বাংলাদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিয়ে কথা বললে সাধারণত দুটি অবস্থান দেখা যায়। একদল বলেন, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গণমাধ্যম টিকে আছে; আরেকদল বলেন, স্বাধীনতার জায়গা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। কিন্তু ঢাকা–১৭ আসনের একটি নির্বাচনী প্রচারণাকে ঘিরে ৫৯ জন সাংবাদিকের সমন্বয়ে গঠিত দলীয় মিডিয়া কমিটির খবর প্রকাশের পর এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
নির্বাচন উপলক্ষে রাজনৈতিক দলগুলো সাংগঠনিক প্রস্তুতি নেবে, এটাই স্বাভাবিক। তারা প্রচারণা কমিটি করবে, স্বেচ্ছাসেবক নামাবে, বার্তা ঠিক করবে। প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হলো, সেই কাঠামোর ভেতরে কর্মরত সাংবাদিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সাংবাদিকতার পেশাগত নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাংবাদিকতার মূল শক্তি তার অবস্থানে, ক্ষমতার বাইরে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাকে পর্যবেক্ষণ করার সক্ষমতায়। কিন্তু যখন একজন সাংবাদিক সরাসরি কোনো প্রার্থীভিত্তিক মিডিয়া কমিটির সদস্য হন, তখন সেই অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই বদলে যায়। তিনি আর কেবল পর্যবেক্ষক নন; হয়ে ওঠেন অংশগ্রহণকারী। এতে স্বার্থসংঘাতের প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এই ঘটনাকে ঘিরে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। তালিকায় জাতীয় টেলিভিশন, বার্তা সংস্থা ও প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের নাম রয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি প্রান্তিক কোনো চর্চা নয়; এটি মূলধারার গণমাধ্যম ব্যবস্থার ভেতরেই ঘটছে। ফলে সাধারণ পাঠক বা দর্শকের পক্ষে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়, এই সাংবাদিকরা যখন নিজ নিজ মাধ্যমে নির্বাচন বা সংশ্লিষ্ট রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদন করবেন, তখন তা কতটা নিরপেক্ষ বলে বিবেচিত হবে?
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কমিটি গঠনের শুরুতেই আস্থার সংকট ও তথ্য পাচারের অভিযোগ ওঠার খবর। এতে বোঝা যায়, সাংবাদিকতার নামে যে কাঠামো দাঁড়িয়েছে, সেটি নিজেই স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছে না।
এখানে ব্যক্তির ভূমিকা নয়, কাঠামোর সমস্যাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মতাদর্শ আর সংগঠিত রাজনৈতিক প্রচারণার মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা থাকা প্রয়োজন। সেই সীমারেখা ভেঙে গেলে সাংবাদিকতা আর জনস্বার্থের প্রতিনিধি থাকে না; হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি উপাদান।
স্বাধীন সাংবাদিকতা মানে কেবল রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ না থাকা নয়। স্বাধীনতা মানে নৈতিক দূরত্ব বজায় রাখা, স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং পাঠক–দর্শকের আস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এই মৌলিক প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করে যদি আমরা বারবার স্বাধীন সাংবাদিকতার দাবি করি, তবে তা কেবল আত্মতুষ্টির ভাষ্য হয়েই থেকে যাবে।
এই ঘটনা হয়তো সাময়িক আলোচনার জন্ম দেবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাবে, আমরা কি সত্যিই সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা করতে চাই, নাকি স্বাধীনতার কথা বলেই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চাই?



