Home Uncategorised লোকজ উৎসব ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের রাজনীতি

লোকজ উৎসব ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের রাজনীতি

14
0


১. সংস্কৃতির আবরণে রাজনীতির অনুপ্রবেশ
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বিভিন্ন লোকজ উৎসবগুলোর অবস্থান বেশ মজবুত। বিগত প্রায় তিন দশক যাবৎ এই সব লোকজ উৎসবকে ঘিরে মিডিয়া, রাষ্ট্রযন্ত্র এবং একটি নির্দিষ্ট সুশীল গোষ্ঠী ব্যাপক আয়োজন করে। মিডিয়া ও সাংস্কৃতির আধুনিকায়নের এই যুগে উপরোক্ত লোকজ সংস্কৃতি যতটা না মানুষের আবেগ ও অনুভূতিতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে; ততটাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
এই লোকজ উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎসব হলো “পহেলা বৈশাখ”। দেশে জনগণের মধ্যে প্রতিবছরই এই নববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে প্রবল মেরুকরণ তৈরি হয়। এই মেরুকরণ নিছক সাংস্কৃতিক পার্থক্যের ফল নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক, ঔপনিবেশিক এবং শ্রেণীগত অভিপ্রায়। একইভাবে বাংলাদেশের অন্যান্য লোকজ উৎসবগুলোও ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামোয় বন্দী হয়ে পড়েছে এবং বৃহত্তর ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর অনুভূতি ও ইচ্ছাকে পদদলিত করে একটি সংখ্যালঘু সাংস্কৃতিক এলিটের ইচ্ছামতো পরিচালিত হয়ে আসছে।
পোস্ট-কলোনিয়াল চিন্তাপদ্ধতির কাঠামো থেকে বিবেচনা করলে পহেলা বৈশাখ একটি ঔপনিবেশিক ফেনোমেনা। আধুনিক পহেলা বৈশাখ প্রথম পালিত হয় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সেই বছর পহেলা বৈশাখে গৃহকীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। একই রকম আয়োজন করা হয়েছিল ১৯৩৮ সালেও।¹ সেই সাথে জমিদারী শোষণ-নিপীড়নেরও একটা ঐতিহ্য এর সাথে জড়িত। অথচ আজ এই দিনটিকেই সর্বজনীন, সর্বকালের এবং সকলের উৎসব বলে চালানো হচ্ছে।
২. হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির মিথ
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বরকন্দাজ ও সুশীল মিডিয়া প্রায়শই “হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি”র কথা বলে। কিন্তু এই দাবির কোনো ঐতিহাসিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি নেই। অতীতে বৃহত্তর বাংলা কখনো রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিল না। রাজা শশাঙ্ক ও বৌদ্ধ পাল শাসকরা একক রাজ্য গঠনের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন।
চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝিতে সর্বপ্রথম পুরো বাংলাকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করেন শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ। তিনি তাঁর রাজ্যকে নামকরণ করেন “সালতানাত-এ-বাঙ্গালাহ” এবং নিজে “শাহ-ই-বাঙ্গালাহ” উপাধি ধারণ করেন। ইলিয়াস শাহের আগে কদাচিৎ “বং” বা “বঙ্গাল” শব্দের ব্যবহার হলেও তার মধ্যে রাজনৈতিক বা জাতিগত তাৎপর্য ছিল না। সুতরাং বাঙালি জাতির ইতিহাস সাতশত বছরকে অতিক্রম করে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।
“যেই “বাঙালি” ক্যাটাগরিটি আরোপনমূলক, যেখানে বাংলায় কথা বললেই বাঙালি হওয়া যায় না, বিশেষ আরোপিত এলিট বৈশিষ্ট্যসূচক হতে হয়, এই যে বাঙালিপনা তৈরি হয়েছে, এটা হল স্পেসিফিক, এটা হল এলিট, এটা হল বিশেষভাবে বিশুদ্ধ। এই ধরনের “বাঙালি” হাজার বছরেরও নয়, আবহমানও নয়। বরং স্পেসিফিকলি নাইনটিন সেঞ্চুরির কলোনিয়াল বেঙ্গলে উৎপাদিত।” — অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়²
