Home ধর্ম ইসরা ও মি‘রাজঃ ভগ্নহৃদয়ের বন্ধুকে আল্লাহর আলিঙ্গন

ইসরা ও মি‘রাজঃ ভগ্নহৃদয়ের বন্ধুকে আল্লাহর আলিঙ্গন

91
0

মানব ইতিহাসে কিছু সময় আসে, যখন আকাশ নীরব হয়ে যায়, আর সেই নীরবতাই পৃথিবীর উপর সবচেয়ে ভারী হয়ে নামে। মুহাম্মদ ﷺ—এর নবুয়তের জীবনে ঠিক এমনই এক সময় নেমে এসেছিল। তায়েফের সেই পাথরগুলো তখনও যেন তাঁর শরীর ছেড়ে যায়নি। রক্ত শুকিয়ে গেলেও অপমানের জ্বালা শুকায়নি। প্রতিটি ক্ষত শুধু দেহে নয়;হৃদয়ের গভীর স্তরে দগদগে হয়ে ছিল।
মক্কা তখন আর তার পরিচিত শহর ছিল না। মক্কার ধুসর মাটির প্রতিটি বালিকনা যেন তার জন্য ক্রমেই সংকীর্ন হয়ে উঠছিল। যে অলিগলিতে একদিন তিনি “আল—আমিন” নামে পরিচিত ছিলেন, সেখানেই এখন তার শুনলে কণ্ঠস্বর থেমে যায়। যে মানুষটি “আস—সাদিক” নামে পরিচিত, সেই মানুষটির চোখে চোখ পড়লে কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়, কেউ বিদ্রূপ হাসি ছুঁড়ে দেয়, কেউ আবার নীরব শত্রুতায় তাকিয়ে থাকে। বাতাসে ভেসে বেড়াতো ষড়যন্ত্রের গন্ধ, কখনো হত্যা, কখনো বন্দিত্ব আর কখনো নির্বাসনের ফিসফিসানি। কাবার ছায়ায় দাঁড়ালেই নিরাপত্তা মিলতো না; বরং শত্রুতার হিং¯্রতা আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠতো।


নবী মুহাম্মদ ﷺ রাতগুলো ছিল আরও দীর্ঘ। আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল, মুহাম্মদ ﷺ— এর সম্পকীর্য় চাচী। সেই মহিলাই কতইনা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ক্ষত—বিক্ষত করে দিয়েছিল। সেই পাহাড় ঘেরা মক্কার আকাশ তখনও তারায় ভরা, কিন্তু সেই তারাগুলো যেন তার জন্য ভারী হয়ে নেমে আসতো। অন্যদিকে ঘরের ভেতরে আসলেই নেমে আসতো শোকের ছায়া, খাদিজা (রা.) আর চাচা আবু তালিবের স্মৃতি। কি করে এমন শোক আর যন্ত্রণা সহ্য করা যায়? দুইজনের একজন ছিলেন আশ্রয়, আরেকজন ছিলেন ঢাল। এখন দু’জনই নেই। ঘরটি এখন নিঃশব্দ, খাঁ খাঁ করে, যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই খাদিজার (রা) স্মৃতি। সেই নিঃশব্দতা যেন বুকের ভেতর প্রতিধ্বনি তোলে। নবী ﷺ তখন বেঁচে থেকেও একা, মানুষের মাঝে থেকেও একা। পাঁচটি এতিম মেয়ের লালন—পালন ও দেখভাল, তাদের কেহ আবার তালাকপ্রাপ্তা। সীরাত গ্রন্থে সেই সময়ের দৃশ্যগুলি একত্রিত করলে যে কোন পাষাণ হৃদয়ের কলিজাও বিদীর্ণ হয়ে চিৎকার করে। পাথরের হৃদয়ও কথা বলে।
আমাদের ভাষায় হয়তো তাঁর হৃদয় ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু সেই ভাঙনের ভেতরে তার অভিযোগ ছিল না। আকাশের দিকে তাকালে তাঁর চোখে প্রশ্ন নয়, ছিল আরজি,‘হে মাবুদ, দয়াময়, রহমানুর রহীম! কুরাইশদের বুঝার তৌফিক দাও।’ তিনি জানতেন, এই পথ একাকিত্বের, এই দাওয়াত অপমানের, এই সত্য বহনের মূল্য রক্ত দিয়ে দিতে হয়। তবুও তাঁর পা কাঁপেনি। ক্লান্তি ছিল, কিন্তু হতাশা ছিল না। কষ্ট ছিল, কিন্তু প্রতিশোধের বাসনা ছিল না।


