Home সম্পাদকীয় সভ্যতার অর্জনে মানবিক শূন্যতা

সভ্যতার অর্জনে মানবিক শূন্যতা

36
0


মানুষ সভ্য হয়েছে। পৃথিবী এগিয়েছে। প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তর। আজ মানুষ চাঁদে পা রেখেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের পাশাপাশি কাজ করছে, অসংখ্য দুরারোগ্য রোগ এখন নিরাময়যোগ্য। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে কয়েক ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া যায়। যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি— সবকিছু আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উন্নত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব বলছে, ১৯৫০ সালে বৈশ্বিক গড় আয়ু ছিল মাত্র ৪৬ বছর, আজ তা ৭৩ বছর ছাড়িয়ে গেছে। শিশুমৃত্যুর হার কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি। একটি শিশু আজ পৃথিবীতে আসে এবং বেঁচে থাকে— এই সরল সত্যটিও একসময় নিশ্চিত ছিল না।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— মানুষ কি সত্যিই ভেতর থেকে উন্নত হয়েছে? নাকি সভ্যতার উজ্জ্বল আলোয় মানুষের ভেতরের কিছু জায়গা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে গেছে?
আজকের পৃথিবীতে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সংযুক্ত— অথচ আগের চেয়ে অনেক বেশি একা। ফেসবুকে হাজার বন্ধু, ইনস্টাগ্রামে শত শত ফলোয়ার, হোয়াটসঅ্যাপে একের পর এক গ্রুপ— তবুও গভীর রাতে মানুষ ভেতরে ভেতরে অসহায় বোধ করে। এই বিরোধাভাস নিছক কবিতার অলংকার নয়— এটি সংখ্যায় প্রমাণিত। American Psychological Association-এর একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী প্রজন্ম— যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয়— তাদের মধ্যেই নিঃসঙ্গতার হার সবচেয়ে বেশি। Meta-র নিজস্ব গবেষণাও স্বীকার করেছে যে Instagram-এর ব্যবহার কিশোরীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ বাড়ায়। অর্থাৎ আমরা এমন একটি সভ্যতা তৈরি করেছি যেখানে মানুষকে “সংযুক্ত” রাখার যন্ত্রগুলোই তাদের সবচেয়ে বড় বিচ্ছিন্নতার উৎস হয়ে উঠছে।
একসময় মানুষ দরিদ্র ছিল, কিন্তু সম্পর্কগুলো ছিল ঘনিষ্ঠ। এক ছাদের নিচে তিন-চার প্রজন্ম একসাথে বসবাস করত। দাদা-দাদী, নানা-নানী পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন— সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো তাদের পরামর্শ নিয়ে, অসুস্থ মানুষকে ঘিরে সবাই বসত, মৃত্যু ছিল পারিবারিক শোক, কোনো হাসপাতালের একাকী বিছানায় চুপচাপ চলে যাওয়া নয়। সেই জীবনে অনেক কষ্ট ছিল, অভাব ছিল— কিন্তু একটি জিনিস ছিল যা আজ অনেকের কাছে বিলাসিতা হয়ে গেছে— মানুষ জানত সে একা নয়। আজ মানুষ উন্নত ফ্ল্যাটে থাকে, কিন্তু পাশের বাসার মানুষের নামও জানে না। এই দূরত্বকে আমরা “ব্যক্তিস্বাধীনতা” বলি। কিন্তু এই স্বাধীনতার মাঝে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার নাম কী?
