কামাল সিকদার
ইসলামিক রেনেসাঁর কালজয়ী কবি মুহাম্মদ ইকবাল একবার লিখেছিলেন: “ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কে বাদ”—অর্থাৎ, প্রতিটি কারবালার পরেই ইসলাম নতুন করে জীবন ফিরে পায়। অনেক পর্যবেক্ষকের চোখে, ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে যা ঘটেছিল, তা যেন ছিল আধুনিক ইতিহাসের এক নতুন কারবালা। এই ব্যাখ্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে দেখা হচ্ছে ইয়াজিদের সেনাবাহিনীর ভূমিকায়।
সেই অভিশপ্ত দিনে ইরান হারালো তার সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে। মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সে তাঁর এই মহাপ্রয়াণ সংকটের মোড় ঘুরিয়ে দিল নাটকীয়ভাবে। হামলার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই খবরটি বিশ্ববাসীকে জানান। মৃত্যুর আগে খামেনি তাঁর দীর্ঘ ৩৭ বছরের শাসনামলে তাঁর লক্ষ্যগুলোর অনেকটাই পূরণ করে গেছেন। দশকের পর দশক ধরে তিনি ইরানকে এক অপরাজেয় আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। তাঁর মৃত্যু দেশটিকে দুর্বল করেনি; বরং ইরানি জনগণকে এক অভূতপূর্ব ঐক্যের সুতোয় গেঁথেছে। মনে রাখতে হবে, ইরান কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি সাধারণ রাষ্ট্র নয়; এটি প্রায় পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন এক সভ্যতার উত্তরাধিকারী।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের অনেক কৌশলবিদ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করতেন যে, ইরানের পরিণতিও হয়তো লিবিয়া, ইরাক বা সিরিয়ার মতোই হবে—বিদেশি হস্তক্ষেপ আর যুদ্ধে যা ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখন বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ছে। মার্কিন-ইসরায়েল জোটের যা একসময় রণকৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, তা এখন এক বিপজ্জনক ভুল হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসের সেই সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র বারো দিনের যুদ্ধের পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সাথে এক বৃহত্তর সংঘাতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তাদের ধারণা ছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো তারা শনাক্ত করে ফেলেছে। পরিকল্পনা ছিল সহজ: যুদ্ধের শুরুতেই সেই স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে ইরানের পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া। কিন্তু বাস্তব সেই ছক মেনে চলেনি।
গত রাতে ইসরায়েলের লক্ষ লক্ষ মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখল। এটি আগের কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো ছিল না। আকাশে এক বা দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের বদলে দেখা গেল শত শত আলোর রেখা, যেন দিগন্ত জুড়ে আতশবাজির মেলা বসেছে।
আসলে তারা যা দেখছিল, তা হলো ‘ক্লাস্টার মিসাইল’ বা গুচ্ছ ক্ষেপণাস্ত্রের তান্ডব। এই অস্ত্র আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমস্ত যুক্তি বদলে দেয়। সাধারণত, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি নির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করে: রাডার আগত ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে, তার পথ গণনা করে এবং তা ধ্বংস করতে একটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। অর্থাৎ, একটি হুমকির বিপরীতে একটি প্রতিরক্ষা। সরকারগুলো কোটি কোটি ডলার খরচ করে এই ব্যবস্থা তৈরি করেছে যাতে নাগরিকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া যায়।
গুচ্ছ ক্ষেপণাস্ত্র সেই সমীকরণ ভেঙে চুরমার করে দেয়।