দিনের বেলায় শহরের ভেতর শিশুরা তাঁকে দেখে পাথর ছোঁড়ার অনুকরণ করতো, বড়রা ঠাট্টা করতো, পথচারীরা ইচ্ছে করে কাঁটা ছড়িয়ে রাখতো। তবুও তিনি হেঁটেছেন সেই পথেই। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ভারী, কিন্তু দৃঢ়। যেন প্রতিটি কদম বলছিল ‘আমি থামবো না।’
এই ছিল মক্কার সেই সময়, যখন সত্য সবচেয়ে নিঃসঙ্গ, আর মিথ্যা সবচেয়ে সংগঠিত। যখন একজন মানুষের কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে ছিল একটি উম্মাহর ভবিষ্যৎ আর এক নতুন মানবসভ্যতার পত্তন। বাইরে ছিল ভয়াবহ অন্ধকার, কিন্তু সেই অন্ধকারের মাঝেই প্রস্তুত হচ্ছিল এক ভোর। কারণ এই মানুষটি জানতেন, নীরব আকাশের আড়ালেই আল্লাহর সিদ্ধান্ত এক অদ্ভূত মহিমায় কাজ করে যাচ্ছে।
এই অধ্যায় কেবল দুঃখের নয়; এটি ধৈর্যের, অবিচলতার, আর নিঃশব্দ বিশ্বাসের। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক রাতগুলোর পরেই আসে সবচেয়ে উজ্জ্বল সকাল। এই সময়েই আসে ‘মে’রাজ’। ‘মে’রাজ’ কেবল একটি অলৌকিক ভ্রমণ নয়। এটি ছিল ভগ্নহৃদয়ের একজন প্রিয় বান্দাকে তাঁর রবের পক্ষ থেকে সরাসরি ডেকে নেওয়া, একটি অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎ, যেখানে ভাষার চেয়ে অনুভূতি প্রবল, নির্দেশনার চেয়ে সান্ত্বনা গভীর।

পড়ুনঃ  মুসলিমরা পিছিয়ে থাকার কারণ


যে রাসূল ﷺ বছরের পর বছর মানুষের কাছে আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে নির্যাতন সহ্য করেছেন, তাঁকে এবার আল্লাহ নিজেই নিজের নৈকট্যে তুলে নিলেন। যেন বললেন, “হে আমার বন্ধু, তুমি একা নও। তুমি যা বলছ, যা বহন করে চলেছ তার সবই আমি জানি।” এই ছিল মে’রাজের তাৎপর্য। [ এই মহৎ ঘটনাটি — রাতের যাত্রা (ইসরা) ও পরবর্তীতে আকাশে আরোহন (মি’রাজ) — নবী করিম ﷺ —এর অন্যতম বড় অলৌকিক নিদর্শন, কুরআনের পর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ আশ্চর্য। তিনি বর্ণনা দেন, “আমার সামনে এল ‘বুরাক’ নামে একটি উঁচু, সাদা রঙের প্রাণী, যা গাধার চেয়ে বড় কিন্তু খচ্চরের চেয়ে ছোট। তার পা এত দ্রুত যে, সে যত দূর তাকাত, চোখের পলকে সেই দূরতম সীমায় পৌঁছে দিতে পারত। আমি বুরাকের পিঠে আরোহন করলাম এবং পৌঁছে গেলাম পবিত্র স্থান (বাইতুল মাকদিস)-এ। সেখানে বুরাককে সেই জায়গায় বেঁধে রাখলাম, যেখানে পূর্ববর্তী নবীরা তাদের বাহনকে বেঁধেছিলেন। এরপর আমি মসজিদে প্রবেশ করে সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলাম। নবী মুহাম্মদ ﷺ যখন বুরাক এর উপর চড়ে যাত্রা মক্কা হতে যাত্রা করছিলেন, তখন জিবরায়েল (আ.) বললেন, “নেমে পড়ো এবং নামাজ পড়ো।” তিনি নামলেন এবং নামাজ পড়লেন। নামাজ পড়ার পর জিবরায়েল বললেন, “তুমি কোথায় নামাজ পড়েছো জানো? তুমি তায়বা (মদিনা) তে নামাজ পড়েছো, যেখানে হিজরতের আয়োজন হবে।” তারপর আবার বললেন, “নেমে পড়ো এবং নামাজ পড়ো।” তিনি নামাজ পড়ার পর জিবরায়েল বললেন, “তুমি কোথায় নামাজ পড়েছো জানো? তুমি সীনা পর্বতে নামাজ পড়েছো, যেখানে আল্লাহ তায়ালা মুসা (আ.) এর সাথে কথা বলেছেন।” তারপর আবার বললেন, “নেমে নামাজ পড়ো এবং নামাজ পড়ো।” নামাজ শেষে জিবরায়েল বললেন, “তুমি কোথায় নামাজ পড়েছো জানো? তুমি ‘বেইত লাহমে’ নামাজ পড়েছো, যেখানে ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেছেন।” তারপর তিনি পবিত্র বাইতুল মাকদাস প্রবেশ করলেন, সেখানে সকল নবী একসাথে ছিলেন। জিবরায়েল তাঁকে সামনে নিয়ে গেলেন এবং তিনি সকল নবীদের সামনে নেতৃত্ব দিয়ে নামাজ পড়ালেন। উপরোক্ত সকল বর্ণনা বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য হাদীস দ্বারা প্রমানিত]


