ওয়াশিংটন: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। গার্ডিয়ান পত্রিকার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা তাদের অধীনস্থ সেনাদের মাঝে চরমপন্থী খ্রিস্টীয় তাত্ত্বিক মতবাদ বা ‘বাইবেলের অন্তিমকালের’ (End Times) বয়ান প্রচার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগটি করেছে মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) নামক একটি নজরদারি সংস্থা।
সংস্থাটির দাবি, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখা থেকে ২০০টিরও বেশি অভিযোগ পেয়েছে। এসব অভিযোগে বলা হয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানকে কমান্ডাররা ‘ঈশ্বরের ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ’ হিসেবে তুলে ধরছেন। এমনকি এক ইউনিটের নন-কমিশন্ড অফিসার (এনসিও) জানিয়েছেন, কমান্ডাররা তাদের বলেছেন—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যিশু খ্রিস্টের দ্বারা ‘অভিষিক্ত’ হয়ে ইরানে যুদ্ধের সংকেত জ্বালিয়েছেন, যা বাইবেলে বর্ণিত সেই ‘আরমাগেডন’ বা বিশ্বের চূড়ান্ত যুদ্ধের সূচনা করবে এবং এর মাধ্যমেই যিশুর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন ঘটবে।
অভিযোগটি ১৫ জন সেনার একটি দলের পক্ষ থেকে করা হয়েছে, যেখানে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী সেনাদের পাশাপাশি মুসলিম ও ইহুদি ধর্মের সদস্যরাও রয়েছেন। ভুক্তভোগী সেনাদের মতে, সামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এমন অবস্থানের কারণে তারা নিজেদের কর্মক্ষেত্রে অনিরাপদ ও অস্বস্তিবোধ করছেন। এমআরএফএফ-এর প্রেসিডেন্ট মাইকি ওয়াইনস্টাইন এই ঘটনাকে মার্কিন সংবিধানে গির্জা ও রাষ্ট্র পৃথক রাখার নীতির চরম লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, সামরিক বাহিনীতে এ ধরনের খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের প্রসার মার্কিন প্রশাসনের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে বর্তমান মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের নামও। অতীতে খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদ ও উগ্র খ্রিস্টীয় পুনর্গঠনবাদী মতবাদের প্রতি তার সমর্থনের কথা সর্বজনবিদিত। সমালোচকরা মনে করছেন, পেন্টাগনের শীর্ষ পর্যায়ে এমন ব্যক্তিদের উপস্থিতির কারণেই সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শের চর্চা উৎসাহিত হচ্ছে। তবে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পেন্টাগনের মুখপাত্ররা কেবল ইরান অপারেশন সংক্রান্ত হেগসেথের বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ প্রচার করেই তাদের দায় সেরেছেন, যা বিষয়টি নিয়ে আরও ধোঁয়াশা তৈরি করেছে।
এদিকে, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া এই মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযান নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। অনেক আইনপ্রণেতা ও বিশেষজ্ঞ মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে আইনত অবৈধ ও ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমআরএফএফ-এর এই নতুন উদ্ঘাটন মার্কিন সামরিক বাহিনীর মনোবল এবং তাদের যুদ্ধের নৈতিক বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। ধর্ম ও রাষ্ট্রের এই সংঘাতময় প্রেক্ষাপট মার্কিন প্রশাসনকে এখন এক জটিল কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।





