এক. যে যুদ্ধ বন্দুক ছাড়াই হয়
আমরা ইতোমধ্যে পরিষ্কার হয়েছি যে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই এখন আর কেবল ভোটের বাক্স বা রাজপথের আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ শতকের শেষ দশক থেকে, এবং একবিংশ শতাব্দীতে এসে আরও তীব্রভাবে, এই লড়াইয়ের একটি নিষ্পত্তিকারী ময়দান হয়ে উঠেছে মিডিয়া — টেলিভিশন, সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল এবং সোশ্যাল মিডিয়া। যে দল বা মতাদর্শ এই ময়দানে অনুপস্থিত, সে বাস্তব জগতেও ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে আধিপত্যবাদবিরোধী দলগুলো ঠিক এই সংকটে নিমজ্জিত। তারা মাঠের রাজনীতিতে লড়াই করে, সংগঠন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু মিডিয়ার জগতে তাদের উপস্থিতি এতটাই ক্ষীণ যে তাদের বক্তব্য, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের ন্যারেটিভ — কার্যত জনমানসে পৌঁছায় না।
এই অধ্যায়ে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন এই দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, এর পেছনে কোন কাঠামোগত, মানসিক ও কৌশলগত কারণ আছে, এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা — বিশেষত কয়েকটি দেশে গণতান্ত্রিক শক্তির মিডিয়া বিপ্লব — থেকে বাংলাদেশের উপরোক্ত মতাদর্শের ধারকবাহকরা কী শিক্ষা নিতে পারেন।
দুই. রোগ নির্ণয়
বাংলাদেশের মিডিয়া মানচিত্রে ইসলামপন্থীদের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুতর সত্য বেরিয়ে আসে। তাদের ঘরানার ব্যবসায়ী কিংবা মালিকানায় হাতেগোনা দুই-একটি পত্রিকা ও একটা বা দুইটা টিভি চ্যানেল থাকলেও সেগুলো কার্যকর রাজনৈতিক বার্তাবাহকে পরিণত হয়নি। কারণ মালিকানা আর সম্পাদকীয় দিকনির্দেশনা এক জিনিস নয়। আমারা দেখেছি যে খোদ বিএনপি জোটের শাসনামলে এই জিনিসটা তীব্রভাবে দেখা গিয়েছে। ফলে এই মিডিয়াগুলো কার্যত ফ্যাসিস্ট মিডিয়া ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কোনো সাহসী অবস্থান তৈরি করে নিতে পারেনি।
জামায়াতে ইসলামি দলটিতে- সাংগঠনিক কাঠামোয় নিষ্ঠাবান কর্মীর অভাব নেই, কিন্তু আধুনিক মিডিয়া পরিচালনার মতো প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত কম। দলটি মূলত একটি ‘ক্যাডার সংগঠন’ হিসেবে পরিচিত হলেও সেই ক্যাডারশিপের পরিধি মিডিয়া ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়নি। এমনকি দলের নেতা-কর্মীরা ব্যক্তিগত রিপোর্ট বইয়ে সাহিত্য অধ্যয়নে যতটা মনোনিবেশ করেন, ততটাই আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রবাহ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেন। একজন কর্মী যেখানে মাসে তিনশ বা চারশ পাতার ইসলামি বই পড়ে শেষ করেন, সেখানে আধুনিক চিন্তার সাথে সমন্বয় করে কয়জন এমন আছেন যে প্রতি মাসে দুই-চারটি মৌলিক বই পড়ার পেছনে সময় দেন?