মে’রাজে রাসূল ﷺ—কে শুধু আকাশের সীমানা পার করানো হয়নি, বরং তাঁকে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দাঁড় করানো হয়। বাইতুল মাকদাসে পূর্বতন নবীদের ইমাম বানিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়, এই আন্দোলন নতুন নয়, এই পথের পথিক তুমি একা নও। আদম, ইবরাহীম, ইসমাইল, মূসা, ঈসা, দাউদ—সবাই এই সত্যের কাফেলায় তোমার পূর্বসূরি।
এরপর ঊর্ধ্বজগৎ। যেখানে দৃশ্য নয়, সত্য কথা বলে। যেখানে শব্দ নয়, নৈকট্য কথা বলে। সেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কিছু দেখানো হলো, যা কেবল একজন বিশ্বনেতার চোখেই দেখা প্রয়োজন, যাতে তিনি বুঝতে পারেন, যেসব সত্য তিনি মানুষকে বোঝাতে গিয়ে আঘাত পাচ্ছেন, সেগুলো কল্পনা নয়; চূড়ান্ত বাস্তবতা।

পড়ুনঃ  মানুষের জ্ঞানের সীমানা ছাড়িয়ে এক মহাপুরুষের অন্তর্দৃষ্টি


পূর্বতন নবীদেরও মে’রাজ ছিল, কিন্তু তা ছিল আংশিক। ইবরাহীম (আ.) আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্ব দেখেছিলেন। মূসা (আ.) তূর পাহাড়ে আল্লাহর সাথে কথা বলেছিলেন। কিন্তু মুহাম্মদ ﷺ—এর মে’রাজ ছিল পূর্ণাঙ্গ দর্শন, দায়িত্ব, দিকনির্দেশনা ও সান্ত্বনা, সব একসাথে।
এই ঘনিষ্ঠ সাক্ষাতের ফলেই নাযিল হয় ‘সূরা বনী ইসরাইল’। এই সূরার প্রতিটি আয়াতে মে’রাজের প্রেরণায় ধ্বনিত। সেখানে ইতিহাসের আয়নায় দেখিয়ে দেওয়া হলো যে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো গোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত জবাবদিহির মুখোমুখি হবেই। আবার এটাও শেখানো হলো যেদিন ক্ষমতা আসবে, সেদিন যেন বিজয়ী হয়েও ‘বনী ইসরাইলের’ মতো আত্মভোলা না হওয়া হয়।
গুরুত্বপূর্ণ এই সূরায় আগাম জানিয়ে দেওয়া হলো ‘হিজরতে’র কথা। বলা হলো, মক্কা আর আশ্রয় দেবে না। কিন্তু সেই বিদায়ই হবে নতুন ইতিহাসের সূচনা। এজন্যই শেখানো হলো সেই দোয়া, যেখানে শুধু নিরাপত্তা নয় শাসনক্ষমতার প্রার্থনাও অন্তর্ভুক্ত। যেন আল্লাহ নিজেই বলে দিলেন—“এরপরের অধ্যায় হবে নেতৃত্বের অধ্যায়।” [সূরা বনী ইসরাইল—এর যে আয়াতগুলোতে ক্ষমতা, হিজরত ও নেতৃত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সেগুলোর শুধু আয়াত নম্বর নিচে দেওয়া হলো—ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ফিরে আসা / দেওয়া হওয়ার ইঙ্গিত: (১৭:৬) হিজরতের স্পষ্ট দিকনির্দেশ ও মক্কা থেকে প্রস্থান—সংকেত: (১৭:৭৬—৭৭) হিজরতের দোয়া (নিরাপত্তা ও শাসনক্ষমতার প্রার্থনা—“সুলতান নাসীরা”): (১৭:৮০) নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও সত্যের প্রতিষ্ঠার অধ্যায়ের সূচনা—সংকেত: (১৭:৮১) এই আয়াতগুলো মিলিয়েই সূরা বনী ইসরাইল নবুয়তের এক সংকটকালীন অধ্যায় থেকে হিজরত ও নেতৃত্বের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের ইশারা বহন করে।]


