Home সম্পাদকীয় স্মৃতির আঙিনায় ঈদের একাল-সেকাল

স্মৃতির আঙিনায় ঈদের একাল-সেকাল

61
0


বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল

মুসলিমদের সবচেয়ে বড় এবং জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব হলো ঈদ। মুসলমানরা প্রতি বছর ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা পালন করে থাকে। ধর্মীয় গাম্ভীর্যের পাশাপাশি ঈদ হয়ে উঠেছে এ দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক অনন্য প্রতীক। তবে সময়ের অমোঘ নিয়মে সবকিছুরই পরিবর্তন ঘটে। ঈদের আনন্দ চিরন্তন হলেও এর উদযাপন পদ্ধতি, মানসিকতা এবং পারিপার্শ্বিকতায় এসেছে ব্যাপক বিবর্তন। আমাদের পূর্বপুরুষদের দেখা সেই অনাড়ম্বর কিন্তু অকৃত্রিম ঈদ আর আজকের এই ডিজিটাল ও যান্ত্রিক যুগের বর্ণিল ঈদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। এই বিস্তর ফারাকের মধ্যে থেকে আমাদের শিশু-কিশোরদের ঈদ হারিয়ে যাচ্ছে। ঈদের যে প্রফুল্লতা এটা তাদের মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে না।

সেকালের ঈদ মানেই ছিল এক বিশাল অপেক্ষার অবসান। বর্তমানের মতো তখন জীবন এত দ্রুতগামী ছিল না। মানুষের হাতে সময় ছিল প্রচুর এবং অন্তরে ছিল ধৈর্য। সেকালে ঈদ কবে হবে, তা জানার জন্য মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল আকাশ। ঈদের বাঁকা চাঁদ দেখার জন্য বাড়ির ছাদে বা খোলা মাঠে মানুষের ভিড় জমে যেত। চাঁদ দেখার পর যে আনন্দধ্বনি উঠত, তা এখনকার ডিজিটাল নোটিফিকেশনের যুগে কল্পনা করা কঠিন। পাড়ায় পাড়ায় ছোটরা বাজি ফোটাত, আনন্দ মিছিল করত। আর রেডিওতে যখন কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গান—‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’—বেজে উঠত, তখন প্রতিটি বাঙালি মুসলিমের হৃদয়ে আনন্দের দোলা দিয়ে যেত। সেই গানটিই ছিল ঈদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।

আমার জন্মস্থান সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভাদেশ্বর ইউনিয়নের নালিউরী গ্রাম। সেখানকার উঁচু-নিচু পাহাড়, টিলা ও সমতল বেষ্টিত গ্রামে ঈদের আনন্দ ছিল অন্যরকম। ঈদ আসলে গ্রামের লোকজনের সাথে দেশ-বিদেশের মানুষের এক মেলবন্ধন ঘটতো। তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ছুটে আসতেন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন ঈদের দিন ঘুম ভাঙত অনেক ভোরে। মা-চাচিদের রান্নার শব্দ আর আতরের ঘ্রাণে চারপাশ ম ম করত। নতুন জামা পরার উত্তেজনায় অনেকেই রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারত না। আমিও পারতাম না। সকাল সকাল পুকুরে বা টিউবওয়েলের ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করা ছিল এক ধরণের আনন্দঘন প্রতিযোগিতা। এরপর গায়ে সুগন্ধি আর চোখে সুরমা মেখে বড়দের সাথে ঈদগাহে যাওয়ার প্রস্তুতি চলত। আমি খুব ছোটবেলায় আমার বাবাকে হারিয়েছি। সেইজন্য সারাজীবন বাবার আদর-স্নেহ এবং ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এই শূন্যতা কখনো পূরণ হবার নয়। যেখানে অন্য শিশুরা তাদের বাবাদের হাত ধরে ঈদগাহে যেতো, সেটা আমার কপালে জুটেনি। কিন্তু আমি একা একা গিয়েও এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। ছোট ছোট টুপি মাথায় দিয়ে সাদা পাঞ্জাবি পরে যখন সারি বেঁধে আমরা শিশুরা যেতাম, তখন মনে হতো যেন একঝাঁক সাদা বক হেঁটে যাচ্ছি। নামাজ শেষে একে অপরের সাথে কোলাকুলি করা এবং পরিচিত বড়দের কদমবুসি (পায়ে হাত দিয়ে সালাম) করা ছিল অবধারিত রীতি। এগুলো করে আমরা বেশ আনন্দ লাভ করতাম। বর্তমান সময়ের শিশুরা সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত-ই হচ্ছে বলা যায়। কারণ, তাদের মধ্যে যে আনন্দ-উচ্ছলতা তা আমরা দেখতে পাই না।

