Home সম্পাদকীয় মুসোলিনী থেকে হাসিনা: ফ্যাসিবাদীদের নির্মম পরিণতি

মুসোলিনী থেকে হাসিনা: ফ্যাসিবাদীদের নির্মম পরিণতি

82
0

ইতিহাস একটি নিষ্ঠুর শিক্ষক। সে বারবার একই পাঠ দেয় — ফ্যাসিবাদ যতই শক্তিশালী হোক, যতই অপ্রতিরোধ্য মনে হোক, তার পরিণতি একটাই। পতন। অনিবার্য, অপমানজনক পতন। ইতিহাসের পাতায় এমন একজন ফ্যাসিস্ট শাসকের নাম নেই, যিনি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকতে পেরেছেন। পার্থক্য কেবল সময়ের — কেউ দ্রুত পড়েছেন, কেউ দেরিতে। কিন্তু পড়েছেন প্রত্যেকেই। আধুনিক পৃথিবী অদ্যাবধি বহু ফ্যাসিবাদীর শাসন ও শোষণ প্রত্যক্ষ করেছে। তবে সবাইকে নিয়ে আলোচনা করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। এখানে কেবল হাতে গোনা কয়েকজন কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট শাসকের পরিণতি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে — যাঁরা বিগত শতাব্দীজুড়ে পৃথিবীর কোনো না কোনো অঞ্চলে নিজেদের একনায়করূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং যাঁদের শাসনকালকে একসময় অজেয় ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা সকলেই আজ ইতিহাসের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত।