অর্থাৎ হাজার বছরের নামে যে সংস্কৃতি সুশীল-প্রগতিশীল গোষ্ঠীর চর্চায় বিকশিত হয়, তা আদতে বিগত দুইশত বছরের ঔপনিবেশিক সিলসিলা। এটি কলকাতার বর্ণহিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণীর নির্মিত একটি আইডেন্টিটি-প্রজেক্ট, যা পরবর্তীতে পাকিস্তানবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের হাত ধরে বাংলাদেশে আমদানি করা হয়েছে।
৩. পহেলা বৈশাখ: ঔপনিবেশিকতার পণ্য
“বাঙালি সংস্কৃতি”র অন্যতম আইকন পহেলা বৈশাখও ঔপনিবেশিক আমলে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা একটি আচার। ব্রিটিশদের বর্ষবরণের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের সংস্কৃতিবান প্রমাণ করতে কলকাতার বর্ণহিন্দুদের “পহেলা বৈশাখ” নামের এই আচার তৈরি করতে হয়েছিল। যদিও মুঘলদের ইরানি ঐতিহ্য নওরোজের সাথে এর একটি যোগসাজশ আছে বলে দাবি করা হয়।
এবিষয়ে বাংলাপিডিয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে কৃষিকাজের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন করেন। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে প্রবর্তিত এই সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল, পরে ‘বঙ্গাব্দ’ নামে পরিচিত হয়। আকবর তাঁর রাজকীয় জ্যোতির্বিদ ফতুল্লাহ শিরাজীকে এই নতুন পঞ্জিকা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আবার কোথাও কোথাও বলা হয়েছে আকবরের আমলে প্রজারা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা পরিশোধ করতেন, আর পহেলা বৈশাখে জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টান্ন বিতরণ ও আপ্যায়ন করতেন। এভাবেই একটি উৎসবের সূচনা হয়। হালখাতার প্রচলনও এই সময় থেকেই। তবে বাংলা পঞ্জিকার উৎপত্তি নিয়ে দ্বিমতও আছে। কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন সপ্তম শতাব্দীর রাজা শশাঙ্কের সময় থেকেই বঙ্গাব্দ গণনার সূচনা, কারণ আকবরের বহু আগে নির্মিত শিব মন্দিরে ‘বাংলাব্দ’ শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়।
মূল কথা হলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে যে হিন্দু জমিদার-সুদখোর শ্রেণী ক্ষমতাসীন হয়েছিল, তারাই পহেলা বৈশাখে আমোদ-ফুর্তি করত ও মেলা বসাত। জমিদারীর কশাঘাতে জীর্ণ কৃষকদের জন্য দিনটি ছিল খাজনা আদায় ও বার্ষিক সুদের হিসাব মেলানোর দিন। এই শ্রেণীগত বাস্তবতা আড়াল করেই আজ দিনটিকে “সর্বজনীন” বলে প্রচার করা হচ্ছে। আর পান্তা-ইলিশ খাওয়া কোনো অতীত রেওয়াজ নয়, বরং অতি-সাম্প্রতিক নির্মিত একটি চর্চা।
আজকের দিনের সংগঠিত ও তথাকথিত সর্বজনীন রূপটি এসেছিল ঢাকায়, বাম সংগঠন ছায়ানটের হাত ধরে। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ছায়ানট রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করে। প্রথম অনুষ্ঠানটি হয়েছিল রমনা উদ্যানে পঞ্চবটীর নিচে, ১৩৭৪ বঙ্গাব্দের প্রথম প্রভাতে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন বিচারপতি মাহবুব মুর্শেদ, ডক্টর গোবিন্দচন্দ্র দেব, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতো বামবুদ্ধিজীবীরা এবং ঢাকার একদল সংস্কৃতিকর্মীরা এই উদ্যোগে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পটভূমিতে ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীন কতৃক রবীন্দ্রসংগীত নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদেই মূলত ছায়ানট এই আয়োজনের সূচনা করে। সেই থেকে রমনার বটমূল বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের তথাকথিত প্রতীক হয়ে ওঠে।
৪. জাতীয়তাবাদ, ইসলাম-বিরোধিতা ও সাংস্কৃতিক হাতিয়ার