আধুনিক মিডিয়া শুধু তথ্য পরিবেশন করে না — এটি ন্যারেটিভ নির্মাণ করে। একটি ঘটনাকে কোন কোণ থেকে উপস্থাপন করা হবে, কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে, কোন বিশেষজ্ঞকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে — এসবের মাধ্যমেই জনমত তৈরি হয়। বাংলাদেশের বাম-উদার মিডিয়া মহল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই ন্যারেটিভ নির্মাণের কাজটি করে আসছে। সেখানে জামায়াত মানেই ‘রাজাকার’, বিএনপি মানেই ‘জঙ্গি আশ্রয়দাতা’ — এই ফ্রেমিং এত গভীরভাবে প্রোথিত যে উপরোক্ত দুই শিবির থেকে কোনো পাল্টা ন্যারেটিভ গড়ে তোলার চেষ্টাই হয়নি। দলীয় আভ্যন্তরীণ ফোরামে যতই ব্যাখ্যা দেওয়া হোক — সেটা এন্টি-ন্যারেটিভ তৈরিতে কোনো ভূমিকা রাখেনি।
বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে যারা বের হচ্ছেন, তাদের বড় একটি অংশ শহুরে উদার মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। তারা স্বাভাবিকভাবেই সেই মিডিয়া হাউসগুলোতে যোগ দেন যেগুলো তাদের মতাদর্শের কাছাকাছি। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসা তরুণরা সাধারণত সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন না। ফলে একটি মেধাবী, প্রশিক্ষিত ও প্রতিশ্রুতিশীল মিডিয়া কর্মীবাহিনী তৈরি হয়নি। এই জনবল-সংকট দীর্ঘমেয়াদে মিডিয়া উপস্থিতির সবচেয়ে বড় বাধা।
ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক এবং পডকাস্টের যুগে মিডিয়ার গণতন্ত্রীকরণ ঘটেছে। এখন কম অর্থ বিনিয়োগেও শক্তিশালী মিডিয়া উপস্থিতি তৈরি করা সম্ভব — যদি কৌশল ও মানব সম্পদ ঠিক থাকে। কিন্তু ইসলামি রাজনৈতিক শিবির এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। তাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলো মূলত বক্তৃতার অডিও ক্লিপ আর প্রেস রিলিজের পুনরাবৃত্তিতে সীমাবদ্ধ। স্টোরিটেলিং, ইনভেস্টিগেটিভ কন্টেন্ট, বা তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর জন্য আকর্ষণীয় ভিজ্যুয়াল কন্টেন্টের অনুপস্থিতি অত্যন্ত প্রকট।
তিন. একটি গভীর বিশ্লেষণ
ইসলামপন্থী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মিডিয়াকে দেখা হয় একটি প্রচারযন্ত্র হিসেবে — দলের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। কিন্তু আধুনিক মিডিয়া বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। মিডিয়া হচ্ছে একটি বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিষ্ঠান। যে মিডিয়া শুধু একটি পক্ষের বার্তা দেয়, তা দর্শক-পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। তুরস্কের সফল মিডিয়াগুলোর শিক্ষা হলো — তারা মানসম্মত সাংবাদিকতা করেছে, এবং সেই বিশ্বাসযোগ্যতার ভেতর দিয়ে তাদের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি ছড়িয়ে দিয়েছে।
একটি শক্তিশালী মিডিয়া প্রতিষ্ঠান গড়তে কমপক্ষে পাঁচ থেকে দশ বছরের ধারাবাহিক বিনিয়োগ ও পরিচর্যা দরকার। বাংলাদেশের ইসলামি ঘরানার ব্যবসায়ীরা সাধারণত দ্রুত ফল দেওয়া বিনিয়োগে আগ্রহী। মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ফল ধীরে আসে, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী এবং সমাজ-রূপান্তরকারী। এই দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির অভাবই বড় সমস্যা। বাংলাদেশে বিরোধী মিডিয়ার ওপর রাষ্ট্রীয় চাপ, বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা — এগুলো বাস্তব সমস্যা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই ভয় প্রকৃত বিপদের চেয়ে বেশি এবং একটি self-censorship-এর সংস্কৃতি তৈরি করেছে। এই ভয়কে জয় করে কাজ করার নজির ও সাংস্কৃতিক মনোভাব তৈরি হয়নি।
