ঢাকা, ৪ জানুয়ারি ২০২৬ — আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্থিরতা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১৬২টি নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে কমপক্ষে ৯৭০ জন আহত এবং ৫ জন নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS) ১৫টি জাতীয় দৈনিক, ১৫০টির বেশি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং জেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিদের তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলীয় ও অন্তর্কোন্দল, প্রার্থী বাছাই নিয়ে বিরোধ, প্রচার-প্রচারণা ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা সহিংসতাকে উসকে দিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মিছিল ও সড়ক অবরোধের ঘটনা জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা ও লুটপাটের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ সময়ে অন্তত ২০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং ৫০টির বেশি স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৪০টি ঘটনায় অন্তত ৩৩৪ জন আহত এবং ৩ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ৫০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫৬০ জন এবং নিহত হয়েছেন ১ জন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষের ২টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ জন। বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষের ৮টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৯ জন এবং বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষের ৮টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩২ জন। অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষের আরও কয়েকটি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩ জন। নিহত পাঁচজনের মধ্যে বিএনপির তিনজন, জামায়াতের একজন এবং ইনকিলাব মঞ্চের একজন রয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি (৩২)। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পুরানা পল্টনে মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়, যেখানে ১৮ ডিসেম্বর রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী অফিস উদ্বোধনকালে ছুরিকাঘাতে নিহত হন মো. নজরুল ইসলাম (৪৬)। ১৭ জানুয়ারি কালিরহাটে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে পিটুনিতে নিহত হন মিজানুর রহমান ওরফে রনি (৩৫)। ২৮ জানুয়ারি শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে আহত হয়ে পরে মারা যান মাওলানা রেজাউল করিম। ৩০ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ওয়ার্ড পর্যায়ের দলীয় বিরোধের জেরে মারধরের শিকার হয়ে নিহত হন আজাহার হোসেন (৪৭)।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে নারীদের ওপর রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়টি গুরুতর উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত অন্তত ১২টি ঘটনায় ১৮ জন নারী হেনস্তার শিকার এবং ৬ জন আহত হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে অধিকাংশই জামায়াত সমর্থক নারী। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ঘটনার বেশিরভাগেই বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় নারী জামায়াত কর্মীদের হিজাব খুলতে বাধ্য করার চেষ্টা, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় নারী কর্মীদের ওপর হামলা, টাঙ্গাইলের গোপালপুরে পর্দানশীন নারীর ওপর শারীরিক নির্যাতন, যশোরের ঝিকরগাছায় নারী কর্মীদের মারধর ও মোবাইল ছিনতাই, ঢাকার মিরপুরের পীরেরবাগে নারী কর্মীদের দীর্ঘ সময় আটক ও হেনস্তা, কেরানীগঞ্জে নারীদের ওড়না ছিঁড়ে লাঞ্ছনা, লক্ষ্মীপুর, নাটোর, পাবনা, মেহেরপুর ও ভোলায় নারী কর্মীদের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২৬ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের গোপালপুরে জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের ওপর হামলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, যেখানে স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের হামলা ও গালিগালাজের অভিযোগ উঠে আসে। ২৮ জানুয়ারি ভোলার চরফ্যাশনে ইসলামী আন্দোলনের নারী কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে, এবং একই দিনে ঢাকার কদমতলীর কাইল্লা পট্টি এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর নারী নেত্রী কাজী মারিয়া ইসলাম বেরি গুরুতর আহত হন।
এ ছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর থেকে অন্তত ২৫টি ঘটনায় ৩৪ জন ভোটারকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি ঘটনায় বিএনপি, ১টি ঘটনায় জামায়াত এবং ৯টি ঘটনায় অন্যান্য দল ও প্রার্থীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অন্তত ১৩টি ঘটনায় ১৩ জন প্রার্থী হেনস্তা ও হামলার শিকার হয়েছেন।
এইচআরএসএস মনে করে, ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করছে, গণতান্ত্রিক পরিবেশকে দুর্বল করছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির পরিপন্থী। সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, সহিংসতা, আইনি জটিলতা, প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ অব্যাহত থাকলে সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি।





