মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে যেগুলো শুধু একটি দেশের ইতিহাস নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক বিকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ইরান বা প্রাচীন পারস্য তেমনই একটি অঞ্চল। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চল সাম্রাজ্য, সংস্কৃতি, দর্শন, সাহিত্য এবং ধর্মীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এক অনন্য ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা গড়ে তুলেছে। প্রাচীন পারস্যের গৌরবোজ্জ্বল সাম্রাজ্য, ইসলামের আগমন, ইসলামী সভ্যতার বিকাশে পারস্যভূমির অবদান এবং পরবর্তীকালে শিয়া মতবাদের প্রতিষ্ঠা—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক।
প্রাচীন যুগে পারস্য ছিল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্যের কেন্দ্র। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মহান শাসক সাইরাস দ্য গ্রেট আকেমেনিড সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতিকে একত্রিত করে এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন যা সেই সময়ের জন্য অত্যন্ত উন্নত ও কার্যকর ছিল। তাঁর শাসনামলে পারস্য সাম্রাজ্য দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং একসময় তা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত হয়। এই সাম্রাজ্য ইতিহাসে পরিচিত আকেমেনিড সাম্রাজ্য নামে। এর বিস্তৃতি এতটাই ব্যাপক ছিল যে একে অনেক সময় বিশ্বের প্রথম বৃহৎ বহুজাতিক সাম্রাজ্য বলা হয়।
এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল আজকের অনেকগুলো আধুনিক রাষ্ট্র ও অঞ্চল। বর্তমানের ইরান ছিল এর কেন্দ্রভূমি। এর পাশাপাশি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমানের ইরাক, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, তুরস্ক-এর পূর্বাংশ, সিরিয়া, লেবানন, ইসরায়েল, জর্ডান এবং মিশর-এর কিছু অংশ। মধ্য এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যেও পারস্যের প্রভাব ছিল বিস্তৃত। আজকের আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান এবং কাজাখস্তান-এর দক্ষিণাঞ্চল বিভিন্ন সময়ে পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দিকে সাম্রাজ্যের প্রভাব পৌঁছে গিয়েছিল বর্তমানের পাকিস্তান-এর কিছু অঞ্চলেও। এই বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতির কারণে পারস্য সাম্রাজ্য বিভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও জনগোষ্ঠীর মিলনস্থলে পরিণত হয়েছিল।
প্রাচীন পারস্য শুধু সামরিক শক্তি বা প্রশাসনিক দক্ষতার জন্যই বিখ্যাত ছিল না; এর নিজস্ব ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্যও ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ইসলামের আগমনের পূর্বে পারস্যের প্রধান ধর্ম ছিল জরথুস্ত্রবাদ, যার প্রবর্তক ছিলেন জরথুস্ত্র। এই ধর্মে সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। জরথুস্ত্রবাদ পারস্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করে। পরে পারস্যে সাসানীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ইসলামের আবির্ভাবের সময় পর্যন্ত টিকে ছিল এবং সে সময় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত ছিল।
সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের উত্থান এবং আরব মুসলমানদের বিজয়ের মাধ্যমে পারস্য ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। ইসলামের বিস্তার শুরু হয় আরব উপদ্বীপ থেকে এবং ধীরে ধীরে তা পারস্য সাম্রাজ্যের সীমান্তে পৌঁছে যায়। তখন পারস্যে সাসানীয় সাম্রাজ্যের শাসন চলছিল এবং এর শেষ সম্রাট ছিলেন ইয়াজদেগার্দ তৃতীয়। মুসলিম বাহিনী পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়, যা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
এই যুদ্ধগুলোর মধ্যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল কাদিসিয়্যার যুদ্ধ। এই যুদ্ধটি ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ইরাক-এর কাদিসিয়্যাহ অঞ্চলে সংঘটিত হয়। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস এবং পারস্য বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সাসানীয় সেনাপতি রুস্তম ফাররুখজাদ। দীর্ঘ ও কঠিন এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত পারস্য বাহিনী মারাত্মকভাবে পরাজিত হয় এবং তাদের প্রধান সেনাপতি নিহত হন। এই বিজয়ের ফলে মুসলিম বাহিনীর জন্য পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী ক্টেসিফন দখল করা সহজ হয়ে যায় এবং পারস্য সাম্রাজ্যের শক্ত ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