এই ওহী বুকে ধারণ করে যখন রাসূল ﷺ ভবিষ্যতের দিকে তাকাতেন, তখন মক্কার অন্ধকারের ভেতর দিয়েও তিনি প্রভাতের আলো দেখতে পেলেন। একজন বস্তুবাদী নেতা হলে হয়তো হতাশ হয়ে থেমে যেত। কিন্তু তিনি জানতেন এই অন্ধকার শেষ হবে। সূর্য উঠবে। আর সেই সূর্য মদিনার আকাশেই উদিত হবে।
তায়েফ কাছে থেকেও দূরে সরে গিয়েছিল। ইয়াসরিব দূরে থেকেও কাছে এসে গিয়েছিল। তায়েফ বলেছিল—“আমি অযোগ্য।” আর ইয়াসরিব বলেছিল—“আমি প্রস্তুত।” এই প্রস্তুতিরই নাম পরে হলো ‘মদিনাতুন নবী’।
মে’রাজ তাই শুধু আকাশে ওঠা নয়। এটি ছিল ভগ্নহৃদয়ের প্রিয় বন্ধুকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বুকে টেনে নেওয়া। এটি ছিল একান্ত আলাপ, যেখানে কোনো অভিযোগ নেই—শুধু বোঝাপড়া। কোনো হতাশা নেই, শুধু দিকনির্দেশনা।
মে’রাজ প্রমাণ করেÑ আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে শুধু নির্দেশ দেন না, তিনি তাকে সান্ত্বনাও দেন। তিনি শুধু রাসূল নন—তিনি বন্ধুও।

