Home ধর্ম মহিমান্বিত মাস মাহে রামাদান: যে মাস আমাদের জীবনকে বদলে দিতে পারে


মহিমান্বিত মাস মাহে রামাদান: যে মাস আমাদের জীবনকে বদলে দিতে পারে


86
0

ব‍্যারিষ্টার হামিদ হোসাইন আজাদ

বরকতময় শা‘বান মাস ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে, মহিমান্বত মাস পবিত্র মাহে রমাদান আমাদের দোরগোড়ায়। এমন এক সম্মানিত মেহমানের আগমনের অপেক্ষায় আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান। এ মহান মেহমান আসে শান্তি, ভালোবাসা ও বরকতের এক বিশাল ভান্ডার নিয়ে। এ মাস শুধু ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; এটি এক ঐশী আহ্বান। রহমত, মাগফিরাত, আত্মসংযম ও আত্মপরিবর্তনের এক পবিত্র সমারোহ।

আমাদের প্রিয় নবী ﷺ এই বরকতময় মাসকে স্বাগত জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। তিনি এর আগমনের দুই মাস পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি নিতেন। মহান সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) বর্ণনা করেন, যখন রজব মাস শুরু হতো, তখন রাসূলুল্লাহ মুহাম্মাদ ﷺ দো‘আ করতেন:

“হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শা‘বান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদের রমাদান পর্যন্ত পৌঁছার তাওফিক দিন।”

এই সুন্দর দো‘আ আমাদের গভীর একটি শিক্ষা দেয়: রজব ও শা‘বান কোনো সাধারণ মাস নয়। এগুলো প্রস্তুতির মাস। কেননা যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এ নেয়ামতে পূর্ণ মাস মাহে রামাদান থেকে পূর্ণ ফায়দা হাসিল করা সম্ভব না। রামাদান মুমিনের কাছে হঠাৎ এসে পড়ে না; বরং তা প্রতীক্ষিত হয়, আকাঙ্ক্ষিত হয়। তাই প্রতিটি ঈমানদারকে উদগ্রীব হৃদয়ে তার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়।

সকল মাসের সেরা মাস

রমাদানকে বলা হয়েছে আল্লাহর মাস—সকল মাসের মধ্যে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি মাস। এ মাসের দিনগুলো সর্বোত্তম দিন, রাতগুলো সর্বোত্তম রাত, আর প্রতিটি মুহূর্ত সবচেয়ে মূল্যবান।

আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা করেন:

“রমাদান মাস, যাতে নাযিল হয়েছে কুরআন, মানুষের জন্য হেদায়েতস্বরূপ এবং হেদায়েতের সুস্পষ্ট প্রমাণ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন এতে সাওম পালন করে।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫)

এটি কুরআনের মাস। মূলতঃ কোরআনের কারনেই এ মাসের এত মর্যাদা। এ মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে ঐশী ওহি, যা আলোকিত করেছে হৃদয় ও সভ্যতা। কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক বৃদ্বি, তিলাওয়াত, তাদাব্বুর (চিন্তন) ও আমলের মাধ্যমে রমাদানের প্রকৃত ফল লাভ করা যেতে পারে । কুরআন ছাড়া রোজা শুধু ক্ষুধা। চিন্তা ভাবনা ছাড়া কুরআন শুধু শব্দ। কিন্তু উভয়ে একত্রে আত্মাকে জাগ্রত করে।

পড়ুনঃ  জার্মানির মুসলিম কবরস্থানে হামলা

রোযা: উপকারের আগে একটি আদেশ

আল্লাহ আরও স্মরণ করিয়ে দেন:

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩)

আমরা মূলত রোযা রাখি, আল্লাহ আমাদের তা করতে আদেশ করেছেন বলেই। আমরা বলি: আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম। হ্যাঁ, রোজা আত্মসংযম বৃদ্ধি করে। এটি শৃঙ্খলা গড়ে তোলে। এতে শারীরিক ও সামাজিক উপকারিতা রয়েছে। কিন্তু আমরা নিছক এসব বাহ‍্যিক উপকারের জন‍্য রোযা রাখিনা। আমাদের মাহে রামাদানে রোযা রাখার ভিত্তি একটিই—এটি ইবাদত এবং মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের প্রকাশ। রমাদান ডায়েটের মাস নয়; এটি মূলত ইবাদতের মাস।

