জেরেমি বোয়েন (ছদ্মনাম), তেহরান থেকে
যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন অধিকাংশ পশ্চিমা গণমাধ্যম সীমান্ত এলাকা থেকে প্রতিবেদন করছিল। কিন্তু আমি তেহরানের ভেতরে থেকে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যা প্রত্যক্ষ করেছি, তা ওয়াশিংটনের পেন্টাগন বা হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংয়ের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে ইরানের বিরুদ্ধে এই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের নির্দেশ দিলেন, তিনি হয়তো ভেবেছিলেন এটি একটি ‘কুইক উইন’ বা দ্রুত বিজয় হবে। কিন্তু আমি যা দেখছি, তাতে স্পষ্ট—এই যুদ্ধই হবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমাধিস্থল।
১. প্রতিরোধের জাতীয়তাবাদ: যা ট্রাম্প বুঝতে ভুল করেছেন
হোয়াইট হাউসের ধারণা ছিল, ইরানের ওপর ক্রমাগত ড্রোন এবং মিসাইল হামলা চালালে দেশটির সাধারণ মানুষ বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রথম মিসাইলটি তেহরানে পড়ার সাথে সাথেই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভেদ উধাও হয়ে গেছে। আমি বাজারে, হাসপাতালে এবং ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেছি। যারা আগে সরকারের সমালোচক ছিল, তারাও এখন হাতে বন্দুক তুলে নিচ্ছে ‘বিদেশি আগ্রাসন’ রুখতে। ট্রাম্পের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতি এখানে ‘ম্যাক্সিমাম ইউনিটি’ তৈরি করেছে।
২. সামরিক চোরাবালি এবং ‘অদৃশ্য’ শত্রু
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দাবি করেছিল যে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্থলপথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলেই মার্কিন সেনারা যে গরিলা যুদ্ধের মুখে পড়ছে, তা ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানকেও হার মানাবে। ইরানের ভূখণ্ড পাহাড় এবং মরুভূমিতে ঘেরা, যা রক্ষণাত্মক যুদ্ধের জন্য আদর্শ। ট্রাম্পের যুদ্ধ জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালীতে যেভাবে ঝুঁকির মুখে রয়েছে, তাতে মার্কিন নৌবাহিনীর মনোবল ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
৩. বিশ্ব অর্থনীতির পতন ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ
তেহরানের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি যখন এই রিপোর্ট লিখছি, তখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এবং অর্থনীতি চাঙা করা। কিন্তু যুদ্ধের ফলে আমেরিকার সাধারণ মানুষ এখন গ্যালন প্রতি গ্যাসের দাম দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি ট্রাম্পের নিজের সমর্থকদের (মাগা বেস) পকেটে আঘাত করছে। মানুষ এখন প্রশ্ন করতে শুরু করেছে—কেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্য একটি অন্তহীন যুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করা হচ্ছে?
৪. মিত্রহীন আমেরিকা
যুক্তরাজ্যের মাটিতে আমি দেখেছি মানুষ যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে। ব্রিটিশ সরকার এবার ট্রাম্পের এই হঠকারী যুদ্ধে পা মেলাতে রাজি হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটো মিত্রদের বড় একটি অংশ এই সংঘাত থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে। আমি তেহরানে রাশিয়ার এবং চীনের কূটনীতিকদের তৎপরতা দেখেছি, যারা পর্দার আড়ালে ইরানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প এখন কেবল আন্তর্জাতিকভাবেই একা নন, বরং নিজের দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথেও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন।
৫. ট্রাম্পের ‘ইগো’ বনাম কঠিন বাস্তবতা
ট্রাম্প সবসময় নিজেকে একজন ‘ডিল মেকার’ হিসেবে দাবি করেন। কিন্তু ইরানে তিনি এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন যেখানে কোনো পক্ষই আপস করার জায়গায় নেই। ইরান সরকার জানে যে আত্মসমর্পণ মানেই ধ্বংস, আর ট্রাম্প জানেন যে পিছু হটা মানেই নির্বাচনে পরাজয়। এই যে একগুঁয়েমি, এটিই ট্রাম্পকে এমন এক অন্ধগলিতে নিয়ে গেছে যেখান থেকে বিজয়ী হয়ে ফেরা অসম্ভব।
উপসংহার: তেহরানের আকাশে যখন সাইরেন বাজে, তখন আমি মানুষের চোখে ভয় নয়, বরং এক ধরনের জেদ দেখতে পাই। ট্রাম্প হয়তো আরও শহর ধ্বংস করতে পারবেন, কিন্তু তিনি এই দেশটিকে জয় করতে পারবেন না। আর এই সামরিক ব্যর্থতা যখন মার্কিন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছাবে, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য হোয়াইট হাউসের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।