ফ্যাসিবাদের জনক বেনিতো মুসোলিনি একসময় ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতাদের একজন ছিলেন। “ইল দুচে” — অর্থাৎ মহান নেতা — এই গর্বিত উপাধিতে তাঁকে সম্বোধন করা হতো। লক্ষ মানুষ তাঁর উদ্দাম বক্তৃতা শুনতে রোমের রাজপথে জমায়েত হতেন। কিন্তু ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে সেই মুসোলিনিকে ইতালীয় প্রতিরোধ যোদ্ধারা গ্রেপ্তার করে গুলি করে হত্যা করেন। তাঁর মৃতদেহ মিলানের একটি পেট্রোল স্টেশনের ছাদ থেকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। যে জনতা একদিন তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়েছিল, সেই জনতাই তাঁর ঝুলন্ত মৃতদেহে থুতু নিক্ষেপ করেছিল। ক্ষমতার এই চরম ও করুণ পরিণতি ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক দৃশ্য হয়ে আছে।
আডলফ হিটলারের পরিণতি আরও করুণ। যে মানুষটি একসময় গোটা ইউরোপকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, হাজার বছরের তৃতীয় রাইখের দুর্দান্ত স্বপ্ন দেখেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনি বার্লিনের ভূগর্ভস্থ বাংকারে পালিয়ে গিয়ে নিজেই নিজের জীবন শেষ করেছিলেন। তাঁর শেষ আদেশ ছিল — মৃতদেহ যেন শত্রুর হাতে না পড়ে। পেট্রোল ঢেলে নিজের লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। হাজার বছরের দম্ভিত স্বপ্ন মাত্র বারো বছরেই ধুলোয় মিশে গিয়েছিল।
স্পেনের ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন — প্রায় চার দশক। কিন্তু ১৯৭৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পর স্পেন যে দ্রুততায় গণতন্ত্রের দিকে ধাবিত হলো, তা প্রমাণ করে যে ফ্যাসিবাদ আসলে কখনো জনগণের স্বাভাবিক ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করে না — এটি কেবল ভয় ও কাঁচা শক্তির জোরে টিকে থাকে। শাসক চলে গেলে সেই কৃত্রিম কাঠামো ভেঙে পড়তে বেশি সময় লাগে না।
ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোসের পতনের দৃশ্য ছিল আরও নাটকীয় ও অবিস্মরণীয়। ১৯৮৬ সালে তাঁর ট্যাঙ্কবহর যখন জনতার অভ্যুত্থান দমনে গর্জন করতে করতে রাস্তায় নামে, তখন শত শত ক্যাথলিক নান ও পাদ্রি নিরস্ত্র বুক পেতে ট্যাঙ্কের সামনে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনায় বসেন। বৃদ্ধ নারীরা বন্দুকধারী সৈনিকদের মাতৃস্নেহে আলিঙ্গন করে জনতার বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলতে নিবৃত্ত করেন। ছোট শিশুরা সেনাদের ফুলের তোড়া উপহার দেয়। এই অসাধারণ মানবিক দৃশ্যের মুখে মার্কোসের হাজার হাজার সমর্থক দল ত্যাগ করেন, অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মার্কোস অবশেষে বিমানযোগে হাওয়াইতে পালিয়ে যান। যে “মানাকানাঙ” প্রাসাদ একদিন আগেও হাজার হাজার অনুগতের পদভারে মুখরিত ছিল, সেটি মুহূর্তেই পরিণত হয় একটি পরিত্যক্ত, জনশূন্য ও বিষণ্ন নাট্যমঞ্চে।
রোমানিয়ার নিকোলাই চাউশেস্কুর পরিণতি হয়তো সবচেয়ে দ্রুত এবং সবচেয়ে প্রতীকী। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে তাঁর পতন ঘটে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে। গণবিক্ষোভের মুখে হেলিকপ্টারে পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন। সামরিক ট্রাইব্যুনালে সংক্ষিপ্ত বিচারের পর বড়দিনের দিনই তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি যে তাঁর নিজের দেশের মানুষ তাঁকে এভাবে শেষ করে দেবে।
ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের পরিণতি ছিল আরও অপমানজনক। একসময় তথাকথিত “আরব জাতির সিংহ” বলে পরিচিত এই শাসককে ২০০৩ সালে মার্কিন বাহিনী তিকরিতের কাছে একটি সংকীর্ণ মাটির গর্ত থেকে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় ধরেন। ঝাঁকড়া দাড়িতে ঢাকা ক্লান্ত মুখ, হাতে-গালে মাটির দাগ — এই অপ্রত্যাশিত ছবিটি পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৬ সালে বিচারের পর তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত কেউ কেউ তাঁকে উপহাস করছিলেন — যে মানুষটি একদিন লক্ষ মানুষের জীবন-মৃত্যুর নিরঙ্কুশ মালিক ছিলেন, সেই মানুষটি সেদিন ছিলেন সম্পূর্ণ অসহায় ও নিঃসঙ্গ।
লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির পরিণতি হয়েছে সবচেয়ে নির্মম। ২০১১ সালে ন্যাটোর সহায়তায় সশস্ত্র বিদ্রোহীরা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে। সিরতে শহরের একটি পরিত্যক্ত ড্রেনপাইপে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় ধরা পড়েন তিনি। জনতার হাতে যেভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল, তা প্রকাশযোগ্য নয়। চার দশকের দাপুটে শাসনের পরিণতি হয়েছিল একটি নোংরা ড্রেনপাইপে।
বাংলাদেশের শেখ হাসিনা — পনেরো বছর ধরে যিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছিলেন, লক্ষ লক্ষ মানুষকে মিথ্যা মামলায় পর্যুদস্ত করেছিলেন, বিচারের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলেন, শাপলা চত্বরে রাতের আঁধারে নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরিয়েছিলেন — তাঁর পরিণতিও ইতিহাসের এই অমোঘ নিয়মের বাইরে ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অদম্য গণঅভ্যুত্থানের মুখে তিনি পনেরো বছরের ক্ষমতার সিংহাসন ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। গন্তব্য — ভারত। যে দেশের আধিপত্যবাদী সমর্থনে তিনি গণতন্ত্র হত্যা করেছিলেন, সেই দেশেই তিনি আশ্রয় নিলেন। মার্কোস হাওয়াইয়ে পালিয়েছিলেন, হাসিনা পালালেন দিল্লিতে — পার্থক্য কেবল গন্তব্যে, পরিণতির চরিত্র একই।
ইতিহাস এই সত্যকে বারবার প্রমাণ করে — ফ্যাসিবাদী শাসক যতই ক্ষমতাবান হোন, নিজেকে যতই অপরিহার্য মনে করুন, জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির সামনে তাঁর পতন অনিবার্য। হিটলার থেকে হাসিনা — এই দীর্ঘ তালিকা একটিই শিক্ষা দেয়: যে শাসক জনগণকে শত্রু মনে করেন, ইতিহাস তাঁকে কখনো ক্ষমা করে না।
সুমন মাহমুদ
লেখক ও টিভি উপস্থাপক

পড়ুনঃ  কিভাবে একটি অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তন ঘটতে পারে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here