Home বিশ্ব বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনা: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে?

বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনা: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে?

48
0

বিশ্ব রাজনীতিতে ঘনীভূত হতে থাকা সাম্প্রতিক উত্তেজনা কি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা, নাকি মানবসভ্যতা ধীরে ধীরে একটি বড় বৈশ্বিক সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—এই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। তাদের দাবি, আমরা হয়তো এমন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যা ভবিষ্যতে ইতিহাসে একটি বড় যুদ্ধের সূচনা পর্ব হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।

একজন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার জন্য যে ধরনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা ‘অফিসিয়াল ডিক্লারেশন’-এর কথা সাধারণ মানুষ কল্পনা করে, বাস্তবে তেমন কোনো ঘোষণা হয়তো কখনোই আসবে না। বরং ইতিহাসে বড় যুদ্ধগুলো প্রায়ই ধীরে ধীরে শুরু হয়। তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন, যা তার মতে ইঙ্গিত দেয় যে বিশ্ব ইতিমধ্যেই এক ধরনের পরোক্ষ বৈশ্বিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।

প্রথম লক্ষণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন আঞ্চলিক সংঘাতের পেছনে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি, যা সাধারণত ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলো আর কেবল সংশ্লিষ্ট দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এসব সংঘাতে একদিকে ন্যাটো ও পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে ইরান, উত্তর কোরিয়া কিংবা চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলো ভিন্ন মেরু তৈরি করছে। ইতিহাসবিদের মতে, এই ধরনের ‘শ্যাডো ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধ বড় বৈশ্বিক সংঘাতের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে।

দ্বিতীয় লক্ষণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেছেন আধুনিক অর্থনৈতিক ও সাইবার যুদ্ধের বিষয়টি, যাকে বলা হয় ‘গ্রে জোন ওয়ারফেয়ার’। অতীতের মতো এখন আর যুদ্ধ মানেই কেবল আকাশপথে বোমাবর্ষণ বা সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ নয়। কোনো দেশ যদি অন্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেটওয়ার্কে সাইবার হামলা চালায়, কিংবা সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া ইন্টারনেট কেবল বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করে—তবে সেটিও যুদ্ধের একটি রূপ। এই পদ্ধতিতে সরাসরি সৈন্য না পাঠিয়েও একটি দেশের অর্থনীতি ও স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব। বর্তমান বিশ্বে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তিগত অবরোধ এবং বিভিন্ন সাইবার হামলার ঘটনাগুলো এই ধারণাকে আরও জোরালো করে তুলছে।

পড়ুনঃ  ত্রিপুরায় মুসলমানদের লক্ষ্য করে সহিংসতা নিয়ন্ত্রনে রাজ্য সরকার সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে: এসসি অ্যাডভোকেট

তৃতীয় লক্ষণ হিসেবে ইতিহাসবিদরা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ক্রমবর্ধমান অকার্যকারিতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বড় যুদ্ধের আগে শান্তি রক্ষার দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই দুর্বল হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যেমন ‘লিগ অব নেশনস’ কার্যত ব্যর্থ হয়েছিল, বর্তমানে জাতিসংঘ ও এর নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অচলাবস্থার অভিযোগ উঠছে। ভেটো ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার এবং বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাব আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

এই প্রেক্ষাপটে একটি সতর্কবার্তা উল্লেখ করা হচ্ছে, যেখানে বলা হয়েছে—
“ইতিহাস কখনো ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় না, এটি ধীরে ধীরে আমাদের গ্রাস করে। যখন আমরা পেছন ফিরে তাকাব, তখন হয়তো বুঝতে পারব যে ২০২৪ বা ২০২৫ সালের সংঘাতগুলোই ছিল এক বড় দাবানলের প্রথম স্ফুলিঙ্গ।” — সংগৃহীত উদ্ধৃতি।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ধরনের সতর্কবার্তা সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ শান্তির পথকে ক্রমেই সংকীর্ণ করে তুলছে।

এই ধরনের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ Niall Ferguson-এর নাম প্রায়ই আলোচনায় আসে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের Hoover Institution-এর একজন সিনিয়র ফেলো এবং Stanford University-এর সঙ্গে যুক্ত।

ফার্গুসন গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম এবং তার লেখালেখিতে বারবার সতর্ক করেছেন যে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকের রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ। তার লেখা বইগুলোর মধ্যে The Square and the Tower বিশেষভাবে আলোচিত, যেখানে তিনি আধুনিক ক্ষমতার নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেছেন।

ফার্গুসনের মতে, বর্তমান বিশ্ব আসলে একটি নতুন ‘দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধ’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা যেকোনো সময় সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তার বিশ্লেষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ উঠে এসেছে।

পড়ুনঃ  হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী তলোয়ারবাজি ও তিরন্দাজি পুনরুজ্জীবিত করেছেন সৌদি অশ্বারোহী তরুণীরা

প্রথমত, তিনি মনে করেন বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন শক্তির মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে। তার মতে, রাশিয়া, চীন এবং ইরান এক ধরনের নতুন ‘অক্ষশক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার শক্তির ভারসাম্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত, ফার্গুসনের মতে যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো সব ক্ষেত্রে একচ্ছত্র সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নেই। এই তুলনামূলক দুর্বলতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিষয়টি তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার আক্রমণের মতো নতুন প্রযুক্তি আধুনিক যুগে পারমাণবিক অস্ত্রের সমতুল্য কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারে।

ফার্গুসনের পাশাপাশি ব্রিটিশ সামরিক ইতিহাসবিদ Max Hastings-সহ আরও কয়েকজন বিশ্লেষকও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বর্তমান বিশ্ব ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল বৈশ্বিক সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সহযোগিতার বিকল্প নেই। অন্যথায় আজকের ছোট ছোট সংঘাতই ভবিষ্যতে একটি বড় বৈশ্বিক সংকটের রূপ নিতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here