ওই ক্রমধারায় পহেলা বৈশাখকে ব্যাপক পরিসরে সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে মূলত ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময়, সেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ যা নিজেও ঔপনিবেশজাত। পহেলা বৈশাখকে সেসময় ঠাহর করা হয়েছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক হাতিয়ার হিসেবে। কিন্তু এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আসল অভিপ্রায় ছিল পূর্ব বাংলার বৃহত্তর জনমানুষের জীবনযাপনের সাথে মিশে যাওয়া ইসলামী মূল্যবোধ ও চিহ্নকে “অপর” (other) হিসেবে সাব্যস্ত করা। এ বিষয়ে ফাহমিদ-উর-রহমান লিখেছেন: “ঐতিহাসিক কারণে এই বাঙালি পরিচয় ষাটের দশকে বাঙালি মুসলমানের এক সময়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফসল পাকিস্তানকেই প্রতিপক্ষ বানায় এবং পাকিস্তানের সাথে সংশ্লিষ্ট ইসলাম-মুসলমান পরিচয়কে ছুঁড়ে ফেলতে উদ্যত হয়।”³
এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনে কলকাতা ছিল ত্রাতার ভূমিকায়। অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম লিখেছেন, এ প্রজন্মের মধ্যে ধর্ম ও ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতি সম্পর্কে উন্নাসিকতা বেশি ছিল এবং তারা প্রায় বাছবিচারহীনভাবে কলকাতার সাংস্কৃতিক উৎপাদনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন।⁴ ফলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বয়ানের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি কলকাতা-কেন্দ্রিক হিন্দু রিভাইভালিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি।
৫. “বাঙালি” বর্গে মুসলমানের অনুপস্থিতি
উনিশ শতকে কলকাতায় বর্ণহিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণীর ডিসকোর্সে যে “বাঙালি” পরিচয় ও সংস্কৃতি নির্মিত হয়, তার মধ্যে মুসলমানরা অনুপস্থিত ছিল। “বেঙ্গল রেনেসাঁস” (যা কার্যত হিন্দু রিভাইভালিজম) বলে যে ফেনোমেনা ঔপনিবেশিক কলকাতায় সম্পন্ন হয়েছিল, তার রথী-মহারথীদের বয়ানে “বাঙালি” বর্গের মধ্যে “মুসলমান” ছিল গরহাজির।
তাদের বয়ানে মুসলমান কখনো “বাঙালি” হতে পারে না, কিন্তু বাঙালি মাত্রই “হিন্দু”। এজন্যই শরৎচন্দ্রের উপন্যাস শ্রীকান্তে “বাঙালি” আর “মুসলমান” ছেলেদের মধ্যে ফুটবল খেলার আয়োজন করা হয়—”হিন্দু” আর “মুসলমান” ছেলেদের মধ্যে নয়। বঙ্কিমচন্দ্রের “বাঙালি” আবিষ্কারেও “সবচেয়ে নিচু স্তরের” বাঙালি হল “বাঙালি মুসলমান”। অধ্যাপক আল-মামুনের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে চমৎকারভাবে স্পষ্ট করে। তিনি লিখেছেন: “কলকাতায় আমি যে বাড়িতে থাকতাম সেই বাড়ির মালিক ছায়া বৌদি আমাকে বলতেন, মামুন, তোমার খাবারদাবারের অভ্যাস তো দেখছি বাঙালিদের মতো। আমি তাজ্জব হয়ে বলতাম, আচ্ছা। …জলজ্যান্ত আমরা উপস্থিত আছি, বাংলায় কথা বলছি, আমার চৌদ্দপুরুষ বাঙালি, কিন্তু তিনি আমাদের “বাঙালি” হিসেবে চিনতে পারতেন না। এরকম অভিজ্ঞতা আমার বারবার হয়েছে। কলকাতায় এখনো এই মতটিই প্রবল যে বাঙালি মানে আবশ্যিকভাবেই হিন্দু।”⁸ অধ্যাপক আল-মামুন আরও বলেছেন, “বাংলাদেশে বাঙালি বনাম মুসলমান বাইনারিকে চাগিয়ে রাখতে ও বলবান করতে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের চিহ্ন হিসেবে কলকাতা এখনো অবদান রেখে চলেছে।”⁷
৬. সর্বজনীনতার মিথ্যা রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ
দেশের সাংস্কৃতিক বরকন্দাজ ও সুশীল মিডিয়া পহেলা বৈশাখকে হাজির করে “সর্বজনীন” হিসেবে। কিন্তু “বাঙালি” বর্গের মধ্যে বাংলাদেশের আপামর বাংলাভাষীকে অন্তর্ভুক্ত করে বিবেচনা করলে পহেলা বৈশাখকে “সার্বজনীন” হিসেবে প্রচার করা একটি আরোপনমূলক লোকজ ফ্যাসিস্ট কারবার।
যেখানে দেশের অতি ক্ষুদ্র কালচারাল এলিট গোষ্ঠী, জনগণের সাথে যাদের বাস্তব সম্পৃক্ততা নেই, শুধুমাত্র তারাই এর উদযাপনকে আবশ্যিক হিসেবে বিচার করেন। অন্যদিকে, বিপরীতে দেশের বিশাল সংখ্যক ইসলামপ্রিয় জনতা সচেতনভাবে নববর্ষ উদযাপনে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখেন। এছাড়া অধিকাংশ জনগণ সক্রিয় বিরোধিতা না করলেও নববর্ষ উদযাপন ও তার নানান চর্চা থেকে বিযুক্ত থাকে।
