Home বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মৃত্যুর পর আসলে কী ঘটে? রহস্য উন্মোচন করলেন বিজ্ঞানীরা

মৃত্যুর পর আসলে কী ঘটে? রহস্য উন্মোচন করলেন বিজ্ঞানীরা

68
0

বিজ্ঞান ডেস্ক: মৃত্যু মানুষের জীবনের এমন এক অমোঘ সত্য যা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। মৃত্যুর ঠিক পরের মুহূর্তগুলোতে মানুষের শরীরে এবং মস্তিষ্কে আসলে কী ঘটে তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে গবেষণা চালিয়ে আসছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি একদল আন্তর্জাতিক গবেষক এই রহস্যের ওপর নতুন আলোকপাত করেছেন যা প্রচলিত অনেক ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর দেখেছেন যে হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার পরও মানুষের মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয় না। বরং কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে এবং পরবর্তী কয়েক মিনিটে মস্তিষ্কের গামা তরঙ্গ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই বিশেষ তরঙ্গগুলো সাধারণত মানুষের গভীর চিন্তা, স্মৃতিচারণ এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সাথে যুক্ত থাকে। এই বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণটি ইঙ্গিত দেয় যে মানুষ সম্ভবত মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিগুলো এক পলকে দেখে নেয়, যাকে অনেকেই ‘লাইফ রিভিউ’ বলে অভিহিত করেন। গবেষকদের মতে ক্লিনিক্যালি মৃত ঘোষণার পরও মস্তিষ্কের সচেতনতা বেশ কিছুক্ষণ বজায় থাকতে পারে যা এক বিস্ময়কর আবিষ্কার।

শারীরিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে হৃদপিণ্ড বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই শরীরের সব কোষ মারা যায় না বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া যা সম্পন্ন হতে বেশ কিছুটা সময় লাগে। আরও আশ্চর্যজনক তথ্য হলো মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা এমনকি কয়েক দিন পর পর্যন্ত শরীরের নির্দিষ্ট কিছু জিন সক্রিয় হয়ে ওঠে যেগুলোকে বিজ্ঞানীরা ‘জম্বি জিন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এছাড়া কিছু পদার্থবিজ্ঞানী মনে করেন যে মানুষের চেতনা কেবল মস্তিষ্কের রাসায়নিক বিক্রিয়া নয় বরং এটি কোয়ান্টাম স্তরের একটি প্রক্রিয়া যা শরীরের বিনাশের পরেও মহাবিশ্বের মৌলিক তথ্যের স্তরে টিকে থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে এই নতুন গবেষণাগুলো কেবল মৃত্যুর রহস্য ভেদ করতেই সাহায্য করবে না বরং ভবিষ্যতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

পড়ুনঃ  জেমস ওয়েব: অন্ধকারের অবসানের সন্ধানে ১০ বিলিয়ন ডলারের মেশিন

জম্বি জিন এবং কোয়ান্টাম চেতনার এই ধারণাগুলো বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন শিহরণ জাগিয়েছে যা আমাদের মৃত্যুর প্রথাগত সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে। প্রথমত জম্বি জিনের কথা বলতে গেলে এটি কোনো ভৌতিক বিষয় নয় বরং আমাদের শরীরের এক অদ্ভুত জৈবিক লড়াই। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন যে মৃত্যুর পর যখন হৃদপিণ্ড এবং ফুসফুস কাজ করা বন্ধ করে দেয় তখন শরীরের বেশিরভাগ জিন নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলেও কিছু নির্দিষ্ট জিন হঠাৎ করেই প্রচণ্ড সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের গ্লিয়াল কোষে এই জিনগুলো মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পর পর্যন্ত তাদের ডালপালা বিস্তার করতে থাকে যেন তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার এক আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। এই আবিষ্কারটি ফরেনসিক বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর মাধ্যমে মৃত্যুর সঠিক সময় এবং কারণ আরও নিখুঁতভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে।