একটি ক্লাস্টার মিসাইল শুরুতে রাডারে একটি মাত্র বস্তু হিসেবেই ধরা পড়ে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটিকে লক্ষ্য করে ইন্টারসেপ্টর ছোঁড়ে। কিন্তু নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছানোর পর ক্ষেপণাস্ত্রের খোলসটি খুলে যায় এবং ভেতর থেকে মুহূর্তের মধ্যে শত শত ছোট ছোট ওয়ারহেড বা বোমা বেরিয়ে আসে। সেগুলো বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে মাটির দিকে ধেয়ে আসতে থাকে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যখন বুঝতে পারে কী ঘটছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইন্টারসেপ্টরটি হয়তো সেই খালি খোলসটিকে আঘাত করে, যখন আসল বোমাগুলো ইতিমধ্যে তাদের লক্ষ্যের দিকে নামতে শুরু করেছে। এগুলোকে আলাদাভাবে রুখতে একই সময়ে শত শত ইন্টারসেপ্টর ছোঁড়ার প্রয়োজন, যা বিশ্বের কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষেই বর্তমানে সম্ভব নয়।
এই কারণেই ইসরায়েলি শহরগুলো থেকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে আকাশের গায়ে শত শত উজ্জ্বল রেখা দেখা যাচ্ছে। এটি কোনো একক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস হওয়ার দৃশ্য নয়; এটি একটি ক্ষেপণাস্ত্রের বহুতে রূপান্তরিত হওয়ার আখ্যান। কার্যকরভাবে ইরান এমন এক পথ খুঁজে পেয়েছে, যেখানে একটি ক্ষেপণাস্ত্রই পুরো এক ব্যাটালিয়ন ক্ষেপণাস্ত্রের মতো আচরণ করে।
এই আক্রমণ ঠেকানোর আর্থিক বোঝা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একেকটি উন্নত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ৩০ থেকে ৯০ লক্ষ ডলার। অন্যদিকে, একটি গুচ্ছ ক্ষেপণাস্ত্রের দাম তার তুলনায় অতি সামান্য। একটি মাত্র গুচ্ছ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটি ক্ষুদ্র বোমা ঠেকানোর চেষ্টায় রক্ষণভাগকে হয়তো এককালীন ১০ থেকে ৩০ কোটি ডলার ব্যয় করতে হতে পারে। অথচ ইরান এক রাতেই এমন বহু ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে সক্ষম।
একই সাথে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের সংকটে ভুগছে। এগুলো দ্রুত তৈরি করা সম্ভব নয়; উৎপাদন চক্রে বছরের পর বছর সময় লাগে এবং মজুদও সীমিত।
তবে এই সংঘাতের সামরিক দিকটিই একমাত্র বড় ঘটনা নয়। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মাইক্রোসফট পরিচালিত একটি ডেটা সেন্টারেও আঘাত হেনেছে। এটি কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না। এটি ছিল সেই ডিজিটাল অবকাঠামোর অংশ যা ক্লাউড কম্পিউটিং, করপোরেট নেটওয়ার্ক, আর্থিক পরিষেবা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্ল্যাটফর্মগুলোকে সচল রাখে। এই আঘাতের মাধ্যমে ইরান একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: যুদ্ধক্ষেত্র আর কেবল সৈন্য বা সামরিক ঘাঁটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ডিজিটাল এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোও এখন যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু।
ইরানি কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই যুদ্ধের দ্বিতীয় ধাপের কথা বলছেন, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি ব্যবস্থা এবং আর্থিক নেটওয়ার্কের ওপর সাইবার হামলা চালানো হতে পারে।
এদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও চমকে দেওয়ার মতো। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক ধনকুবের ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন, যা আরব বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর প্রশ্ন ছিল সোজাসাপ্টা: পৃথিবীর অন্যতম শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ অঞ্চলে যুদ্ধ ডাকার অধিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কে দিয়েছে? যা গড়তে দশকের পর দশক সময় লেগেছে, তা ধ্বংস করার কর্তৃত্ব ওয়াশিংটনকে কে দিয়েছে?