পড়ুনঃ  লিবিয়ার নির্বাচনে ইজরায়েল ফ্যাক্টর

আমাদের সময়ে ঈদের আসল আকর্ষণ ছিল ‘সালামি’। নামাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পর থেকেই শুরু হতো সালামি আদায়ের মিশন। দাদা-দাদি, নানা-নানি আর চাচা বড় ভাইদের ঘিরে ধরত একদল খুদে বাহিনী। তখন দুই টাকা বা পাঁচ টাকার চকচকে নতুন নোট পাওয়া মানেই ছিল হাতে চাঁদ পাওয়া। সেই টাকা খরচ করার চেয়ে গুনে রাখা এবং কার কত হলো তা নিয়ে গর্ব করার মধ্যেই ছিল সার্থকতা। মাটির ব্যাংক বা টিনের কৌটোয় সেই মহামূল্যবান সম্পদ জমা করে রাখা হতো। সেকালে ঈদের দিন ছোটদের কোনো ঘরবাড়ি ছিল না; পুরো গ্রাম বা পাড়াটাই ছিল তাদের। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে দলবেঁধে ঢুঁ মারা, সেমাই আর ফিরনি খাওয়া ছিল প্রধান কাজ। কোনো লৌকিকতা বা দাওয়াতের প্রয়োজন হতো না। ‘ঈদ মোবারক’ বলে চিৎকার করে ঘরে ঢোকা আর চিনি-সেমাইয়ের স্বাদ নেওয়া—এই ছিল বাঁধভাঙ্গা আনন্দ।

বিকেলের দিকে খোলা মাঠে বসত ঈদের মেলা। সেই মেলায় মাটির পুতুল, টিনের গাড়ি, বাঁশি, বেলুন আর নাগরদোলার আকর্ষণ ছিল অপ্রতিরোধ্য। সালামির টাকা দিয়ে কাঠের তলোয়ার কিংবা মাটির ব্যাংক কেনা ছিল শিশুদের অন্যতম বড় উৎসব। সেই বাঁশির প্যাঁ-প্যাঁ শব্দে যখন চারপাশ মুখরিত হতো, তখনই বোঝা যেত আজ ঈদ। ঈদের বিকেলে খোলা মাঠে ফুটবল বা হা-ডু-ডু খেলার আয়োজন থাকত। ছোটরা বড়দের খেলা দেখত অথবা নিজেরাই এক কোণে মেতে উঠত গোল্লাছুট বা লুকোচুরি খেলায়। আজকের মতো এসি রুমে বসে ভিডিও গেম নয়; বরং ঘাম ঝরিয়ে দৌড়ঝাঁপ করাই ছিল সেকালের বিনোদনের মূল রসদ। আমি আমার ছোট বন্ধুদেরকে নিয়ে মারবেল দিয়ে খেলতাম। এই স্মৃতিগুলো আমার চোখে জ্বলজ্বল করে ভাসছে।

সেকালের শিশুদের ঈদের আনন্দ ছিল খুবই সাধারণ জিনিসের মাঝে সীমাবদ্ধ, কিন্তু তার গভীরতা ছিল অনেক বেশি। তাদের মধ্যে কোনো ক্লান্তি ছিল না, ছিল না কোনো কৃত্রিমতা। এই ক্লান্তিহীনতা এবং কৃত্রিমতাবর্জিত ঈদ-ই আমরা উপভোগ করেছি। আমরা একে অপরের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার যে শিক্ষা সেই মেঠো পথের ঈদ থেকে পেতাম, তা আজকের যান্ত্রিক যুগে অনেকটা দুর্লভ হয়ে পড়েছে। সেই সোনালী দিনের ঈদ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আনন্দ আসলে দামী পোশাকে নয়; বরং মনের মিলনেই নিহিত।

সেকালে ঈদের কেনাকাটা শুরু হতো রোজার মাঝামাঝি থেকে। এখনকার মতো হাজারো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিং মল বা দেশ-বিদেশের ব্র্যান্ডের আইটেম তখন ছিল না। মানুষ স্থানীয় ছোট বাজারে যেত। আমিও আমার মায়ের সাথে স্থানীয় বাজারে কাপড় কিনতে যেতাম। কাপড় কিনে দরজির দোকানে দেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইন লাগত। লংক্লথ, ভয়েল বা পপলিন কাপড়ের নতুন জামা পাওয়াটাই ছিল তখন বড় ভাগ্যের ব্যাপার। পাঞ্জাবি বা শার্টের হাতা বা কলারে সামান্য লেস বা এমব্রয়ডারি থাকলেই শিশুরা খুশিতে আত্মহারা হতো। নতুন জুতো কিনে তা বালিশের নিচে রেখে ঘুমানোর যে নির্মল আনন্দ, তা আজ দামি ব্র‍্যান্ডের জুতোর ভিড়ে হারিয়ে গেছে। এছাড়া নতুন কাপড় আমরা কখনোই কাউকে দেখাতাম না এই ভেবে যে, আমাদের ঈদের কাপড় পুরনো হয়ে যাবে।

পড়ুনঃ  রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ ঃ এ যুদ্ধ থামাবার কোন নৈতিক শক্তি কী বৃটেন ও আমেরিকার আছে?