কোয়ান্টাম চেতনা (Quantum Consciousness) হলো বিজ্ঞান ও দর্শনের একটি অত্যন্ত জটিল এবং রোমাঞ্চকর ক্ষেত্র যা আমাদের মস্তিষ্ক এবং চেতনার উৎসকে পদার্থবিজ্ঞানের গভীরতম স্তরে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। এই তত্ত্বের মূল প্রবক্তা হলেন বিখ্যাত নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী স্যার রজার পেনরোজ এবং অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ড. স্টুয়ার্ট হ্যামারফ। তাদের এই বিশেষ তত্ত্বটি ‘Orchestrated Objective Reduction’ বা সংক্ষেপে ‘Orch-OR’ নামে পরিচিত।

সাধারণত স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্স মনে করে যে আমাদের চিন্তা এবং চেতনা হলো মস্তিষ্কের কোটি কোটি নিউরনের মধ্যে বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেত আদান-প্রদানের একটি ফল। কিন্তু কোয়ান্টাম চেতনার প্রবক্তারা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তাদের মতে নিউরনের মধ্যকার এই সংযোগগুলো চেতনার আসল রহস্য ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট নয়। তারা দাবি করেন যে আমাদের চেতনার প্রকৃত উৎস লুকিয়ে আছে নিউরনের ভেতরে থাকা অত্যন্ত ক্ষুদ্র কিছু কাঠামোতে যেগুলোকে ‘মাইক্রোটিউবিউলস’ (Microtubules) বলা হয়।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী মাইক্রোটিউবিউলসগুলো কেবল কোষের কাঠামো ধরে রাখে না বরং এগুলোর ভেতরে কোয়ান্টাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষিত এবং বিশ্লেষিত হয়। কোয়ান্টাম ফিজিক্সের নিয়ম অনুযায়ী কোনো কণা একই সাথে একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে (সুপারপজিশন) এবং এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্তরেই আমাদের ‘সচেতন মুহূর্তগুলো’ তৈরি হয়। যখন একজন মানুষ মারা যায় বা মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছায় তখন মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে গেলেও এই মাইক্রোটিউবিউলসগুলোর ভেতরে থাকা কোয়ান্টাম তথ্য বা চেতনা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় না। পরিবর্তে সেই তথ্যগুলো মহাবিশ্বের বৃহত্তর স্তরে ছড়িয়ে পড়ে যা কোনোদিন বিনাশ হয় না।

পড়ুনঃ  বিদায় জানাতে পারেন উচ্চ কোলেস্টেরলকে?

সহজ কথায় এই তত্ত্বটি আমাদের চেতনাকে কেবল একটি জৈবিক প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে একে মহাবিশ্বের একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে গণ্য করে। এর অর্থ দাঁড়ায় যে শরীর বা মস্তিষ্ক অকেজো হয়ে গেলেও আমাদের চেতনার একটি অংশ মহাবিশ্বের কোয়ান্টাম স্তরে টিকে থাকতে পারে। যদিও এই তত্ত্বটি বিজ্ঞান মহলে এখনো ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে কারণ অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন যে মস্তিষ্কের উষ্ণ এবং আর্দ্র পরিবেশে কোয়ান্টাম অবস্থা বজায় থাকা প্রায় অসম্ভব তবুও সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা মাইক্রোটিউবিউলসের ভেতরে কোয়ান্টাম কম্পনের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে যা এই ধারণাকে নতুন করে প্রাণ দিয়েছে।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী যখন একজন মানুষের শারীরিক মৃত্যু ঘটে তখন সেই কোয়ান্টাম তথ্য বা চেতনা মহাবিশ্বের মৌলিক স্তরে ছড়িয়ে পড়ে কিন্তু তা একেবারে ধ্বংস হয়ে যায় না। যদি কোনো ব্যক্তিকে পুনরায় বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হয় তবে সেই তথ্যগুলো আবার মস্তিষ্কে ফিরে আসে যা থেকে মানুষ মৃত্যুর কাছাকাছি যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারে। সহজ কথায় জম্বি জিন যেখানে শরীরের শেষ মুহূর্তের লড়াইকে তুলে ধরে সেখানে কোয়ান্টাম চেতনা আমাদের অস্তিত্বের এক অবিনশ্বর সম্ভাবনার কথা ইঙ্গিত করে যা হয়তো কোনোদিন বিজ্ঞানের হাত ধরেই পূর্ণতা পাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here