জিকির, আত্মসমালোচনা হৃদয়ের পরিবর্তনের মাস

রমাদান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অমূল্য উপহার। এটি আমাদের দৈনন্দিন ব্যস্ততা ও গাফিলতি থেকে জাগিয়ে তোলে। এটি শুধু জিজ্ঞেস করে না—আমাদের সময়সূচি বদলাবে কি না; বরং প্রশ্ন করে, আমাদের হৃদয় বদলাবে কি না।

আল্লাহ বলেন:

“তুমি তোমার প্রতিপালককে মনে মনে স্মরণ কর বিনয়ের সাথে ও ভয়ে, উচ্চস্বরে নয়—সকালে ও সন্ধ্যায়; আর তুমি গাফিলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:২০৫)

জিকির নিছক একটি পরিভাষা নয়; এটি মন এ মননের সচেতনতা। এটি বিনয়, আন্তরিকতা ও উপলব্ধির সাথে আল্লাহকে স্মরণ করা। সকাল-সন্ধ্যায়, দাড়ানো, বসা,ও শয়নে, তথা সর্বাবস্থায়  নীরবে ও নিয়মিতভাবে তাকে নিয়ে ভাবা এবং আমাদের চারপাশে বিমান তাঁর সৃষ্টির নিয়ামতের শোকরিয়া আদায় করা । রামাদান হলো হৃদয়ের প্রশিক্ষণক্ষেত্র, এটি তাকওয়া সৃষ্টির বিদ্যালয়।

যদি রামাদান আমাদের কোমল না করে, বিনয়ী না করে এবং সংশোধন না করে, তবে মনে করতে হবে আমরা এক অমূল্য সুযোগ হারালাম।

শুধু ক্ষুধা নয়: পূর্ণাঙ্গ সংশোধন

রাসূল ﷺ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, রোযা শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়। এটি জিহ্বাকে কু-কথা থেকে রক্ষা করা, চোখকে হারাম থেকে সংযত রাখা, কানকে অনর্থক বিষয় শুনা থেকে দূরে রাখা এবং হৃদয়কে অহংকার ও হিংসা থেকে পবিত্র রাখার শিক্ষা দেয়।

রমাদান আমাদেরকে দান ও সহমর্মিতার দিকে আহ্বান করে। গরিবের ক্ষুধা অনুভব করতে শেখায়। এতিমদের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে বলে। আমাদের প্রিয় সম্পদ থেকে আল্লাহর পথে, মানবতার কল‍্যানে ব্যয় করতে শেখায়। আল্লাহ বলেন:

পড়ুনঃ  ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা: রমযানের আমল কীভাবে ধরে রাখবো?

“পরহেজগারী কেবল পূর্ব বা পশ্চিম দিকে মুখ ফেরানো নয়; বরং প্রকৃত পরহেজগার তথা সৎকর্মশীল হলো তারা, যারা ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নাবীগণের প্রতি এবং আল্লাহর ভালবাসার্থে ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির ও যাচ্ঞাকারীদের এবং দাসত্বজীবন হতে নিস্কৃতি দিতে দান করবে এবং নামায কায়িম করবে ও যাকাত দিতে থাকবে, ওয়া‘দা করার পর স্বীয় ওয়া‘দা পূর্ণ করবে এবং অভাবে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংকটে ধৈর্য ধারণ করবে, এ লোকেরাই সত্যপরায়ণ আর এ লোকেরাই মুত্তাকী। ” (সূরা আল-বাকারা ২:১৭৭)

সত্যিকারের নেকি প্রদর্শনের বিষয় নয়; এটি জীবনের বাস্তবতার সবিনয় বহিঃপ্রকাশ

তাওবার দরজা উন্মুক্ত

রমাদান হলো প্রত্যাবর্তনের মাস। নবী ﷺ মুমিনদের এ মাসে বেশি বেশি দো‘আ করতে উৎসাহিত করেছেন, কারণ এটি এমন সময়, যখন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকান। তিনি দো‘আ কবুল করেন এবং আন্তরিক তাওবা গ্রহণ করেন। আল্লাহ সুসংবাদ দেন:

“যারা তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে—আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলোকে সৎকর্মে পরিণত করে দেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭০)

এর চেয়ে বড় আশা আর কী হতে পারে? এই মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়। যেন আকাশমণ্ডলী নিজেই মুমিনকে পরিবর্তনের পথে সাহায্য করছে।