সেকালে ঈদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘ঈদ কার্ড’। প্রিয়জনকে হাতে লিখে শুভেচ্ছা জানানোর সেই ঐতিহ্য ছিল অত্যন্ত গভীর। ডাকপিয়ন যখন ব্যাগে করে রঙিন কার্ড নিয়ে আসত, তখন ঘরে ঘরে উৎসব পড়ে যেত। কার্ডে আঁকা থাকত মসজিদ, ফুল বা কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য। নিজের হাতে কবিতা বা শুভেচ্ছা লিখে পাঠানোর মধ্যে যে প্রাণের ছোঁয়া ছিল, তা আজকের কপি-পেস্ট করা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।

সেকালে ঈদের খাবার মানেই ছিল মা-চাচিদের হাতের জাদু। আধুনিক ক্যাটারিং বা রেস্টুরেন্টের খাবারের চল তখন ছিল না। ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই বাড়িতে সেমাই তৈরির ধুম পড়ত। রোদে শুকিয়ে রাখা হতো হাতে কাটা সেমাই। ঈদের সকালে সেই সেমাইয়ের ঘ্রাণে ম ম করত চারপাশ। গুড়ের সন্দেশ, ননের বড়া, নারিকেলের নাড়ু, ছাঁচে তৈরি পিঠা আর খই-মুড়ির সমারোহ থাকত প্রতিটি বাড়িতে। মেহমান এলে সবার আগে হাতে তৈরি মিষ্টি ও পিঠা দেওয়া হতো। তখন রান্নায় আজকের মতো প্যাকেটজাত মশলা ব্যবহার করা হতো না। পাটায় বাটা মশলায় রান্না করা খাসি বা গরুর মাংসের যে স্বাদ, তা এখনকার ফ্রোজেন বা ক্যানড ফুডে মেলা ভার। বাড়ির উঠোনে লাকড়ির চুলা বানিয়ে বড় হাঁড়িতে পোলাও রান্নার সেই দৃশ্য আজ শুধুই স্মৃতি।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ঈদের ধারণা আমূল বদলে গেছে। এখন ঈদ মানে অনেকটা প্রদর্শন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কন্টেন্ট তৈরির উপলক্ষ। এখন আর কেউ দরজির দোকানের ঝামেলার জন্য অপেক্ষা করতে চায় না। রোজার মাস শুরু হওয়ার আগেই মানুষ অনলাইনে অর্ডার দেয়। নামি-দামি ব্র‍্যান্ডের ‘আউটফিট’ না হলে যেন ঈদই হয় না। ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানি সিরিয়ালের অনুকরণে পোশাকের নাম রাখা এবং তা পাওয়ার জন্য মরিয়া হওয়া বর্তমান সময়ের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। শপিং মলগুলোতে এখন মানুষের ঢল নামে শুধু কেনাকাটার জন্য নয়; বরং সেলফি তোলা আর চেক-ইন দেওয়ার জন্য।

একালে সালামি দেওয়ার পদ্ধতিতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। আগে বড়দের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে নতুন নোটের যে সালামি নেওয়া হতো, তার মধ্যে এক ধরণের দোয়া ও আশীর্বাদ ছিল। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ‘বিকাশ’ বা ‘নগদ’। কিন্তু তখনকার সময়ে আমরা বড়দের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে যে প্রশান্তি পেতাম, এটা বোধহয় বর্তমান প্রজন্ম ভাবতেও পারবে না। আবার ছোটদের প্রতি বড়দের যে দায়বদ্ধতা ছিল, সেটাও এখন পরিলক্ষিত হয় না। দূর প্রবাসে বা অন্য শহরে থাকা আত্মীয়কে ই-সালামি পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হচ্ছে। আবার অনেকেই সালামি দিচ্ছে না। শুভেচ্ছা বিনিময়ের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত ছোঁয়ার চেয়ে ফরওয়ার্ড করা মেসেজ বা ফেসবুকের গ্লোবাল পোস্ট এখন বেশি জনপ্রিয়।