তাহলে যে চর্চার মধ্যে দেশের অধিকাংশ জনগণের অংশগ্রহণ নেই, সেটাকে “জাতীয় বা সর্বজনীন সংস্কৃতি” বলে চালিয়ে দেওয়ার রাজনীতিটা কী? মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ফরহাদ মজহার এই রাজনীতি সম্পর্কে বলেছেন: “নিজের শ্রেণী আধিপত্য বজায় রাখার জন্যই “বাঙালির নববর্ষ” নামক একটা বয়ান পরজীবী শ্রেণীকে বানাতে হয়েছে। তারা বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না। …বাংলা নববর্ষ বাঙালির সর্বজনীন সংস্কৃতি দাবি করার নগদ লাভ হচ্ছে, যারা নিজেদের শুধু বাঙালি মনে করেন না বা বাঙালিয়ানার আড়ালে বিশেষ শ্রেণী বা গোষ্ঠীর মতলব বোঝেন, তাদের সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিকভাবে কাবু করার জন্যও এটা বেশ শক্ত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।”⁶
কাজেই নববর্ষ উদযাপনকে “সার্বজনীন” আকারে হাজির করা আদতে “কালচারাল ফ্যাসিজম”-এর প্রকাশ। এটি একটি ক্ষুদ্র শ্রেণীর সাংস্কৃতিক একনায়কতন্ত্র, যা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়ে আসছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মূল্যবোধকে অস্বীকার করে চলেছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতার রূপ নেয়। সরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রায়ত্ত মিডিয়া সম্পূর্ণ সরকারি সম্পদ ব্যয় করে এই উদযাপনকে “জাতীয়” চরিত্র দেয়। কোনো শিক্ষার্থী বা কর্মী যদি ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কারণে এতে অংশ না নিতে চাইত, তার জন্য কোনো বিকল্প ছিল না। এই রাষ্ট্রীয় চাপিয়ে দেওয়া কেবল পহেলা বৈশাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না — একই প্যাটার্নে পরিচালিত হয়েছে বিভিন্ন “সাংস্কৃতিক” কার্যক্রম, যেখানে অংশগ্রহণ না করলে “মৌলবাদী” বা “মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী” তকমা দেওয়া হতো। এটি একটি ক্লাসিক ফ্যাসিবাদী কৌশল — সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক আনুগত্যের মানদণ্ড বানানো।
৭. মঙ্গল শোভাযাত্রা: ধর্মীয় প্রতীকের রাজনৈতিক অস্ত্রায়ন
মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা প্রগতিশীল মিডিয়া ব্যাপকভাবে করে আসছে। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। ১৯৮৫ সালে যশোরে সর্বপ্রথম সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে “শোভাযাত্রা” পালিত হয়েছিল। শোভাযাত্রাটির আয়োজন করেছিল যশোরের চারুপীঠ আর্ট ইনস্টিটিউট। মূল উদ্যোক্তা হিসেবে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ভাস্কর মাহবুব জামাল শামীম। সাথে ছিলেন শিল্পী হিরন্ময় চন্দ্র ও প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা। চারুপীঠের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন আবদুল হাসিব। সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে ছিলেন দুই তরুণ শিল্পী মাহবুব জামিল আর হিরন্ময় চন্দ — দুজনই ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে সবে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন। সব কাজে সর্বক্ষণ লেগে থাকতেন সৈয়দ মাহমুদ আলী। অধ্যাপক আবদুল নঈম, বিমল রায় চৌধুরী, কাজী রবিউল হক প্রমুখ পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, এই চারুপীঠ গড়ে উঠেছিল শিল্পী এস এম সুলতানের অনুপ্রেরণায়। অর্থাৎ বাংলাদেশের অন্যতম মহান চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের সাংস্কৃতিক দর্শন এই আন্দোলনের পেছনে অপ্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছিল।
পরবর্তীতে ১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ প্রতি বছর শোভাযাত্রার আয়োজন করে আসছে। শুরুতে “আনন্দ শোভাযাত্রা” বলা হলেও পরে এর নাম দেওয়া হয় “মঙ্গল শোভাযাত্রা”। মাত্র চার দশক আগে চালু হওয়া এই শোভাযাত্রাকে হাজার বছরের সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে — এটি ইতিহাস বিকৃতির একটি প্রকট উদাহরণ।