শুধু রমাদান অতিক্রম নয়

আমরা যেন শুধু রামাদানকে অতিক্রম না করি। বরং রামাদান যেন আমাদের অতিক্রম করে যায়।

এটি যেন আমাদের চরিত্রে, পরিবারে, সমাজে এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্কের উপর স্থায়ী ছাপ বা প্রভাব রেখে যায়। ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য জীবনে আল্লাহর প্রতি সচেতনতা গড়ে তোলে। আমরা যেন কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয়, একটি ঐক্যবদ্ধ উম্মাহ হিসেবে এগিয়ে যাই—একসাথে দাঁড়াই, একসাথে ইবাদত করি, একসাথে সংশোধন করি, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ভালোবাসি। এভাবেই আমরা একসাথে জান্নাতের পথে এগিয়ে যেতে পারব। এ রামাদান্ এটাই হওয়া উচিত আমাদের বিরত।

পড়ুনঃ  ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : দোয়া কীভাবে করবো, কেন করবো

এই রমাদানের জন্য নয়টি মূল্যবান অঙ্গীকার

আসুন এই মহিমান্বিত মাস থেকে পূরণাংগ ফায়দা হাসিলের জন‍্য বাস্তব পরিবর্তনের অঙ্গীকার করি:

• আমার জীবনে ন‍্যুনতম একটি পরিবর্তনের আন্তরিক চেষ্টা করি

• জীবনে বুঁদ‍্যমান একটি খারাপ অভ্যাস ত্যাগের চেষ্টা করি

• কমপক্ষে একটি ভালো অভ্যাস গড়ে তুলি। 


• কুরআনের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনে আরো এক ধাপ অগ্রসর হই।


• আল্লাহর নৈকট্যে লাভে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাই।


• জিহ্বাকে সংযত রাখি, বেহুদা কথা থেকে বিরত থাকি

• যথাসম্ভব দান সদকা বৃদ্ধি করি।

• পারিবারিক সম্পর্ক সূদৃঢ় করি।

• প্রতিদিন কায়মনোবাক‍্যে আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহ মাফির জন‍্য, ছেলে সন্তানের নিরাপদ, পবিত্র ও সুন্দর জীবনের জন‍্য, সমাজ ও প্রতিবেশীর বা বন্দ্বু বান্দ্ববদের কল‍্যানের জন‍্য, দেশের কল‍্যান ও সমৃদ্বির জ এবং সর্বোপরি সমগ্র উম্মাহর জন‍্য দো‘আ করা।

পরিবর্তন সহজ নয়। কিন্তু আল্লাহ তাঁদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর দিকে ফিরে আসে। প্রতিটি বান্দার আন্তরিক অশ্রু তিনি দেখেন। গোপন ও প্রকাশ‍্যে করা প্রতিটি দো‘আ তিনি শোনেন। প্রতিটি প্রচেষ্টা তাঁর ফেরেশতারা লিপিবদ্ধ করেন। আমরা যদি তাঁর দিকে এক কদম এগোই, তিনি আমাদের দিকে দৌড়ে আসেন। অতএব জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে আমাদের জীবনকে একটি সুন্দর ও গতিশীল জীবনে পরিণত করতে

যে রমাদান আমাদের পরিচয় নির্ধারণ করবে

আবার স্মরন করা মর্যাদাকর মনে করছি যে, কয়েক দিনের মধ্যেই এমন একটি মাস আসবে, যা আমাদের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে গড়ে দিতে পারে। প্রশ্ন রমাদান আসবে কি না এটা না। বরং প্রশ্ন হলো—আমরা কি তাকে যথাযথভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত? আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, এই রমাদান যেন আমাদের পরিবর্তনের রমাদান হয়।

যে রমাদান আমাদের হৃদয় কোমল করে। যে রমাদান আমাদের জীবনের গল্প নতুন করে লেখে। যে রমাদান আমাদের আল্লাহর আরও নিকটে আনে—এবং নিকটে আনে আমাদের একে অপরকেও।

আল্লাহ আমাদেরকে পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারে এ মাসকে বরন করার তাওফিক দিন। আন্তরিকতার সাথে এটিকে উদযাপন করার তাওফিক দিন এবং রামাদান শেষ হওয়ার আগে আমাদেরকে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে একটি পরিশুদ্ধ ও পরিতৃপ্ত জীবনের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন, আমীন।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here