ধনুকের দূরত্বে বন্ধুত্ব
মি’রাজের সেই মুহূর্তটি কোনো ভ্রমণের বর্ণনা নয়, এটি ছিল সম্পর্কের চূড়ান্ত প্রকাশ। আকাশের স্তর পেরিয়ে, নূরের সীমা ছুঁয়ে, যখন সৃষ্টি আর শ্রষ্ঠার মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন মুহাম্মদ ﷺ—ঠিক সেখানেই থেমে গেল জিব্রাইল (আ.)। যিনি হাজার হাজার বছর আল্লাহর নিকটতম ফেরেশতা, তিনিও আর এক কদম এগোতে পারলেন না। তিনি বলেছিলেন, ‘আর এক ধাপ এগোলেই আমি জ্বলে যাব’। [তাফসীর ইবন কাসীর—সূরা আন—নাজম (৫৩:১৩—১৮)—এর ব্যাখ্যায় ইবন কাসীর (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেন— সিদরাতুল মুনতাহা এমন এক সীমা, যেখানে সৃষ্টিজগতের জ্ঞান ও সামর্থ্য শেষ হয়ে যায়; এর পর যা আছে, তা কেবল রাসূলুল্লাহ ﷺ —এর জন্যই বিশেষ।]
আর সামনে রইলেন শুধু দুই সত্তা—আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় বান্দা ও বন্ধু। কোনো শব্দের ভিড় নেই, কোনো সাক্ষীর উপস্থিতি নেই, কোনো পর্দার আড়াল নেই। নীরবতা ছিল, কিন্তু সেই নীরবতা ভারী নয় আশ্রয়ের। যেন একান্তে বসে আছেন দুই বন্ধু যেখানে ভাষার দরকার নেই, যেখানে বোঝাপড়া শব্দ ছাড়িয়ে যায়।
এটি ছিল সান্তনার মুহূর্ত। তায়েফের রক্ত, মক্কার অবহেলা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, এসব সবকিছু নিয়ে এক বান্দাকে ডেকে নেওয়া হয়েছে ঊর্ধ্বাকাশে। যেন বলা হচ্ছে তুমি একা নও। পৃথিবী তোমাকে বোঝেনি, কিন্তু আমি তোমাকে চিনি। এই ডেকে নেওয়া কোনো কর্তৃত্বের প্রদর্শন নয়; এটি বন্ধুত্বের সর্বোচ্চ রূপ। কত বড় বন্ধু হলে, কত গভীর ভালোবাসা হলে, সৃষ্টিকে ছাড়িয়ে বান্দাকে ডেকে নেওয়া হয়! [কুরআন এই দৃশ্যকে খুব অল্প শব্দে, কিন্তু অসীম গভীরতায় তুলে ধরেছে— “অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন ও আরও কাছে এলেন। তখন দূরত্ব রইল ধনুকের দুই প্রান্তের মতো বা তার চেয়েও কম। তারপর তিনি তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহি করার, তা ওহি করলেন।” আর সেই চূড়ান্ত সীমা—যেখানে জিব্রাইলও থেমে যান ] এই আয়াতগুলো কোনো দৃশ্য আঁকে না এগুলো অনুভূতি তৈরি করে। এখানে আল্লাহ মুহাম্মদ ﷺ—কে ‘নবী’ বলে সম্বোধন করেননি, ‘রাসুল’ বলেননি—বলেছেন ‘আবদিহি’ (عَبْدِهِ)। [পবিত্র কুরআনে ‘আবদিহি’ শব্দটি বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। আরবি ‘আবদ’ অর্থ বান্দা বা দাস, আর ‘আবদিহি’ অর্থ “তাঁর বান্দা”Ñঅর্থাৎ আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত এক অনন্য পরিচয়। কুরআনে আল্লাহ যখন কোনো নবী বা নির্বাচিত ব্যক্তিকে ‘আবদিহি’ বলে উল্লেখ করেন, তখন তা খাটো নয়; বরং সর্বোচ্চ সম্মান ও নৈকট্যের ঘোষণা। কারণ ইসলামি দর্শনে প্রকৃত মর্যাদা আসে আল্লাহর পরিপূর্ণ দাসত্বের মধ্য দিয়ে। সবচেয়ে প্রসিদ্ধভাবে এই শব্দটি এসেছে রাসুলুল্লাহ ﷺ —এর ক্ষেত্রে, বিশেষ করে মিরাজের মতো সর্বোচ্চ সম্মানের ঘটনায় “পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে (আবদিহি) রাত্রিতে ভ্রমণ করিয়েছেনৃ” (সূরা আল—ইসরা: ১) এতে বোঝানো হয়েছে, নবুয়তের সর্বোচ্চ শিখরও দাসত্বের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত। এছাড়া কুরআনে ‘আবদিহি’ শব্দটি আরও কয়েকটি স্থানে এসেছে—যেখানে আল্লাহ তাঁর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দাদের (বিশেষত নবীগণকে) বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করেছেন, যেমন হযরত দাউদ (আ.), হযরত আইয়ুব (আ.) প্রমুখের ক্ষেত্রে ‘আবদ’ শব্দের বিভিন্ন রূপ পাওয়া যায়। তবে রাসুলুল্লাহ ﷺ —এর ক্ষেত্রে ‘আবদিহি’ শব্দটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবহৃত। এই শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে কুরআন একটি মৌলিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করে— মানুষ যত বড়ই হোক, আল্লাহর কাছে তার সর্বোচ্চ পরিচয় হলো বান্দা হওয়া। আর এই বান্দা পরিচয়ই প্রকৃত স্বাধীনতা, প্রকৃত সম্মান ও প্রকৃত সাফল্যের নাম।] বন্ধুত্বের চূড়ান্ত সম্মান এখানেই।

পড়ুনঃ  ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : দুঃসময়ে সন্তান প্রতিপালনে করণীয়?

সুমন মাহমুদ
লেখক ও টিভি উপস্থাপক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here