মঙ্গল শোভাযাত্রায় ক্রমাগত প্যাঁচা, বাঘ, সিংহ, ইঁদুর, হাতি, হাঁস এবং এই জাতীয় পৌত্তলিক হিন্দু ধর্মীয় প্রতীকসমূহের প্রতিকৃতিকে শোভাযাত্রার অত্যাবশ্যকীয় প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। হিন্দু দেবদেবীর বাহন ও প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই প্রাণীগুলি একজন মুসলমানের কাছে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত আপত্তিকর। মঙ্গল শোভাযাত্রার গায়ে চড়ানো হয়েছে “মৌলবাদ”-বিরোধিতার চাদর। কিন্তু এদেশের প্রগতিশীলতায় “মৌলবাদ” বলতে ইসলামী চর্চা, চিন্তা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধকেই বোঝানো হয়ে থাকে।⁹ ফলে শোভাযাত্রায় অংশ না নেওয়া মানেই “মৌলবাদী” হওয়া — এই সমীকরণ দেশের কোটি কোটি মুসলমানকে তাদের নিজ দেশে সাংস্কৃতিকভাবে “অপর” বানিয়ে দিয়েছে।
কলকাতার প্রগতিশীল পত্রিকা আনন্দবাজারও মঙ্গল শোভাযাত্রাকে চিত্রিত করে “মৌলবাদের মোকাবেলা” হিসেবে।¹⁰ এই মূল্যায়ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ — কারণ বঙ্কিমের আনন্দমঠ উপন্যাস যে মুসলিম-বিরোধী মানসিকতার ফসল, আনন্দবাজার পত্রিকা সেই মানসিকতারই বাহক।¹¹ ২০১৬ সালে ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে “Intangible Cultural Heritage of Humanity” হিসেবে তালিকাভুক্ত করে এবং এই স্বীকৃতিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি একটি সাংস্কৃতিক আচারের ধর্মীয় চরিত্রকে পরিবর্তন করে না। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশে হিন্দু পৌরাণিক প্রতীকসমৃদ্ধ একটি আচারকে “জাতীয় উৎসব” বলে চাপিয়ে দেওয়া ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতি অবিচার।
৮. অন্যান্য লোকজ উৎসবে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিস্তার
বাউল সংগীত বাংলাদেশের একটি প্রকৃত লোকঐতিহ্য। লালন শাহ, হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিম, আবদুল আলিম, আব্বাস উদ্দিন — এই শিল্পীরা বাংলার মাটি থেকে উঠে আসা সত্যিকারের কণ্ঠস্বর। কিন্তু বাউল সংস্কৃতিকেও একটি বিশেষ আদর্শিক কাঠামোয় আবদ্ধ করা হয়েছে। বাউলের দর্শন থেকে ইসলামী উপাদান বাদ দিয়ে এবং হিন্দুতান্ত্রিক উপাদানকে প্রাধান্য দিয়ে বাউলকে “ইসলামবিরোধী মানবতাবাদ” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অথচ লালন ফকিরের গানের মধ্যে ইসলামী সুফি ঐতিহ্যের গভীর প্রভাব সুস্পষ্ট। ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে একাধিকবার বাউলের উৎসবে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে মাদকের আসর, অশ্লীল নৃত্য এবং জুয়ার আড্ডাসহ এমন কোনো অপরাধ ছিল না যা সংঘটিত হতো না। এরই নাম কি সর্বজনীন উৎসব? এ বিষয়ে একাধিকবার মরহুম অধ্যাপক আবু জাফরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল।
নবান্ন উৎসবও বাংলার কৃষিজীবী মানুষের প্রাচীন আনন্দের প্রকাশ। নতুন ধানের উৎসব হিসেবে এর ইতিহাস শত শত বছরের পুরনো। সেকালের গ্রামীণ বাংলার চিত্রটি ছিল অন্যরকম — অন্যরকম এক মানবিক উষ্ণতায় ভরা। বাড়ির উঠানে হেমন্তের সোনালি রোদে মাঠ থেকে ধান কেটে ঘরে তোলার পর আব্বার মুখে যে তৃপ্তির হাসি ফুটত, তা কেবল নিজের পেট ভরার আনন্দ ছিল না। সেই আনন্দ ছিল ভাগ করে নেওয়ারও। নতুন ধান ওঠার পর গ্রামের কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের একটি অংশ — উশর বা দশমাংশ — গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। একই সাথে ভোরের শিশিরভেজা উঠোনে পিঠা-পুলির গন্ধ উঠত, প্রতিবেশীর দরজায় পৌঁছে যেত নতুন চালের থালা। এভাবে নিজের ফসলের আনন্দকে গরিবের দুয়ারে পৌঁছে দিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন — এটিই ছিল তখনকার নবান্নের প্রকৃত রূহ।