শক্তিশালী মিডিয়ার পেছনে থাকে একটি শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক ইকোসিস্টেম — গবেষণা প্রতিষ্ঠান, একাডেমিক জার্নাল, পলিসি পেপার, এবং বিশ্লেষণধর্মী লেখক। বাংলাদেশের ইসলামি মতাদর্শিক শিবিরে এই ইকোসিস্টেম অনুপস্থিত। ফলে মিডিয়া যখন কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মন্তব্য খোঁজে, তখন ইসলামি ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স নিয়ে বলার মতো কেউ থাকেন না — বা থাকলেও তারা জনপরিচিত নন। এই বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা দূর না করলে মিডিয়ার ঘাটতি পূরণ হওয়ার নয়।
চার. একটি অনুকরণীয় মডেল
তুরস্কের একেপি সরকারের টিকে থাকা ও জনপ্রিয়তা বজায় রাখার পেছনে শুধু এরদোয়ানের ক্যারিশমা নয় — একটি সুসংগঠিত মিডিয়া ইকোসিস্টেমের ভূমিকা অপরিসীম। আর সেটা একদিন বা এক বছরে তৈরি হয়নি; বরং বহু বছরের সাধনার ফল। তুর্কি রেডিও এবং টেলিভিশন কর্পোরেশন (টিআরটি) পুরনো সরকারি সম্প্রচার কাঠামো থেকে বের হয়ে একটি আধুনিক, বহুভাষিক ও বৈশ্বিক মিডিয়া সংস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে। টিআরটি ওয়ার্ল্ড ইংরেজি, আরবি, কুর্দি ও তুর্কিতে আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে তুরস্কের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে — বিবিসি, আল আরাবিয়া বা আলজাজিরার মানের সাথে প্রতিযোগিতা করার মতো পেশাদারিত্ব নিয়ে। এর মূল রহস্য হলো, তারা শুধু তুর্কি জাতীয়তাবাদ বা ইসলামি প্রচারণা করেনি — তারা বৈশ্বিক সাংবাদিকতার মান বজায় রেখে নিজেদের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করছে।
আনাদুলু নিউজ এজেন্সি, দৈনিক ইয়েনি শাফাক, দৈনিক হুররিয়াত এবং দৈনিক সাবাহ — এই সংবাদমাধ্যম ও তিনটি পত্রিকা তুরস্কের সবচেয়ে প্রভাবশালী মিডিয়ার অন্তর্ভুক্ত। শুধু তুরস্কেই নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও এদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এরা স্পষ্টভাবে ইসলামি-রক্ষণশীল-জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে, কিন্তু তাদের সাংবাদিকতার মান উচ্চ। তারা গভীর বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন এবং তরুণ পাঠকদের আকৃষ্ট করার মতো কন্টেন্ট তৈরি করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি এই মিডিয়াগুলোকে আলাদা করে তোলে তা হলো — তারা কেবল অর্থ বিনিয়োগ করেনি, তারা মেধাবী মানুষ বিনিয়োগ করেছে। প্রতিটি পত্রিকার সম্পাদকীয় বোর্ডে রয়েছেন তুরস্কের শীর্ষস্থানীয় কলামিস্ট, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ, এবং পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক। এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগই তাদের শক্তির মূল উৎস।
তুর্কি মিডিয়ার সাফল্যের আরেকটি গোপন অস্ত্র হলো ফাউন্ডেশন ফর পলিটিক্যাল, ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ — সেটা (SETA)। এই থিঙ্কট্যাঙ্ক নিরন্তর গবেষণাপত্র, নীতি বিশ্লেষণ ও রিপোর্ট তৈরি করে মিডিয়াকে সরবরাহ করে। ফলে মিডিয়া বিশেষজ্ঞ মন্তব্য ও তথ্য-উপাত্তের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য উৎস পায়। বাংলাদেশে এই মডেলের অনুপস্থিতি অত্যন্ত স্পষ্ট। মিডিয়াকে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্বালানি সরবরাহ না করলে সে কেবল হাওয়ায় চলে — বাস্তবের মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
অবশ্য তুর্কি মডেলের সমালোচনামূলক দিকটিও বিবেচনায় নিতে হবে। সমালোচকরা যুক্তি দেন যে তুরস্কে মিডিয়া কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় বিরোধী কণ্ঠ দমিত হয়েছে এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের প্রেস ফ্রিডম ইন্ডেক্সে তুরস্কের অবস্থান নিম্নমুখী। বাংলাদেশের ইসলামি ঘরানার জন্য অনুকরণীয় হওয়া উচিত তুর্কি মিডিয়ার পেশাদারিত্ব, বিনিয়োগ দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল — তাদের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা নয়।
পাঁচ. অন্যান্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
মালয়েশিয়ায় ইসলামি রাজনৈতিক দল পাস (PAS)-এর মিডিয়া অভিজ্ঞতাও আকর্ষণীয়। হারাকাহ পত্রিকা দিয়ে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে তারা ডিজিটাল মিডিয়ায় শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করেছে। পাস-এর মিডিয়া কৌশলের বিশেষত্ব হলো তারা স্থানীয় ভাষায় অর্থাৎ মালয়তে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য সহজবোধ্য কিন্তু তথ্যসমৃদ্ধ কন্টেন্ট তৈরি করে। এই মডেল প্রমাণ করে যে বিশাল বাজেট ছাড়াও ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক নৈকট্য ব্যবহার করে মিডিয়া শক্তি অর্জন করা সম্ভব।
কাতারভিত্তিক আলজাজিরা একটি অপূর্ব নজির স্থাপন করেছে — একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মিডিয়া বৈশ্বিক মানের সাংবাদিকতা করতে পারে। আলজাজিরা প্রমাণ করেছে যে ইসলামি মূল্যবোধ এবং পেশাদার সাংবাদিকতা পরস্পরবিরোধী নয়। আলজাজিরার সাফল্যের চাবিকাঠি ছিল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকদের নিয়োগ দেওয়া — তাদের মতাদর্শ যাই হোক — এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এই দুটি নীতি একসাথে মেনে চলাই আলজাজিরাকে বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে।
ফিলিস্তিন ও জর্ডানের অভিজ্ঞতাও এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য। ফিলিস্তিনে শাহাব নিউজ এজেন্সি একটি দ্রুততম ও সর্বাধিক অনুসৃত আরবি ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্ম, যা গাজা সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে টেক্কা দিয়ে তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করেছে। শাহাব নিউজের সাফল্যের রহস্য হলো সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যকে দ্রুত ও দক্ষভাবে (ফ্যাক্ট যাচাই) যাচাই করে পরিবেশন করার ক্ষমতা — এবং ইসলামি ঘরানার কন্টেন্টকে আধুনিক সাংবাদিকতার কাঠামোয় উপস্থাপন করা। জর্ডানে ইসলামি আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত বেশ কিছু অনলাইন মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম রয়েছে যেগুলো স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং ধর্মীয় শিক্ষাকে একত্রে উপস্থাপন করে সফলভাবে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
মাগরেব অঞ্চল — মরক্কো ও তিউনিসিয়া — থেকেও একটি চমকপ্রদ শিক্ষা পাওয়া যায়। এই অঞ্চলে ইসলামি ঘরানার ব্যবসায়ীদের দ্বারা পরিচালিত একাধিক আরবি, ফরাসি ও স্প্যানিশ ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল, কার্টুন চ্যানেল ও বিনোদনমূলক চ্যানেল রয়েছে — যেগুলো শিশুদের জন্য ইসলামি মূল্যবোধসমৃদ্ধ কন্টেন্ট তৈরি করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এই কৌশলটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিশুদের মাধ্যমে একটি মতাদর্শ পরিবারের ভেতরে প্রবেশ করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের মানসিক গঠন প্রভাবিত করে। মরক্কোর প্রধান চারটি কার্টুন চ্যানেলের নিয়ন্ত্রণ ইসলামি ঘরানার ব্যবসায়ীদের হাতে থাকার বিষয়টি এই কৌশলের স্পষ্ট নিদর্শন।
বৈশ্বিক মুসলিম ডিজিটাল মিডিয়ায় আরেকটি উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা হলো পাশ্চাত্যে ইসলামি পণ্ডিতদের ইউটিউব ও পডকাস্ট বিপ্লব। ড. ইয়াসির কাদহি — ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডিপ্রাপ্ত এবং ইসলামিক সেমিনারি অব আমেরিকার ডিন — তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে সাত লক্ষের বেশি সাবস্ক্রাইবার ও প্রায় বারো কোটি ভিউ অর্জন করেছেন। ইসলামের ইতিহাস, আকিদা ও সমসাময়িক প্রশ্নগুলো তিনি একাডেমিক গভীরতার সাথে এবং সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপন করেন। নোমান আলি খান — বাইয়্যিনাহ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা — তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে ২৭ লক্ষের বেশি সাবস্ক্রাইবার এবং ২৬ কোটিরও বেশি ভিউ অর্জন করেছেন। কুরআনের ভাষিক সৌন্দর্য ও বিষয়বস্তু তুলে ধরার তাঁর অনন্য পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ তরুণকে কুরআনের সাথে যুক্ত করেছে।
