসিপি জোটও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে এই জোটকে কেবল ঝুঁকি ও সংকটের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাগুলো আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আজ বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘প্রথমআলোতে’ “জামায়াত-এনসিপি জোটের চ্যালেঞ্জগুলো কি” শিরোনামে একটা বিশ্লেষণমুলক লেখার কাউন্টারে আমি আমার বিশ্লেষণ এখানে তুলে ধরেছি। উক্ত লেখাটি বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষক যৌথভাবে লিখেছেন। বিস্তারিত দেখুন লিংকে https://www.prothomalo.com/opinion/column/enr0k98jvg
প্রথমত, এই জোটের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা নিহিত আছে ভোটের সমীকরণে নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্বীকার করার সাহসে। বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই কেবল আদর্শের প্রতিযোগিতা নয়; বরং সংগঠন, মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি, নিরাপত্তা এবং সমর্থকদের সুরক্ষার প্রশ্নে জোট রাজনীতি একটি বাস্তব প্রয়োজন। এনসিপি যদি এককভাবে নির্বাচন করে সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারে, তবে তাদের আদর্শিক উচ্চারণ কার্যত রাজনৈতিক প্রান্তিকতায় রূপ নিতে পারে। এই জোট এনসিপিকে সেই প্রান্তিকতা থেকে বের করে এনে কার্যকর রাজনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে রাখতে পারে বলে করি।
দ্বিতীয়ত, জামায়াতের জন্য এই জোট কেবল ভোট বাড়ানোর কৌশল নয়; এটি দীর্ঘদিনের একঘেয়ে রাজনৈতিক ইমেজ ভাঙার সুযোগও তৈরি করছে। তরুণদের প্রতিনিধিত্বকারী এনসিপির সঙ্গে জোট করে জামায়াত নিজেকে একটি একমাত্রিক ধর্মভিত্তিক দল থেকে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন ভাষ্য ও নতুন কাঠামো খুঁজছে। এনসিপির উপস্থিতি সেই ভাষ্যকে জোটের ভেতরে প্রবেশ করিয়েছে, যা জামায়াতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, এই জোটের মাধ্যমে ইসলামী ভোটব্যাংকের বিভাজন কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অতীতের বহু নির্বাচনে দেখা গেছে, ইসলামী দলগুলোর পৃথক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ পর্যন্ত বড় দলগুলোকেই সুবিধা দিয়েছে। জামায়াত–এনসিপি জোট সেই বিভাজন কমিয়ে একটি সম্মিলিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ তৈরি করছে, যা বিএনপির জন্যও একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। যদিও এখন পয্ন্ত ইসলামি শাসনতন্ত্রের সাথে জামায়াতে আসন নিয়ে চুড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত আসেনি; তবুও বিভিন্ন মারফতে প্রশ্ন উঠেছে যে আসন সমঝোতায় চুড়ান্ত হলে ওই দলটি কি আদৌ জামায়াত জোটে থাকবে? এর উত্তরে সহজে বলা যায়, ওই ইসলামি দলটি যদি জামায়াত জোট ত্যাগ করে, তবে আদতে জামায়াত-এনসিপি জোটই লাভবান হবে বলে মনে করি।
চতুর্থত, এনসিপির আদর্শিক অবস্থান পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এই ধারণাটিও একমাত্রিক। বাস্তবে এনসিপির সমর্থকদের একটি অংশ সংস্কার, স্বচ্ছতা ও বিকল্প রাজনীতির পক্ষে থাকলেও, তারা রাজনীতির কঠিন বাস্তবতাও অস্বীকার করে না। এই জোট এনসিপিকে সংসদের বাইরে আদর্শিক অবস্থানে আটকে না রেখে সংসদীয় রাজনীতির ভেতরে প্রভাব রাখার সম্ভাবনা তৈরি করছে। সংসদের ভেতরে অবস্থান করেই সংস্কারমূলক রাজনীতির চাপ তৈরি করা বাস্তবসম্মতভাবে বেশি কার্যকর।
পঞ্চমত, ভবিষ্যৎ রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও এই জোটকে একটি ‘সংক্রমণকালীন জোট’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ এটি কোনো স্থায়ী আদর্শিক মেলবন্ধন নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সময় ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গঠিত সমঝোতা। এই ধরনের জোট বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়, এবং অতীতেও বহু দল এ ধরনের জোটের মধ্য দিয়েই নিজেদের সংগঠন ও অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
সবশেষে বলা যায়, জামায়াত–এনসিপি জোটকে শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ বিরোধ, আদর্শিক দূরত্ব বা আসন ছাড়ার হিসাব দিয়ে বিচার করলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এই জোট একদিকে যেমন বাংলাদেশের বহুদলীয় রাজনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করছে, অন্যদিকে তেমনি নতুন ও পুরোনো রাজনৈতিক ধারার মধ্যে একটি সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করছে। এই সংলাপ সফল হবে কি না—তা নির্ভর করবে মাঠের রাজনীতি, জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় এবং নির্বাচনের ফলাফলের ওপর। তবে এটুকু স্পষ্ট, এই জোট বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যাকে উপেক্ষা করার সুযোগ কারও নেই।
সুমন মাহমুদ
লেখক ও টিভি উপস্থাপক, লন্ডন

পড়ুনঃ  শামিমা বেগমের মতো, আমারও বিনা নোটিশে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হতে পারে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here