কিন্তু এই উৎসবটিও ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক রূপ নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতি বছর নবান্ন উৎসব পালন করে, যেখানে একই ধরনের হিন্দু পৌরাণিক প্রতীকের ব্যবহার লক্ষণীয়। চৈত্রসংক্রান্তি ও পৌষমেলাও একই রাজনৈতিক ব্যবহারের শিকার। অথচ এই উৎসবগুলোর ঐতিহ্যগত রূপে এমন কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না — এগুলো ছিল মূলত কৃষিজীবী মানুষের ঋতুভিত্তিক উৎসব, যার শিকড় প্রোথিত ছিল মাটিতে, ধর্মীয় বিভাজনে নয়।
জাতীয় দিবসগুলোও একইভাবে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যেভাবে সাংস্কৃতিক কর্মসূচি উপস্থাপিত হয়, তাতে মুসলিম বাংলাদেশের বৃহত্তর পরিচয় প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে। মুক্তিযুদ্ধের মহান ইতিহাসকে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক দলের সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়েছে এবং ভিন্নমতকে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী” আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে দমন করা হয় — এটি অসহিষ্ণুতার একটি অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
৯. সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব
দশকের পর দশক ধরে চলা এই সাংস্কৃতিক চাপিয়ে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠী একটি গভীর পরিচয়-সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। তাদের বলা হয়েছে: তোমরা যদি মঙ্গল শোভাযাত্রায় না যাও, তুমি বাঙালি নও। যদি পহেলা বৈশাখ না মানো, তুমি মৌলবাদী। এই চাপ একটি জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয়ে অপরাধবোধে ভোগাতে থাকে এবং সামাজিক বিভাজন তৈরি করেছে।
সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে বাংলাদেশের মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন কমিয়ে কলকাতা-কেন্দ্রিক হিন্দু-বাঙালি সাংস্কৃতিক উপাদানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এর ফলে শিক্ষাথীরা বড় হচ্ছে একটি বিভ্রান্তিকর পরিচয় নিয়ে — তাদের বলা হচ্ছে তারা বাঙালি, কিন্তু সেই “বাঙালিত্ব” তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক রাজনৈতিক প্রভাব হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর আঘাত। কেউ যদি মঙ্গল শোভাযাত্রার ধর্মীয় প্রতীকের বিষয়ে প্রশ্ন তোলে, তাকে “মৌলবাদী” ট্যাগ দেওয়া হয় এবং সামাজিক মিডিয়ায় হেনস্থার শিকার হতে হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় কাউকে গ্রেফতার পর্যন্ত করা হয়েছে।
১০. ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহ্যিক মাত্রা আছে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বয়ান বহুলাংশে ভারত, বিশেষত কলকাতা থেকে আসছে। ভারতীয় মিডিয়া, শিক্ষা ও বিনোদন শিল্পের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক প্রভাব পড়ছে, তা বাংলাদেশের স্বতন্ত্র মুসলিম-বাঙালি পরিচয়কে ধীরে ধীরে দুর্বল করছে। এটি কেবল সাংস্কৃতিক প্রশ্ন নয়, এটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকরা যদি তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়কে প্রতিবেশী দেশের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি সেই রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সংকটের প্রমাণ।
১১. প্রকৃত লোকসংস্কৃতির পুনরুদ্ধার
বাংলাদেশের প্রকৃত লোকসংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এর ধারক বাহকরা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছেন। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি, পুঁথি, মুর্শিদি — এই সুরগুলো বাংলার মাটি ও মানুষের প্রকৃত প্রকাশ। নকশিকাঁথা, শীতলপাটি, মসলিন, জামদানি — এই শিল্পগুলো বাংলাদেশের গৌরবময় ঐতিহ্য। এগুলোকে পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা জরুরি। কিন্তু এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় কোনো বিশেষ রাজনৈতিক বা আদর্শিক ফ্রেম চাপিয়ে দেওয়া চলবে না।
বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানের পরিচয় বহুমাত্রিক। সে একইসাথে বাঙালি এবং মুসলমান — এই দুই পরিচয়ের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। এই বহুমাত্রিক পরিচয়কে স্বীকার করার মধ্যেই প্রকৃত সাংস্কৃতিক গণতন্ত্র নিহিত। কোনো উৎসব বা সাংস্কৃতিক আচারকে “জাতীয়” বলে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তা সত্যিকার অর্থেই সকলের হতে হবে। প্রয়োজন একটি খোলামেলা সাংস্কৃতিক সংলাপ, যেখানে সকল পক্ষের বক্তব্য শোনা হবে এবং কাউকে তার ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে “পশ্চাৎপদ” বলা হবে না।
১২. সংস্কৃতির গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গভীর বিশ্লেষণ আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরে। যাকে “সর্বজনীন বাঙালি সংস্কৃতি” বলা হয়, তা আসলে একটি ক্ষুদ্র কালচারাল এলিটের রাজনৈতিক প্রজেক্ট। পহেলা বৈশাখ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা, বাউল উৎসব থেকে নবান্ন — প্রতিটি উৎসবকেই একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক ফ্রেমে আবদ্ধ করা হয়েছে এবং দেশের বৃহত্তর ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর অনুভূতি ও ইচ্ছাকে পদদলিত করা হয়েছে।
এই সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এটি সামাজিক বিভাজন তৈরি করেছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচয়-সংকট তৈরি করেছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্যের পথ সুগম করেছে। প্রকৃত সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা মানে কোনো বিশেষ আচার পালনে বাধ্য না করা, কাউকে তার ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে “পশ্চাৎপদ” না বলা এবং দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও ঐতিহ্যকে সম্মান করা। বাংলাদেশের সংস্কৃতির গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই তাই শুধু সাংস্কৃতিক নয় — এটি মূলত গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের লড়াই।
“যেই চর্চার মধ্যে দেশের অধিকাংশ জনগণের অংশগ্রহণ নেই, সেটাকে ‘জাতীয় বা সর্বজনীন সংস্কৃতি’ বলে চালিয়ে দেওয়ার রাজনীতিটাই হলো কালচারাল ফ্যাসিজম।” — ফরহাদ মজহার

পড়ুনঃ  রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ ঃ এ যুদ্ধ থামাবার কোন নৈতিক শক্তি কী বৃটেন ও আমেরিকার আছে?

-সুমন মাহমুদ, লেখক ও গবেষক এবং টিভি উপস্থাপক

উৎস/হদীস
[1] ঐতিহাসিক সূত্র: ১৯১৭ ও ১৯৩৮ সালের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বিবরণ।
[2] অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বক্তৃতা সিরিজ।
[3] ফাহমিদ-উর-রহমান, বাঙালি পরিচয় ও জাতীয়তাবাদ।
[4] অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম, ঔপনিবেশিক বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস।
[5] বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা।
[6] ফরহাদ মজহার, বাংলা নববর্ষ ও শ্রেণী রাজনীতি।
[7] অধ্যাপক আল-মামুন, বাঙালি পরিচয় ও কলকাতার ভূমিকা।
[8] অধ্যাপক আল-মামুন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণ।
[9] মঙ্গল শোভাযাত্রার ধর্মীয় প্রতীক বিষয়ক গবেষণা।
[10] আনন্দবাজার পত্রিকা, মঙ্গল শোভাযাত্রা বিষয়ক প্রতিবেদন।
[11] বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আনন্দমঠ এবং মুসলিম-বিরোধী বয়ান বিষয়ক আলোচনা।
[12] বিভিন্ন সাময়িকী ও সংবাদপত্র
[13] লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
[14] বাংলাপিডিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here