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। সেখানে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা অত্যন্ত শক্তিশালী, প্রতিটি মানুষের নিজস্ব জীবন ও সিদ্ধান্তের অধিকার প্রশ্নাতীত। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে এক গভীর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। World Happiness Report ২০২৪ বলছে, ফিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে “সুখী” দেশ— অথচ সেই দেশেই আত্মহত্যার হার ইউরোপের সর্বোচ্চের কাছাকাছি। যুক্তরাজ্যে বিষণ্নতা এবং উদ্বেগজনিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় প্রতি বছর অর্থনীতির ক্ষতি হয় £১১৮ বিলিয়ন— এই তথ্য Deloitte-এর ২০২২ সালের প্রতিবেদনে আছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৩ সালে Surgeon General Dr. Vivek Murthy আনুষ্ঠানিকভাবে নিঃসঙ্গতাকে একটি “public health epidemic” বা জনস্বাস্থ্য মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা কর্মকর্তাকে স্বীকার করতে হচ্ছে— মানুষ একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, এবং এটি এখন কোনো আবেগের প্রশ্ন নয়, এটি একটি জরুরি স্বাস্থ্যসংকট।
এই সংকটের ভেতরে একটি দার্শনিক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। আব্রাহাম মাসলো ১৯৪৩ সালে মানবিক চাহিদার যে পিরামিড তৈরি করেছিলেন, তার একেবারে তৃতীয় স্তরেই আছে “belonging and love”— অর্থাৎ ভালোবাসা পাওয়া এবং কোথাও অন্তর্ভুক্ত থাকার অনুভূতি। খাদ্য ও নিরাপত্তার পরেই এই চাহিদা। আধুনিক সভ্যতা প্রথম দুটি স্তর অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চিত করেছে, কিন্তু তৃতীয় স্তরটি ভেঙে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। মানুষ খাচ্ছে, নিরাপদ আছে— কিন্তু অনুভব করছে না যে সে কারো কাছে অর্থবহ।
একজন বৃদ্ধ বাবা হয়তো জীবনের পুরো সময় সন্তানদের জন্য পরিশ্রম করেছেন। বড় করেছেন, শিক্ষিত করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু জীবনের শেষ বয়সে এসে তিনি কেয়ারহোমের একটি রুমে বসে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন— আজ কেউ আসবে কি না। রাষ্ট্র তাকে চিকিৎসা দেয়, নিরাপত্তা দেয়, খাবার দেয়— কিন্তু সন্তানের স্পর্শ দিতে পারে না। কেয়ারহোমে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, একজন বৃদ্ধ মানুষের মুখে হাসি ফুটে ওঠে শুধু তখনই, যখন কেউ তার হাত ধরে কিছুক্ষণ বসে থাকে। পাঁচ মিনিটের আন্তরিক কথোপকথনও একটি পুরো দিনের নিঃসঙ্গতা মুছে দিতে পারে। কোনো ওষুধ সেটা পারে না, কোনো প্রযুক্তি সেটা পারে না— শুধু একজন মানুষের উপস্থিতি পারে।
আধুনিক সমাজ মানুষকে ধীরে ধীরে কর্মমুখী যন্ত্রে পরিণত করছে। এখানে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার আয়, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে। LinkedIn-এ profile আছে, resume আছে, designation আছে— কিন্তু ভেতরের ক্লান্তি কোথায় রাখবে? নিঃসঙ্গতার কথা কাকে বলবে? কর্মক্ষেত্রে “আমি ভালো নেই” বলা প্রায় নিষিদ্ধ। ফলে মানুষ হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ে— একা, চুপচাপ, কাউকে না জানিয়ে। WHO-র তথ্য বলছে, বিশ্বে প্রতি বছর ৭ লক্ষেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান— এবং এই মানুষদের বড় একটি অংশ বাইরে থেকে “ঠিক ঠাক” দেখাত। এটাই আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক— মানুষ দেখতে পাচ্ছে না যে পাশের মানুষটি ডুবে যাচ্ছে, কারণ সবাই ভাসমান অভিনয় করতে শিখে গেছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো— মানুষ যত উন্নত হচ্ছে, ততই “সময়” হারিয়ে ফেলছে। মায়ের জন্য