আজ বাংলাদেশে নির্বাচন। অনেক দিন পর একটি উৎসবমুখর পরিবেশ দেখছি। জাতির উপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা ফ্যাসিবাদ আর নেই। এখানে এখন প্রাণ আর বাধভাঙা উচ্ছাস। মানুষ নিরাপদ পরিবেশে ভোট দেবে। যোগ্যতম প্রাথীকেই দেবে তাদের মুল্যবান ভোট। অনেক যত্ন করে রাখা ভোট এবার তারা বৃথা দিতে দেবে না, সঠিকভাবে দিতে পারবে আশা করছেন অনেকে। বিগত তিনটি নির্বাচন ভোটারবিহীন ছিলো। রাতেও ভোট পড়েছে ব্যালট বাক্সে। এবার আর সে সুযোগ নেই। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় ঢাকা চারদিক।
প্রায় সাড়ে চার লাখ তরুণ ভোটার তৈরি হয়ে আছে। আছে প্রায় অর্ধেক নারী ভোটার। তারা ভোট দেবে ভেবেচিন্তে। তাদের ভোট যাবে ন্যায়ের পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে, ২৪ এর পক্ষে, মানুষের আশা আকাঙক্ষার পক্ষে, নতুন বাংলাদেশের পক্ষে, আজাদীর পক্ষে, শান্তির বাংলাদেশের পক্ষে। উভয় দলই এ রকম আশা করছে: বিএনপি না জামায়াত! এ দোলায় দুলছে বাংলাদেশ। আওয়ামীলীগ নেই কিন্তু আওয়ামীলীগ আছে, আছে তাদের ভোট ব্যাংক। এটাও একটা বড় ফ্যাক্টর।
৭০ এর নির্বাচন মনে নেই। তবে সবাই নৌকায় ভোট দিয়েছিলেন জানি। ৭১ সালে বয়স মাত্র ৪ বছর। সংগ্রামের কথা আবছা আবছা স্মরণ করতে পারি। আমাদের রানীগঞ্জ বাজারে হানাদাররা চালালো গণহত্যা। আমার বাবা শহীদ আকলু মিয়া সহ শতাধিক মানুষকে হায়েনারা ব্রাশ ফায়ারে মেরে ফেললো। তারপর পেলাম একটি স্বাধীন দেশ। ৭৩ এর প্রথম নির্বাচন, ৭৫ এর পটপরিবর্তন, প্রথম হা না ভোট হলো ৭৭ এ, পরে ৭৯ এর নির্বাচন। ৮১ সালে সৈরশ্বাসন। ৮৬, ৮৮ এর নির্বাচন হয় বিতর্কিত নানা কারণে। তারপর ৯০ এর গণআন্দোলন, ৯১ এর নির্বাচন। বাড়িতে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়েছি বলে মনে পড়ছেনা। প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের নির্বাচনে সিলেট শহরে ছিলাম যদ্দূর মনে পড়ে। বিএনপি জামায়াত সরকার গঠন করলো। তারপর আর দেশে নেই।
আমাদের বাড়ীতে সব সময় নির্বাচনে সরগরম থাকতো। স্থানীয় সরকার হোক আর জাতীয় নির্বাচন হোক। ছোটবেলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, মোজাফফর নেপের গুলজার আহমদ এর পক্ষে অনেক ভোট চেয়েছি, মাইকিং করেছি। ড. কামাল হোসেন, জেনারেল ওসমানী তাদের জন্যও খেটেছি। তখনও ভোটার হয়নি। স্কুলে যাই। নৌকা, ধানের শীষ, মই, কুড়েঘর। এক সময় লাঙ্গলের জোয়ারও ছিলো। আর এখন দেখছি দাড়িপাল্লার বেসামাল জোয়ার। তারা নাকি পরিবর্তনের কথা বলছে। ধানের শীষ মার্কা দেখে অনেকেই ভোট দেবেন। তারা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আদর্শকে ভালোবাসেন। তারেক রহমান সতেরো বছর পর মাঠে ময়দানে সরগরম। অন্যদিকে ডা শফিকুর রহমান জামায়াতের ইমেজ ও ব্র্যান্ডিং নিয়ে চষে বেড়ান দেশ বিদেশ।
আমাদের রানীগঞ্জে, এক সময়ের ভাটি বাংলার অন্যতম নৌবন্দরে সামাদ আজাদ, ওসমানী, সেন বাবু (সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত), বরুণ রায়, হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী, অগ্নিকন্যা বেগম মতিয়া চৌধুরী সহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ সফর করেছেন। ছোটবেলায় এ সকল পার্টি নিয়ে বাজারে ভালোমন্দ মুখরোচক আলোচনা মন দিয়ে শুনতাম। কিশোর মনে ভাবনা জাগতো।
আমাদের বড় চাচা বিশিষ্ট গীতিকার সুরকার ডা মো আলমাছ মিয়া এক সময় নেপ করতেন। মরহুম সৈয়দ আব্দুল হান্নান সাহেবের শিষ্য ছিলেন। তাই অনেক রাজনৈতিক আলোচনা আমাদের বাড়ীতে হতো। নেতারা আসতেন। মিটিং সমাবেশ হতো। ডান বাম ইসলামিক সবই ছিলো। ছিলো বাউলদেরও আনাগোনা। কারণ বড় চাচা একজন বাউল সাধকও বটে। মালজোড়া গান, পালা গান, আসত বসতো প্রায়ই। যাক নিয়ে অন্য সময়ে লিখব।