একালের ঈদের একটি বড় ট্রেন্ড হলো ভ্রমণ। মানুষ এখন ঈদের ছুটিতে নাড়ির টানে বাড়ি যাওয়ার চেয়ে কক্সবাজার, সাজেক কিংবা বিদেশে ঘুরতে যাওয়া বেশি পছন্দ করে। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করতে মানুষ নিরিবিলি কোনো রিসোর্ট বেছে নেয়। অথচ আমরা ঈদের সময় চলে যেতাম খালার বাড়ি, নয়তো ফুফুর বাড়ি। আবার কখনো কখনো মামার বাড়ি। সেখানে গিয়ে খালাতো, মামাতো, ফুফাতো ভাই-বোনদের সাথে যে খুনসুটি হতো, সেই দিনগুলো এখনো মিস করি। এই জিনিসগুলো না থাকার কারণে পারিবারিক পুনর্মিলনের যে মূল উদ্দেশ্য ছিল, তা অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। শহুরে ফ্ল্যাট কালচারে পাশের দরজার প্রতিবেশীর সাথেও অনেক সময় ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় হয় না। এখানে একটি দুঃখের কথা না বলে পারছি না যে, শহরে কালচারে থাকা অনেক প্রতিবেশী তাদের নিজস্ব প্রতিবেশীর পরিচয় পর্যন্তও জানে না। সেখানে শুভেচ্ছা বিনিময় আশা করাতো একেবারে বোকামি!

পড়ুনঃ  ঈদ মোবারক : ঈদ নিয়ে ইদুরামি বন্ধ হোক

সেকালে ঈদ ছিল সর্বজনীন। পাড়ার ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ত। আমাদের ঈদগাহটি ছিল টিলার উপরে। পাশেই রয়েছে আমাদের পারিবারিক কবরস্থান। ঈদের নামাজ আদায় করে স্বজন-সুজনদের সাথে কোলাকুলি শেষে কবর জিয়ারত করতাম। এর মধ্যে যে অন্যরকম তৃপ্তি এবং আনন্দ পেতাম, সেটা আজকের মানুষজন পায় কি না সন্দেহ আছে। সে সময় সবাই একে অপরের বাড়িতে অবাধে যাতায়াত করত। কোনো ফরমালিটির বালাই ছিল না। কিন্তু একালের ঈদে এক ধরণের লৌকিকতা কাজ করে। কার পোশাক কত দামি, কার খাবারের মেনু কত রাজকীয়—এই প্রতিযোগিতা এখন প্রকট। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আমরা বিদেশের মাটিতে থাকা প্রিয়জনের সাথে ভিডিও কলে সরাসরি ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারি। এটি একালের এক বিশাল আশীর্বাদ। আবার এখনকার তরুণ প্রজন্ম ঈদের বাজেট থেকে অর্থ বাঁচিয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে সংস্কৃতি চালু করেছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে।

ঈদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ত্যাগ এবং সংযম। সেকালে মানুষ রোজা এবং ইবাদতের প্রতি যতটা মনোযোগী ছিল, আধুনিক যুগে এসে কেনাকাটা আর বিনোদনের জোয়ারে তা কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবুও ঈদের জামাতে যখন লাখো মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই পুরনো সাম্যের দৃশ্যটিই ফিরে আসে। কিন্তু আমাদের সময়কার ঈদ উৎসবের মাঝে এখনকার সময়কে মেলাতে পারি না। মনে হয়, কোথাও যেন বেশ ব্যবধান পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটা যেমন ছোটদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, তেমনই বড়দের ক্ষেত্রেও। ঈদের যে মূল শিক্ষা—সৌহার্দ্য এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন থেকে আমরা ছিটকে পড়ছি ক্রমশ। মনে হচ্ছে, এ থেকে উত্তরণের আর কোনো পথ খোলা নেই আমাদের।

ঈদের সেকাল আর একালের মধ্যে যে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা আসলে সভ্যতারই প্রতিফলন। আমরা চাইলেই সেই দিনগুলোকে হুবহু ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু সেই দিনের মূল চেতনা—অকৃত্রিম ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধ—তা আমরা হৃদয়ে ধারণ করতে পারি। আধুনিকতার চাকচিক্য থাকবে, কিন্তু তার মাঝে যেন আমাদের শেকড় হারিয়ে না যায়। ঈদের প্রকৃত সার্থকতা তখনই হবে, যখন আমাদের আনন্দের ভাগিদার হবে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ, যেমনটা হতো আমাদের শৈশবের সেই ফেলে আসা ‘সেকালের’ দিনগুলোতে।

লেখক : প্রকাশক,প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here