সময় নেই। বাবার পাশে বসার সময় নেই। সন্তানের কথা শোনার সময় নেই। নিজের ভেতর তাকানোরও সময় নেই। অথচ সময় বাঁচানোর জন্য প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি আসছে। washing machine এলো কাপড় ধোয়ার সময় বাঁচাতে, dishwasher এলো থালাবাসনের সময় বাঁচাতে, GPS এলো পথ খোঁজার সময় বাঁচাতে— কিন্তু বাঁচানো সেই সময় কোথায় গেল? গেল আরও বেশি কাজে, আরও বেশি স্ক্রোলিংয়ে, আরও বেশি উৎপাদনশীলতার দৌড়ে। সম্পর্কের জন্য যে সময় দরকার— নিরুদ্বেগে পাশে বসে থাকার সময়— সেটা আমরা এখনো আবিষ্কার করতে পারিনি।
মানুষ শেষ বয়সে এসে বোঝে— জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, সম্পর্ক। Cornell University-র দীর্ঘমেয়াদি একটি গবেষণায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে থাকা মানুষদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল— জীবনে সবচেয়ে বেশি কী মিস করছেন? কেউ বলেননি আরও বেশি অর্থ উপার্জনের কথা। কেউ বলেননি আরও বড় পদে থাকার কথা। প্রায় সবাই বলেছেন— “আরেকটু সময় কাছের মানুষদের সাথে থাকতে চাই।” এই উত্তরটি প্রতিটি মানুষ জানে, কিন্তু জানার পরেও সারা জীবন উল্টো পথে হাঁটে— কারণ সমাজ অন্য পথ শেখায়।
প্রচুর অর্থসম্পদের মালিক মানুষও কেয়ারহোমে এসে ভেতরে ভেতরে ভীষণ একা হয়ে যান— এটা দেখেছি বারবার। সভ্যতা আমাদের ঘর বড় করেছে, কিন্তু অনেক সময় হৃদয় ছোট করে ফেলেছে। মানুষ আজ পৃথিবীর সবখানে পৌঁছাতে পারে— মঙ্গলে যাওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে— কিন্তু অনেক সময় নিজের আপন মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না। এই দূরত্ব কোনো মহাকাশযান কমাতে পারবে না।
তবে এখনো সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।
এখনো পৃথিবীতে মার্শালের স্ত্রীর মতো মানুষ আছেন, যারা পঞ্চাশ বছরের সম্পর্কের দায় মেটাতে প্রতিদিন সকাল এগারোটায় আসেন, বিকেল ছয়টায় ফেরেন— বৃষ্টিতে, শীতে, ক্লান্তিতে। এখনো কেউ কেউ বৃদ্ধ মায়ের হাত ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাশে বসে থাকেন। এখনো এমন কলিগ আছেন যারা রাতের শিফটে ক্লান্ত সহকর্মীর কাছে গিয়ে বলেন, “তুমি বসো, আমি দেখছি।” এখনো কেউ কেউ সম্পর্ককে দায়িত্ব নয়— ভালোবাসার ইবাদত মনে করেন।
এই মানুষগুলোর কারণেই পৃথিবী এখনো পুরোপুরি যান্ত্রিক হয়ে যায়নি। এরা সংখ্যায় কম হতে পারেন, কিন্তু এদের অস্তিত্ব প্রমাণ করে— মানবিকতা একটি বিলুপ্তপ্রায় গুণ নয়, শুধু একটি অবহেলিত গুণ।
সভ্যতার প্রকৃত সৌন্দর্য উঁচু ভবনে নয়, উন্নত প্রযুক্তিতে নয়, GDP-র সংখ্যায় নয়। সভ্যতার প্রকৃত সৌন্দর্য মাপা যায় একটি সহজ মাপকাঠিতে— সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে বয়স্ক, সবচেয়ে অসহায় মানুষটির সাথে সমাজ কেমন আচরণ করে। কারণ সমাজের মানবিকতা পরীক্ষা হয় তার ক্ষমতাবানদের দিয়ে নয়, তার অক্ষমদের প্রতি আচরণ দিয়ে।
এই পরীক্ষায় আধুনিক সভ্যতা এখনো পুরোপুরি উত্তীর্ণ হয়নি।
এবং যতদিন না হচ্ছে, ততদিন আমাদের এই প্রশ্নটি নিজেদের করতে হবে— আমরা কি শুধু এগিয়ে যাচ্ছি, নাকি এগিয়ে যেতে যেতে কিছু একটা ফেলে আসছি?
সেই ফেলে আসা জিনিসটির নাম— মানুষ।

পড়ুনঃ  মুসোলিনী থেকে হাসিনা: ফ্যাসিবাদীদের নির্মম পরিণতি

সুমন মাহমুদ
টিভি উপস্থাপক ও লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here