আজকের এই নির্বাচন নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। সারা বিশ্ব যেনো অধীর আগ্রহে বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশীরা ভোট দিতে পেরেছেন। এককোটি প্রবাসী দেশের প্রতি, রাজনীতির প্রতি অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। রাজনৈতিক দলের থিংকট্যাংক হিসেবে কেউ কেউ নীতিনির্ধারকদের উপদেশ দিচ্ছেন, কিংবা সরাসরি মাঠে নেমেছেন, প্রার্থী হয়ে লড়াইও করছেন।
ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া এবার যতটা তৎপর, যত ইন্টারভিউ ও নিউজ করছে বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর, এ রকম স্বাধীনতার পর আর কখনো হয়নি যদ্দূর জানি। সবার আগ্রহ আছে দেখতে বাংলাদেশ বদলে যাবে। বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাড়াবে।
তরুণরাই দেশ গড়বে। যেভাবে তারা ফেসিবাদকে বিদায় করেছে সেভাবেই তারা সকল অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে, শান্তি ও কল্যাণের পক্ষে দৃঢ় থাকবে। তাদের হাতেই আছে আগামীর চাবিকাঠি। প্রচলিত ধারার বিপরীতে একটি নতুন ধারার বাংলাদেশ সবাই দেখতে চায়।
এক্সিট পোল কী বলে, জানতে পারবেন? বৃটেনে ভোট হবার পর এক্সিট পোল মোটামুটি একটি রেজাল্ট বলে দেয় যা আসল ফলাফলের ধারেকাছে থাকে। টেলিভিশনে মিডিয়ায় নীল লাল হলুদ রঙের খেলা চলে। গ্রাফিক্সে দেখা যায় কোন দল কোন আসনে জয়ী। রেজাল্ট গুনতেও তারা প্রতিদ্বন্ধিতা করে। প্রায়ই দেখা যায় সান্ডারল্যান্ড জিতে যায়। ভোট হয় বৃহস্পতিবারে সকাল সাত টা থেকে রাট দশটা পর্যন্ত বিরতিহীন। এদিন ছুটির দিন নয়। মানুষ কাজে যাবার আগেও ভোট দিতে পারে আবার পরেও দিতে পারে। পোস্টাল ভোট তো আছেই। কোন হইহুল্লোড় নেই, চরিত্র হনন নেই, হামলা নেই তবে ডিম্ পড়তে পারে! নেই কোন বাক্স ছিনতাই কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। প্রশাসন নিরপেক্ষ। অপরদিকে বাংলাদেশের কথা চিন্তা করুন। এখানে রঙের খেলা নেই। পার্টির নাম দিয়েই চেনা।
আজ চলছে পুরো বাংলাদেশে উৎসব। কয়েকদিন নাকি প্রবাসীরা বিকাশে নগদে কোন টাকা পাঠাতে পারবেন না। অফিস আদালত বন্ধ, পুরো দেশ যেনো শাট ডাউন। এটা কেনো! মানুষের জানমালের ভয় নেই, উপচেপরা বাসে ট্রেনে ঘরে ফিরছে মানুষ ভোট দিতে। পাগলপারা আদমসন্তান!
বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হোক, দেশে আসুক একটি নির্বাচিত সরকার। যারা জিততে পারবেন না তারা বিজয়ীদের অভিনন্দন জানান, আর বিজয়ীরাও যারা তাদের ভোট দিয়েছেন আর যারা দেননি সবার জন্য এককথায় দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করুন এই প্রত্যাশা করি। আর তা যদি না হয়, যদি মানুষ তাদের অধিকার ফিরে না পায়! তাহলে অনেকের আশঙ্কা এ সুযোগ আসতে আরো কত রক্ত ঝরাতে হবে!
একটি বৈষম্যহীন ন্যায়ভিত্তিক মায়া মমতা আর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ একটি নতুন বাংলাদেশের সূর্য উঠুক, আলোয় ভরে উঠুক সারা বাংলাদেশ এই কামনা করি। তবে এই কামনার সাথে বাংলাদেশের বন্ধু কল্যাণকামী দেশগুলোর চাওয়া যদি এক হয়ে যায় তাহলে তা হবে সোনায় সোহাগা!
তাহলে কে জিতবে? জিতবে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের আঠারো কোটি মানুষ। পরাজিত হবে ফ্যাসিবাদ চিরতরে। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
হে প্রভু! আমাদের ন্যায়পরায়ণ শাসক দাও! যারা জনগণের সেবক হবে। মানুষকে দেবে মানুষের মর্যাদা।
আকবর হোসেন
টুইকেনহাম
ওয়েস্ট লন্ডন
১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬





