Home ধর্ম ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমা’র খুতবা: রমজানের শেষ দশ রাতের ইবাদত

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমা’র খুতবা: রমজানের শেষ দশ রাতের ইবাদত

43
0

শায়খ সৈয়দ আনিসুল হক

রমজান খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে । আমরা রমজানের শেষ দশ রাত অতিক্রম করছি ।
এই রাতগুলো সাধারণ রাত নয়। এগুলো বছরের অন্য সময়ের মতো নয়। এগুলো সেই রাত, যেগুলোর জন্য রাসূলুল্লাহ (সা:) বিশেষ প্রস্তুতি নিতেন এবং অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ইবাদতে মনোযোগ দিতেন।

হযরত আয়েশা (সা:) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা:) শেষ দশ রাতে এমনভাবে ইবাদতে পরিশ্রম করতেন, যা তিনি অন্য সময় করতেন না।” (সহীহ মুসলিম)

ভাবুন, যাঁর আগের ও পরের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়েছিল, সেই নবী (সা:) যখন এই রাতগুলোতে এত বেশি ইবাদত করতেন—তাহলে আমাদের অবস্থা কেমন হওয়া উচিত?

আমাদের অধিকাংশ মানুষ রমজানে প্রবেশ করি বছরের পর বছর গাফিলতি, ব্যস্ততা ও নানা ভুল নিয়ে । কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম রহমতে এই শেষ দশ রাতের মধ্যে এমন এক সুযোগ রেখে দিয়েছেন, যা একটি পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারে ।

আল্লাহ তা’আলা বলেন,“লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম ।” (সূরা আল-কদর ৯৭:৩)
হাজার মাস—অর্থাৎ ৮০ বছরেরও বেশি সময়ের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। ভাবুন, একটি রাত—যা পুরো একটি জীবনের ইবাদতের চেয়েও মূল্যবান।

কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, হয়তো লাইলাতুল ক্বদর আসবে, আবার চলে যাবে, আর আমরা তখনো দুনিয়ার ব্যস্ততা, মোবাইল, আলাপ-আলোচনা ও গাফেলতির মধ্যে ডুবে থাকব।

প্রতি বছর আমরা শেষ দশ রাতের ফজিলত সম্পর্কে শুনি । মাত্র কয়েক রাতের জন্য ইবাদতে নমগ্ন হই । কিন্তু রমজান শেষ হলে আবার আগের অভ্যাস ফিরে আসে । আগের গাফেলতি ফিরে আসে। আমাদের জীবনে আল্লাহর সাথে দূরত্ব আবার নীরবে ফিরে আসে।

লাইলাতুল কদর শুধু একটি বিশেষ রাত নয় । এটি এমন এক রাত- যেদিন মানুষের তাকদীর নির্ধারণ করা হয়। যেদিন অগণিত ফেরেশতা অবতরণ করেন। যেদিন ফজর পর্যন্ত শান্তি বিরাজ করে। যেদিনের একটি আন্তরিক মুহূর্ত বহু বছরের গাফেলতিকে ছাপিয়ে যেতে পারে। এমন রাতকে হেলাফেলায় পার করার কোনো সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি নিজেকে নিবেদিত করে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই ।

পড়ুনঃ  ব্যক্তিত্ব বিকাশে ছয়টি অমূল্য নির্দেশনা

ইতিকাফের গুরুত্ব
এই রাতগুলোকে অনুভব করার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি হলো ই’তিকাফ।
অনেকে মনে করেন ই’তিকাফ মানে শুধু মসজিদে থাকা। কিন্তু বাস্তবে ই’তিকাফ হলো—জীবনের কোলাহল থেকে সরে গিয়ে স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলা । কয়েকটি মূল্যবান রাতের জন্য একজন মুমিন কাজের ব্যস্ততা থেকে, মোবাইলের নোটিফিকেশন থেকে, মানুষের সাথে আলাপ থেকে, দুনিয়ার দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যায় । তার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে যায়:
আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা।

হযরত আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) রমজানের শেষ দশ রাতে ই’তিকাফ করতেন, যতদিন না আল্লাহ তাঁর রূহ কবজ করেন।। (বুখারী, মুসলিম)

আজকের পৃথিবীতে মানুষ শান্তি খুঁজতে দূরে ভ্রমণ করে, অনেক টাকা খরচ করে বিভিন্ন নির্জন স্থানে যায়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সেই সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মিক নির্জনতা তাঁর জন্য মসজিদে রেখে দিয়েছেন।

কিয়ামুল লাইল
রমজানের এই রাতগুলো আমাদের আরেকটি মহান ইবাদতের দিকে ফিরিয়ে আনে। তা হলো কিয়ামুল লাইল (রাতের নামাজ)। রাতের নামাজ শুধু রমজানের ছিল না। এটি ছিল সালেহিনদের জীবনের অভ্যাস। ইমাম শাফেয়ী (রহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে তাঁর ছাত্র আল-রাবি বলেছেন—
তিনি রাতে খুব কম ঘুমাতেন, কারণ তিনি দীর্ঘ সময় ইবাদতে কাটাতেন। ইমাম আবু হানিফা (রহিমাহুল্লাহ) অনেক সময় রাতের নামাজে একটি আয়াত বারবার পড়তেন এবং তার অর্থ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন।

এই ইবাদতগুলো ছিল না মানুষের সামনে প্রদর্শনের জন্য। এগুলো ছিল একজন বান্দা ও তাঁর রবের মধ্যকার নিভৃত মুহূর্ত। আজ আমরা অনেকেই এই স্বাদ হারিয়ে ফেলেছি। আমরা শুধু মসজিদের জামাতে নির্ভর করি। যদিও তা অত্যন্ত সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কিয়ামের প্রকৃত মাধুর্য পাওয়া যায় তখন—যখন মানুষ একা, রাতের নীরবতায় আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে যায়।

ইবনু রাজাব আল-হানবালী (রহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) রাতের নামাজে ধীরে ধীরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। যখন রহমতের আয়াত আসত, তিনি আল্লাহর কাছে তা চাইতেন।
যখন শাস্তির আয়াত আসত, তিনি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। এইভাবে তিনি নামাজ, তিলাওয়াত, দোয়া এবং চিন্তাকে একিভূত করতেন। এ ধরনের ইবাদতই হৃদয়কে পরিবর্তন করে।

পড়ুনঃ  ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : দোয়া কীভাবে করবো, কেন করবো

রমজানের শেষ দশ রাত শুধু দীর্ঘ নামাজের জন্য নয়। এগুলো হলো গভীর আন্তরিকতার রাত।
এগুলো হলো আল্লাহর সাথে এমনভাবে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সময়, যা রমজান শেষ হওয়ার পরও আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে ।

কারণ এই রাতগুলো হয়তো আমাদের জীবনে আর কখনো ফিরে আসবে না। আর যদি সত্যিই এগুলো হাজার মাসের চেয়েও উত্তম হয়, তাহলে এই রাতগুলোর প্রতিটি মুহূর্ত অমূল্য।

আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদেরকে এই রাতগুলোর কদর করার তাওফিক দান করেন। আমীন।

শায়খ সৈয়দ আনিসুল হক : সিনিয়র ইমাম, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার। জুমার খুতবা, ৬ মার্চ ২০২৬।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here