যখন প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীরা এভাবে কথা বলতে শুরু করেন, তখন তা এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। পর্দার আড়ালে, ট্রিলিয়ন ডলারের তেল সম্পদে পুষ্ট উপসাগরীয় সার্বভৌম তহবিলগুলো এখন তাদের বৈদেশিক বিনিয়োগ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদগুলো পুনর্বিবেচনা করছে। ট্রাম্প আগে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছিলেন। এখন সেই প্রতিশ্রুতি ঝুঁকির মুখে।
বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থার ওপর টিকে আছে। উপসাগরীয় দেশগুলো ডলারে তেল বিক্রি করে এবং সেই ডলার পুনরায় মার্কিন সরকারি বন্ড ও বাজারে বিনিয়োগ করে। এই ব্যবস্থাই ডলারের শক্তি ধরে রেখেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশাল ঋণের বোঝা নিয়েও সুদের হার কম রাখতে সাহায্য করেছে। যদি এই বিনিয়োগ মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে ফলাফল হবে ভয়াবহ। মার্কিন ঋণের ওপর সুদের হার বাড়বে, ডলার দুর্বল হবে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে।
এর সাথে যোগ হয়েছে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা। গত পনেরো বছর ধরে চীন নীরবে বিকল্প আর্থিক নেটওয়ার্ক এবং জ্বালানি চুক্তি গড়ে তুলেছে যা ডলারকে পাশ কাটিয়ে চলে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে এখন বিকল্প পথ খোলা। ওয়াশিংটনের বদলে তারা এখন বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকতে পারে।
এই সংঘাতের একটি গোয়েন্দা তথ্যগত দিকও রয়েছে যা নিয়ে খুব কম মানুষই প্রকাশ্যে আলোচনা করছে। পুরো যুদ্ধ জুড়ে ইরানের হামলাগুলো ছিল অবিশ্বাস্য রকমের নির্ভুল। বাহরাইনের নির্দিষ্ট হোটেলের ঘর যেখানে মার্কিন কর্মকর্তারা অবস্থান করছিলেন, মোসাদের সাথে যুক্ত ভবন, এমনকি জর্ডানে একটি থাড (THAAD) রাডার সিস্টেমের অবস্থান—সবই নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে। এই লক্ষ্যবস্তুগুলো চরম গোপনীয়তায় সুরক্ষিত থাকার কথা ছিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের দ্রুত বিস্তারমান স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক হয়তো ইরানকে এই নিখুঁত তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে।
চিত্রটি এখন পরিষ্কার। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের প্রধান স্তম্ভগুলো—সামরিক শক্তি, আর্থিক সম্পর্ক, গোয়েন্দা শ্রেষ্ঠত্ব এবং ডিজিটাল অবকাঠামো—একযোগে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে।
এক সপ্তাহ আগেও অনেকে ভেবেছিলেন এই সংকট পরিচিত পথেই হাঁটবে: কয়েক দিনের তীব্র লড়াই, তারপর একটি যুদ্ধবিরতি এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা। কিন্তু তেমনটা ঘটছে না। গত ৪০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি যে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, তা এখন ধীরলয়ে কিন্তু সুনিশ্চিতভাবে বদলে যাচ্ছে।
এখনকার মূল প্রশ্নটি সহজ কিন্তু কঠিন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এরপর কী করবে?
যুদ্ধ বাড়ানোর অর্থ হলো আরও ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়, আরও ব্যয় এবং গভীর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা। ইরানে শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা করার অর্থ হলো প্রায় ৯ কোটি মানুষের একটি দেশের মুখোমুখি হওয়া, যাদের ভূখণ্ড দুর্গম এবং যারা দশকের পর দশক ধরে অসম যুদ্ধের (Asymmetric warfare) প্রস্তুতি নিয়েছে—যা ইরাক বা আফগানিস্তানের চেয়েও বহুগুণ জটিল হবে। অন্যদিকে, যুদ্ধ বিরতি বা সমঝোতা ওয়াশিংটনের জন্য বয়ে আনবে চরম রাজনৈতিক গ্লানি।
গত রাতে ইসরায়েলের আকাশে একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে শত শত বোমা বৃষ্টি হয়ে ঝরেছে। আজ উপসাগরীয় বিনিয়োগকারীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিনিয়োগের কথা নতুন করে ভাবছেন। আর তেহরানের কোনো এক কক্ষে সামরিক পরিকল্পনাবিদরা হয়তো যুদ্ধের পরবর্তী ধাপের ছক কষছেন।
ইতিহাস প্রায়শই সেই নেতাদের কঠোর বিচার করে যারা শান্তির চেয়ে অহংকারকে বেছে নেন, বিশেষ করে যখন তার চড়া মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। আর ইতিহাস সেই মুহূর্তগুলোকে সহজে ভোলে না।