ড. ওমর সুলাইমান — ইয়াকিন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট — শুধু একজন বক্তা নন, তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি মিডিয়া ও গবেষণা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছেন। ইয়াকিন ইনস্টিটিউটের ইউটিউব চ্যানেলে ১৭ লক্ষের বেশি সাবস্ক্রাইবার এবং ২৭ কোটিরও বেশি ভিউ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক রাজস্ব প্রায় ৯০ লক্ষ ডলার এবং এটি প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষ ডলার ব্যয় করে একাডেমিক ও পিয়ার-রিভিউড গবেষণাপত্র প্রকাশে। ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক, পডকাস্ট ও গবেষণাপত্রের সমন্বয়ে ইয়াকিন যে মডেল তৈরি করেছে, সেটি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক অনুকরণীয় উদাহরণ। এই তিনটি উদাহরণ প্রমাণ করে যে উচ্চ একাডেমিক মানসম্পন্ন ইসলামি কন্টেন্ট বিশাল দর্শক টানতে সক্ষম — যদি উপস্থাপনার ধরন ও ডিজিটাল কৌশল সঠিক হয়।
ছয়. করণীয়: একটি রোডম্যাপ
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির জন্য একটি সম্ভাব্য করণীয় রোডম্যাপ আঁকা জরুরি। তুরস্কের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে যে শিক্ষা দেয় তা হলো — অর্থের চেয়ে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি মতাদর্শের ধারকবাহক সংগঠনগুলোকে তাদের মেধাবী তরুণ সদস্যদের সাংবাদিকতা, ফিল্ম মেকিং, ডিজিটাল মিডিয়া, গ্রাফিক ডিজাইন ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশনে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পাঠাতে হবে। সম্ভব হলে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র বা তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মিডিয়া পড়তে পাঠানোর জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
দলীয় পরিচয়ের বাইরে একটি স্বাধীন মিডিয়া ইনস্টিটিউট গড়া দরকার যেখানে পেশাদার সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এই ইনস্টিটিউট সরাসরি কোনো দলের সাথে যুক্ত না হয়ে একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে কাজ করবে — তবে এর মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি হবে স্পষ্টভাবে ইসলামি মানবিকতাবাদী। এই ধরনের প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতের মিডিয়া পেশাদারদের একটি পাইপলাইন তৈরি করবে। একটি পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন চ্যানেলের আগে, সীমিত বিনিয়োগে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেল গড়া সম্ভব এবং কার্যকর। এই প্ল্যাটফর্মে থাকতে হবে ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং, গভীর বিশ্লেষণধর্মী লেখা, ডকুমেন্টারি, এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য আকর্ষণীয় ফরম্যাটে কন্টেন্ট। এই প্ল্যাটফর্ম সরাসরি রাজনৈতিক প্রচারমাধ্যম হবে না — এটি হবে একটি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রতিষ্ঠান যা ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে বিশ্ব ও দেশ ব্যাখ্যা করে।
তুরস্কের সেটা-র মতো একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা দরকার যা অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে নিয়মিত গবেষণাপত্র ও নীতি-বিশ্লেষণ প্রকাশ করবে। এই প্রতিষ্ঠান মিডিয়াকে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্বালানি সরবরাহ করবে এবং ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিকল্প ন্যারেটিভ নির্মাণে সহায়তা করবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সংখ্যার চেয়ে গুণমান বেশি জরুরি — একটি ভাইরাল ডকুমেন্টারি বা একটি সৎ ও তথ্যবহুল ব্যাখ্যামূলক ভিডিও হাজার পোস্টের চেয়ে বেশি কাজে আসে। তরুণ কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের উৎসাহিত ও সহায়তা করার একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হবে এবং শুধু প্রেস রিলিজ ও বক্তৃতার ক্লিপ নয়, স্টোরিটেলিং, ইনফোগ্রাফিক ও ইন্টারেক্টিভ কন্টেন্টে বিনিয়োগ করতে হবে।