এর কয়েক বছর পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা ইতিহাসে নেহাভন্দের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধটি ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ইরান-এর নেহাভন্দ অঞ্চলে সংঘটিত হয়। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেন নু‘মান ইবন মুকাররিন। এই যুদ্ধে পারস্য বাহিনী চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। ইতিহাসে এই যুদ্ধকে অনেক সময় “ফাতহুল ফুতূহ” অর্থাৎ “বিজয়ের বিজয়” বলা হয়, কারণ এর পরেই সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতন কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায়।
এই দুই যুদ্ধের পর পারস্যের শেষ সম্রাট ইয়াজদেগার্দ তৃতীয় ক্রমশ ক্ষমতা হারাতে থাকেন এবং অবশেষে কয়েক বছরের মধ্যে সাসানীয় সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ পতন ঘটে। এর ফলে পারস্য অঞ্চল মুসলিম শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ধীরে ধীরে ইসলামের বিস্তার শুরু হয়। তবে পারস্যে ইসলাম বিস্তার ছিল একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। প্রথমদিকে অনেক মানুষ তাদের পূর্বের ধর্মেই অবিচল ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসলাম ধীরে ধীরে পারস্য সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে পারস্য ইসলামী সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এই অঞ্চল থেকে অসংখ্য মহান আলেম, দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক উঠে আসেন। ইসলামী হাদিসশাস্ত্রের ক্ষেত্রে বিখ্যাত হাদিসসংগ্রাহক মুহাম্মদ আল-বুখারি জন্মগ্রহণ করেছিলেন বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারা অঞ্চলে। একইভাবে মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ ছিলেন নিশাপুরের অধিবাসী। ফিকহ ও ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা-এর পরিবারও পারস্য অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ইসলামী চিন্তাধারার ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ইমাম আল-গাজ্জালি ছিলেন তুস নগরীর অধিবাসী।
দর্শন ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও পারস্য থেকে উঠে আসা ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইবনে সিনা, যিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান ও দর্শনে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। একইভাবে আল-ফারাবি রাজনৈতিক দর্শন ও যুক্তিবিদ্যায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ওমর খৈয়াম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এবং আল-বিরুনি ভূগোল, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ইতিহাসে অসামান্য গবেষণা করেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও পারস্যের অবদান অপরিসীম। মহাকবি ফিরদৌসি তাঁর ‘শাহনামা’ মহাকাব্যের মাধ্যমে পারস্যের প্রাচীন ইতিহাসকে অমর করে তুলেছেন। সুফি কবি জালালুদ্দিন রুমি-এর কবিতা আজও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এছাড়া সাদি শিরাজি এবং হাফেজ পারস্য সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র।
তবে আজকের ইরানের ধর্মীয় পরিচয় মূলত শিয়া হলেও ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চল প্রধানত সুন্নি ছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে সাফাভি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে এর প্রতিষ্ঠাতা শাহ ইসমাইল প্রথম দ্বাদশী শিয়া মতবাদকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। এর ফলে ধীরে ধীরে ইরান একটি প্রধান শিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
ইতিহাসের দীর্ঘ ধারায় পারস্যভূমি কখনো একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের কেন্দ্র, কখনো জ্ঞান ও সংস্কৃতির মহান কেন্দ্র, আবার কখনো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রাচীন পারস্যের গৌরব, ইসলামের আগমন, ইসলামী সভ্যতার বিকাশে পারস্যের অবদান এবং পরবর্তীকালে শিয়া ইরানের উত্থান—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলের ইতিহাস মানবসভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সুমন মাহমুদ
টিভি উপস্থাপক ও লেখক