প্রতিষ্ঠান তৈরির পাশাপাশি প্রধানধারার মিডিয়ায় ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির ধারকদের প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এর অর্থ হলো মেধাবী লেখক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষকদের তৈরি করা যারা ইসলামি মূল্যবোধ লালন করেও প্রধানধারার পত্রিকায় কলাম লিখবেন, টিভি টকশোতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে অংশ নেবেন। এই ব্যক্তিত্বরা দলীয় মুখপাত্র হবেন না — তারা হবেন স্বাধীন বুদ্ধিজীবী যাদের কণ্ঠে ইসলামি সভ্যতার মূল্যবোধ প্রতিফলিত হবে।
সাত. সবচেয়ে জরুরি কাজ
অবকাঠামো ও বিনিয়োগের আগে দরকার একটি মানসিক রূপান্তর। ইসলামি রাজনৈতিক শিবিরকে কয়েকটি গভীর পরিবর্তন আনতে হবে। মিডিয়াকে প্রচারমাধ্যম নয়, সত্য-নির্মাণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে হবে। সত্যিকারের মিডিয়া নিজের পক্ষের নেতিবাচক খবরও প্রকাশ করার সাহস রাখে — এই সাহসই তাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। মিডিয়া কর্মীদের পেশাদার স্বাধীনতা দিতে হবে, কারণ দলীয় নির্দেশে চলা মিডিয়া দীর্ঘমেয়াদে পাঠক হারায়। মিডিয়ার মূল্যায়ন হতে হবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা, পাঠক-সংখ্যা এবং সামাজিক প্রভাব দিয়ে — দলীয় নেতার সন্তুষ্টি দিয়ে নয়। সর্বোপরি, দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করতে হবে — আজকে লাগানো বীজ পাঁচ বছরে ফল দেবে, এই ধৈর্য অর্জন করাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ।
আট. মিডিয়া যুদ্ধে হারলে রাজনৈতিক যুদ্ধেও হারতে হয়
বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সামনে মিডিয়ার চ্যালেঞ্জটি আসলে একটি সভ্যতাগত চ্যালেঞ্জ। কারণ মিডিয়া শুধু খবর দেয় না — এটি মানুষের বাস্তবতার বোধ তৈরি করে। যারা মিডিয়ায় নেই, তাদের অনুপস্থিতি শেষ পর্যন্ত জনচেতনা থেকেও অনুপস্থিতিতে পরিণত হয়।
তুরস্ক, মালয়েশিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া ও কাতার প্রমাণ করেছে যে ইসলামি মূল্যবোধ থেকে অনুপ্রাণিত শক্তি আধুনিক, পেশাদার ও প্রভাবশালী মিডিয়া গড়তে পারে। পাশ্চাত্যে ড. ইয়াসির কাদহি, নোমান আলি খান ও ড. ওমর সুলাইমানের মতো ব্যক্তিত্বরা প্রমাণ করেছেন যে বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা, ডিজিটাল দক্ষতা ও ইসলামি মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটলে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। এর জন্য দরকার দূরদৃষ্টি, ধৈর্য, মেধাবী মানুষে বিনিয়োগ, এবং মিডিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্মান করার মানসিকতা।
বাংলাদেশে এই যাত্রা শুরু করতে হবে আজই। কারণ মিডিয়া যুদ্ধে প্রতিটি হারানো বছর একটি হারানো প্রজন্মের সমান। যে প্রজন্ম বড় হচ্ছে শুধু একটি ন্যারেটিভ শুনে, তাদের মনে বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির জন্য জায়গা তৈরি করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। ইসলামি রাজনৈতিক শক্তির মিডিয়া বিপ্লব তাই শুধু রাজনৈতিক কৌশলের প্রশ্ন নয় — এটি বাংলাদেশের সমাজে বহুত্ববাদী চিন্তার টিকে থাকার প্রশ্ন।
-সুমন মাহমুদ
টিভি উপস্থাপক ও লেখক
গ্রন্থ ও একাডেমিক উৎস
Alterman, J. B. (1998). New Media, New Politics? From Satellite Television to the Internet in the Arab World. Washington Institute for Near East Policy.
Aydın, M. (2013). Turkish Foreign Policy: Framework and Analysis. Center for Strategic Research, Ankara.
Aziz, A. (2018). Islam and Democracy in Malaysia: The Views of Nik Abdul Aziz Nik Mat. Institute of Southeast Asian Studies.
Bennett, W. L., & Entman, R. M. (Eds.). (2001). Mediated Politics: Communication in the Future of Democracy. Cambridge University Press.
Chomsky, N., & Herman, E. S. (1988). Manufacturing Consent: The Political Economy of the Mass Media. Pantheon Books.
El-Nawawy, M., & Iskandar, A. (2002). Al-Jazeera: How the Free Arab News Network Scooped the World and Changed the Middle East. Westview Press.
Gramsci, A. (1971). Selections from the Prison Notebooks. Lawrence & Wishart.
Guaaybess, T. (Ed.). (2013). National Broadcasting and State Policy in Arab Countries. Palgrave Macmillan.
Hallin, D. C., & Mancini, P. (2004). Comparing Media Systems: Three Models of Media and Politics. Cambridge University Press.
Karpat, K. H. (2001). The Politicization of Islam: Reconstructing Identity, State, Faith, and Community in the Late Ottoman State. Oxford University Press.
Miles, H. (2005). Al-Jazeera: The Inside Story of the Arab News Channel That Is Challenging the West. Grove Press.
Reporters Without Borders. (2023). World Press Freedom Index 2023. RSF Publications. [তুরস্কের মিডিয়া স্বাধীনতা পরিস্থিতির জন্য]
Sakr, N. (2007). Arab Television Today. I. B. Tauris.
Sunstein, C. R. (2017). #Republic: Divided Democracy in the Age of Social Media. Princeton University Press.
Yavuz, M. H. (2003). Islamic Political Identity in Turkey. Oxford University Press.
Altunışık, M. B. (2008). The possibilities and limits of Turkey’s soft power in the Middle East. Insight Turkey, 10(2), 41–54.
Aydin-Düzgit, S. (2012). Constructions of European identity: Debates and discourses on Turkey and the EU. Journal of Common Market Studies, 50(4), 583–600.
Çarkoğlu, A., & Yavuz, M. H. (2010). Turkish media in the era of political Islam. Middle Eastern Studies, 46(6), 899–923.
Gubin, A. (2017). Al Jazeera’s editorial independence and state influence. Journalism Studies, 18(7), 845–862.
Hasan, Z. (2002). Party politics in Muslim-majority states: The experience of PAS in Malaysia. Asian Journal of Political Science, 10(1), 66–89.
Önal, A. (2019). The role of think tanks in Turkish foreign policy: The case of SETA. Turkish Studies, 20(3), 412–430.
Somer, M. (2010). Media values and democratization: What unites and what divides religious-conservative and pro-secular elites? Turkish Studies, 11(4), 555–577.
Freedom House. (2023). Freedom of the Press 2023: Turkey Country Report. https://freedomhouse.org
SETA (Foundation for Political, Economic and Social Research). Policy Briefs and Reports. https://www.setav.org
TRT World Research Centre. Media and Communications Reports. https://researchcentre.trtworld.com
Yeni Şafak. About Us — Editorial Policy. https://www.yenisafak.com
Ali, S. R. (2010). Islam and Colonialism: Becoming Modern in Kenya and Pakistan. Edinburgh University Press.
Riaz, A. (2004). God Willing: The Politics of Islamism in Bangladesh. Rowman & Littlefield.
Riaz, A., & Parvez, S. (Eds.). (2020). Routledge Handbook of Contemporary Bangladesh. Routledge.
Reporters Without Borders. (2023). Bangladesh Press Freedom Report. https://rsf.org/en/bangladesh



